পেরেন্টিং

সন্তানের সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ দিন

সন্তানের সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ দিন
জেনে রাখুন, আপনার সমস্ত চাওয়াপাওয়া নির্দেশ আদেশের ভিড়ে ওখানেই সে নিশ্বাস ফেলতে পারে! ওটাই তার স্বস্তি! কিংবা যদি আপনার মেয়েটি খেলতে ভালোবাসে, ব্যাডমিন্টন কিংবা ক্রিকেট, খেলতে দিন! হয়ত সমাজে এসবের মূল্যায়ন কম! সন্তান তো আপনারই! তার সুখের জন্যেই তো এতকিছু! তবে তার ভালোলাগাকে কেন এত আপত্তিকর মনে হবে? সেটাও আপন করে নিন না! তাকে শেখান, তাকে বুঝতে দিন, আপনি তার জন্যে সমাজকে একপাশে রাখতে পারেন, প্রতিদান আপনি নিজেই দেখতে পাবেন! অযথা তাকে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার বানানোর চেষ্টা করে তার জীবনটা বিষিয়ে তুলবেন না! কারণ, তার ব্যর্থতার ভার স্বয়ং আপনিই নিতে চাইবেন না, সমাজের তো প্রশ্নই ওঠে না!

একটি সত্য ঘটনা দিয়েই শুরু করি। আমার খালামণি একটি মেয়ে সন্তানের মা। তাদের দা€úত্য জীবনের অনেকবছর পর একটিমাত্র সন্তান তারা লাভ করেন। সেও বহু ত্যাগ সাধনা আর পরিশ্রমের পর! তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে বেশ ভালো পদে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে স্বামী।
স্ত্রী দুজনেরই ব্যস্ততার কারণে সন্তানকে খুব একটা সময় দিতে পারতেন না। আমাদের বাসা তাদের কাছাকাছি হওয়ায় আমার বোনটি আমাদের কাছেই থাকত। বিকেলে অফিস শেষ করে ওকে ওর বাবা বাসায় নিয়ে যেত। ভেবে দেখুন, সময় এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

দেখতে দেখতে সেই বাবুটি এখন ক্লাস থ্রিতে পড়ে। কিন্তু এখন আমি কি বলতে যাচ্ছি এ ব্যাপারে কারও কোনো ধারণা আছে? হয়ত নেই, মেয়েটি তার দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় গণিতে ১০০তে মাত্র ২৩ পেয়েছিল! স্বাভাবিকভাবেই বাসায় তাকে যথেষ্ট হেনস্তা হতে হয়েছে! স্কুলের প্রথম হওয়া মেয়েটার সাথে নিয়মিত তুলনা তো রয়েছেই! সাথে মারধর তো কিছু আছেই! কিন্তু বিশ্বাস করবেন, এর কোনোটাই ঘটেনি! কেন? কারণ, এতকিছুর ভয়ে সে গণিতখাতাই বাসায় আনেনি, বাবা মাকে দেখায়নি! বাসায় মিথ্যে বলে খাতা নিজেই জমা দিয়েছে। তাহলে খাতা জমা দেওয়ার সময় অভিভাবকের স্বাক্ষর সে কোথায় পেল? এতগুলো ভুলের দায় কে নিবে? এখানে কার দোষ? 


আসলে সত্যি কথা বলতে, আমাদের সমাজে এই প্যারেন্টিং বিষয়টি খুবই অস্বচ্ছ, অপ্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বহীন! আপনারা বাচ্চার জন্ম দিয়েছেন মানেই সেই বাচ্চার উপর আপনাদের সমস্ত অধিকার লিখিত, সেটি হোক সঙ্গত কিংবা অসঙ্গত! বাবা মা হিসেবে আপনি তার একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ চাইবেন, এটাই সত্য, কিন্তু ভেবে দেখুন সেই ভবিষ্যতের বলি আপনি নিজেই হননি তো? আপনার সন্তান আপনাকেই এড়িয়ে যাচ্ছে না তো? আপনাকে সে শ্রদ্ধা নয়, ভয় করে না তো?  এখানে ভয় শব্দটি কল্পনাতীত গুরুত্বপূর্ণ। কেন? কারণ, এই ভয়ের কারণেই বাচ্চা মেয়েটি তার বাবা-মাকে মিথ্যে বলেছে, প্রথম অন্যায়। দ্বিতীয়ত, সে বাবামার স্বাক্ষর নকল করে শিক্ষককে মিথ্যে বলেছে। মূলত আপনার ব্যবহার, আপনার সাথে আপনার সন্তানের সম্পর্কই নির্ধারণ করে দিবে, সে কোন পথে হাঁটবে এবং কেমন মানসিকতা গ্রহণ করবে! একটি চিরন্তন সত্য কথা বলি, আপনাদের, বাচ্চারা কখনই আপনি যা বলবেন তা করবে না, ওরা তাই করবে, যা আপনি করেন। এটাই প্রকৃতির বেঁধে দেওয়া নিয়ম। 


