এডিস মশার টুকিটাকি এবং  বিনাশ কৌশল!

এডিস মশার টুকিটাকি এবং  বিনাশ কৌশল!
এডিস মশার টুকিটাকি এবং  বিনাশ কৌশল!
এডিস প্রজাতির সদস্যরা অসংখ্য। ভাইরাল সংক্রমণের জন্য পরিচিত দুই বিশিষ্ট প্রজাতি এডিস মশা রয়েছে, যারা ভাইরাস প্রেরণ করে। যারা ভাইরাস ডেঙ্গু  জ্বর, হলুদ জ্বর, ওয়েস্ট নাইল জ্বর, চিকুনগুনিয়া, কারণ প্রেরণ হয় পূর্ব অশ্বতুল্য মস্তিষ্কপ্রদাহ, এবং জিকা ভাইরাস  উল্লেখযোগ্য রোগের জন্য দায়ী।

ডেঙ্গু  জ্বরের সাথে পরিচিত আমরা সকলেই। কিছুদিন পূর্বেও ডেঙ্গুর মহামারী রূপ দেখেছিলো ঢাকাবাসী। এই রোগের বাহককে নিয়ে আজকে আমরা আলোচনা করবো। বাংলাদেশে ১২৩ প্রজাতির মশা রয়েছে। বর্তমানে ঢাকায় প্রায় ১৪ প্রজাতির মশা পাওয়া যায়। এডিস মশা দৃশ্যত স্বতন্ত্র। কারণ তাদের দেহে ও পায়ে কালো এবং সাদা চিহ্ন রয়েছে। অন্যান্য মশার মতো নয় এডিস মশা, এগুলি সক্রিয় থাকে এবং কেবল দিনের বেলায় কামড় দেয়। শীর্ষে কামড়ানোর সময়কাল খুব ভোরে এবং সন্ধ্যা হওয়ার আগে ও সন্ধ্যায় হয়।

 

ডেঙ্গু এডিস মশাবাহিত একটি ভাইরাসঘটিত জ্বর রোগ। এই ভাইরাস বহন করে এডিস ইজিপ্টি ও এডিস এলবোপিকটাস প্রজাতির মশা। এডিস ইজিপ্টি স্বভাবগতভাবে গৃহপালিত ও নগরকেন্দ্রিক। এই মশা ডেঙ্গু বিস্তারে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ভূমিকা রাখে। আর এডিস এলবোপিকটাস, যাকে ‘এশিয়ান টাইগার’ মশা বলা হয়, বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামেই এ মশা রয়েছে। এই প্রজাতি ডেঙ্গু বিস্তারে ৫ থেকে ১০ শতাংশ ভূমিকা রাখে।

 

এডিস মশার জন্ম হয় জমে থাকা পানিতে। সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাড়ি এবং বাড়ির চারদিক দেখতে হবে। কোথাও কোন পাত্রে পানি জমে আছে কি না, যদি থাকে, তাহলে তা ফেলে দিতে হবে বা পরিষ্কার করতে হবে। যদি পাত্রটি এমন হয় যে পানি ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না, তাহলে সেখানে ব্লিচিং পাউডার বা লবণ দিতে হবে। বাড়ির পাশে কোন নির্মাণাধীন ভবন থাকলে, সেটির মালিককে সামাজিকভাবে চাপ প্রয়োগ করতে হবে যেন বাড়িতে মশা জন্মানোর স্থান তৈরি না করেন।

 

এডিস প্রজাতির সদস্যরা অসংখ্য। ভাইরাল সংক্রমণের জন্য পরিচিত দুই বিশিষ্ট প্রজাতি এডিস মশা রয়েছে, যারা ভাইরাস প্রেরণ করে। যারা ভাইরাস ডেঙ্গু  জ্বর, হলুদ জ্বর, ওয়েস্ট নাইল জ্বর, চিকুনগুনিয়া, কারণ প্রেরণ হয় পূর্ব অশ্বতুল্য মস্তিষ্কপ্রদাহ, এবং জিকা ভাইরাস  উল্লেখযোগ্য রোগের জন্য দায়ী। ভাইরাসগুলির সংক্রামণ সাধারণত জ্বরের সাথে থাকে এবং কিছু ক্ষেত্রে যা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ১৯টি জায়গায় এডিস মশা বেশি বসবাস করে থাকে বলে জানিয়েছেন ভি নাগপাল নামক একজন কীটপতঙ্গ বিশেষজ্ঞ। 