এবারে চলুন, আসা যাক, মূল আলোচ্য বিষয়ে, আপনার প্রিয় সন্তানটিকে কি করে আপনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, বিশ্বস্ত এবং আগ্রহী করে তুলবেন। এক্ষেত্রে খুঁজ্নু, দেখুন, অবলোকন করুন, আপনার সন্তান কিসে আগ্রহী! তার কি ভালো লাগে! কোথায় তার মেধা! কি করতে সে ভালোবাসে! একটা ব্যাপার কি জানেন? বিশ্বাসে ভালোবাসা মেলায়! যখন আপনি কারও মূল্যায়ন করবেন, তখন সেই মানুষটিও আপনার মূল্যায়ন করবে! হোক সে আপনার সন্তান বা আপনার বাবা-মা! এমন হতে পারে, আপনার শিশুটি ছবি আঁকতে ভালোবাসে। হয়ত সেখানেই তার ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে! সেটা সময়সাপেক্ষে দীর্ঘ হতে পারে! কিন্তু তলিয়ে যেতে দেবেন না! তাকে উৎসাহ দিন, নতুন রং কিনে দিন, তার মনটাও রঙিন হোক! হতে পারে আপনার ছেলেটি নাচতে পছন্দ করে, সুযোগ পেলেই শিবলীর ক্লাসিক কিংবা মাইকেলের মুনওয়াক নকল করে সে আপন মনেই! তাকে দমিয়ে দেবেন না!

জেনে রাখুন, আপনার সমস্ত চাওয়াপাওয়া নির্দেশ আদেশের ভিড়ে ওখানেই সে নিশ্বাস ফেলতে পারে! ওটাই তার স্বস্তি! কিংবা যদি আপনার মেয়েটি খেলতে ভালোবাসে, ব্যাডমিন্টন কিংবা ক্রিকেট, খেলতে দিন! হয়ত সমাজে এসবের মূল্যায়ন কম! সন্তান তো আপনারই! তার সুখের জন্যেই তো এতকিছু! তবে তার ভালোলাগাকে কেন এত আপত্তিকর মনে হবে? সেটাও আপন করে নিন না! তাকে শেখান, তাকে বুঝতে দিন, আপনি তার জন্যে সমাজকে একপাশে রাখতে পারেন, প্রতিদান আপনি নিজেই দেখতে পাবেন! অযথা তাকে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার বানানোর চেষ্টা করে তার জীবনটা বিষিয়ে তুলবেন না! কারণ, তার ব্যর্থতার ভার স্বয়ং আপনিই নিতে চাইবেন না, সমাজের তো প্রশ্নই ওঠে না! 


মাদকাসক্তির এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার জন্যে এই মানসিক হতাশাগুলোই ৯০ শতাংশ দায়ী! ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে বেশিরভাগই এমন হয় যে, সে কাউকে বিশ্বাস করতে ভয় পায়, চরম আত্ম অসন্তুষ্টি এবং হীন€§ন্যতায় ভোগে যা সে কাউকে বলতে পারে না! ধীরে ধীরে সেই ক্ষোভগুলো জমা হতে থাকে এবং বিস্ফোরণের মাত্রা ও ধরন হয় ভয়াবহ! এমন ঘটনা খুব কম নয়! একটু চোখ কান খোলা রাখলেই সচেতন হওয়া সম্ভব। 
আমরা ভুলটাই করি শুরুতে, নিজের আকাক্সক্ষা বা ব্যর্থতাগুলো সন্তানের মাধ্যমে পূরণ করতে চাই! কিন্তু সন্তান যে জন্মই নিয়েছে অন্য সাধ বুকে নিয়ে সেটি অগোচরে চাপা পড়ে যায়! সেজন্যে কি করা উচিত? আপনার শিশুটিকে নিয়ে খেলা দেখতে যান, চিত্রকলা প্রদর্শনী কিংবা গানের আসরে নিয়ে যান। দেখুন, কোথায় সে সবচেয়ে উল্লসিত হয়! দেখুন সে ক্লাসের খাতার পেছনে দু’চারটে কবিতা লেখে বা ছবি আঁকে কিনা! দেখুন ওর প্রিয় বন্ধু বা শিক্ষককে সে নিজের ব্যাপারে কিছু বলছে কিনা! আপনি শুধু পাশে থাকুন, সাহস দিন, শুরুটা সে নিজেই করবে!


সন্তানের ভালোবাসার প্রকাশ একটি চরম আনন্দের অনুভূতি!  অল্টার ব্রিজ ব্যান্ডের ভোকালিস্ট মাইলস কেনেডি, তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর একটি গান লিখেছিলেন। যেটি তুমুল জনপ্রিয় একটি বিখ্যাত গান। গানটির জনপ্রিয়তার কারণ এর লিরিক্স! গানটি হলো, ওহ খড়ারহম গবসড়ৎু । গানটিতে ভালোবাসার প্রকাশ কতটা মধুর, চমৎকার এবং অসাধারণ হতে পারে তা নিজেই উপলব্ধি করতে পারবেন! আর এই ভালোবাসার বিনিময়ে হলেও আপনার উচিত তাকে তার ভালো লাগার পথে হাঁটতে দেওয়া। সে তো আপনার অস্তিত্বেরই এক নতুন সংস্করণ! 

ছবি : তানভীর আহমেদ