 

এগুলো হল,পুরনো টায়ার, লন্ড্রি ট্যাংক, ঢাকনাবিহীন চৌবাচ্চা, ড্রাম বা ব্যারেল, অন্যান্য জলাধার, পোষা প্রাণীর পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনের ব্লক, ফেলে রাখা বোতল ও টিনের ক্যান, গাছের ফোকর ও বাঁশ, দেয়ালে ঝুলে থাকা বোতল, পুরনো জুতা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত খেলনা, ছাদে, অঙ্কুরোদগম উদ্ভিদ, বাগান পরিচর্যার জিনিসপত্র, ইটের গর্ত ও অপরিচ্ছন্ন সুইমিং পুলে এডিস মশা জন্ম নেয়।মশা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে মশার প্রজাতি ও আচরণভেদে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আলাদা হতে হবে। 

 

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু হয়েছিল ২০১৯ সালে। জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই চার মাস ডেঙ্গুর মৌসুম। এ সময়ে সতর্ক থাকলে ডেঙ্গু থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। মশাকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থাপনার।সমন্বিত ব্যবস্থাপনার চারটি অংশ রয়েছে। 

 

প্রথমত, মশার প্রজননস্থল কমানো এবং ধ্বংস করে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সহজভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। দ্বিতীয়ত, জীবজ নিয়ন্ত্রণ, অর্থাৎ উপকারী প্রাণীর মাধ্যমে মশাকে নিয়ন্ত্রণ করার বিভিন্ন পদ্ধতি পৃথিবীতে প্রচলিত আছে। তৃতীয়ত, মশা নিয়ন্ত্রণে লার্ভিসাইড এবং অ্যাডাল্টিসাইড কীটনাশক ব্যবহার করা। আর জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়া দুষ্কর। তাই এ প্রক্রিয়ায় জনগণকে সম্পৃক্ত করার জন্য নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

 

সমাজ ব্যবস্থা বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডকে ১০টি ব্লকে ভাগ করে কার্যক্রম চালাতে হবে। একটি ব্লকের জন্য একজন এন্টোমলজি টেকনিশিয়ান, দুজন করে স্প্রেম্যান, একজন করে ক্লিনার থাকবেন। প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন ওয়ার্ড সুপারভাইজার থাকবেন। এ কাজগুলো বাস্তবায়নের জন্য অভিজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদ দিয়ে আধুনিক এবং সময়োপযোগী গাইডলাইন তৈরি করে নিতে হবে।

 

মশা নিয়ন্ত্রণের কাজটি সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে আলাদা করে স্বতন্ত্র মশা নিয়ন্ত্রণ বিভাগ করা যেতে পারে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি জোনে একজন করে কীটতত্ত্ববিদের পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। প্রতিটি জেলাতে জেলা কীটতত্ত্ববিদের পদ রয়েছে। কোন কোন জেলায় এ পদে কর্মকর্তা রয়েছেন। যেসব জেলায় পদগুলো ফাঁকা রয়েছে, সেসব জেলায় এই পদগুলো পূরণ করে মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ জোরদার করা দরকার।

 

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সারা দেশের মশা এবং অন্যান্য বাহক নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি স্বতন্ত্র সেন্টার তৈরি করতে পারে। এই সেন্টার দেশব্যাপী মশা ও অন্যান্য বাহক নিয়ন্ত্রণের অভিভাবক হিসেবে কাজ করবে। এখানে সারা বছর মশা, অন্যান্য বাহক ও কীটনাশক নিয়ে গবেষণা হবে এবং তারাই নির্দেশনা দেবে কখন কোন কীটনাশক কোন বাহকের জন্য ব্যবহৃত হবে।

 

ডেঙ্গু এমন একটি সমস্যা, যেটিকে সরকার বা সিটি কর্পোরেশন একা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। পৃথিবীর কোন দেশেই জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাফল্য আসেনি। নাগরিকদের সম্পৃক্ততা ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ কখনোই সম্ভব নয়। মশা নিয়ন্ত্রণে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করার জন্য পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে আইন রয়েছে। সে রকম একটি আইন বাংলাদেশে তৈরি করা এবং সেটি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত কীটনাশক জনগণের হাতের নাগালে আনতে হবে। তেলাপোকা এবং ইঁদুর মারার কীটনাশকের মতো মশা নিয়ন্ত্রণের কীটনাশক মানুষের কাছে সহজলভ্য হতে হবে।