ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে করণীয়

প্রতীকী ছবি
করোনাভাইরাসের কারণে গত কয়েকমাসের গৃহবন্দী জীবনে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় নানা আঙ্গিকে পরিবর্তন হয়েছে। সবার মধ্যে যে পরিবর্তনটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে, তা হল- অতিমাত্রায় হতাশ হয়ে যাওয়া, বিষণ্ণতায় ভোগা, আর সঙ্গে স্থূলতার সমস্যা তো রয়েছেই। অনেকেই এইসময়টায় ঘরে বসে থাকায় নিয়মিত হাঁটাচলা বা শরীরচর্চার অভাবে ওজন বাড়ার সমস্যায় ভুগছেন।

আমরা কাউকে ওবেস বা স্থূল তখনই বলে থাকি, যখন তার ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি হয়ে থাকে। ওজন ও উচ্চতার অনুপাত অনুযায়ী পরিমাপক, অর্থাৎ BMI বা Body Mass Index ব্যবহার করে দেখলে,  প্রতি বর্গমিটার উচ্চতা হারে ৩০ কেজি বেশি ওজন হলে সেটিকে ওবেসিটি বা স্থূল বলা হয়। আমাদের দেশে অধিকাংশ লোকই মনে করেন শুধুমাত্র অতিমাত্রায় খাদ্যাভ্যাসই ওবেসিটির কারণ। অথচ এটা হতে পারে বংশগত কারণে, হরমোনজনিত সমস্যায়, বয়সভেদে বা বিভিন্ন ঔষধ সেবনে আর অবহেলায় গুরুত্ব না দেওয়া মানসিক চাপজনিত কারণেও।


মানসিক চাপ বা স্ট্রেস এবং স্থূলতা শব্দ দুটি এতোটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে, এই দুটিকেই একটি অপরটির কারণ বলা চলে। অনেকসময় মানসিক চাপকে স্থূলতার  জন্য দায়ী করা হয়, কিন্তু কখনো স্থূলতা নিজেই মানসিক চাপ বাড়াতে একটি ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। স্থূলতা দেখা দিলে অনেকেই নিজের দৈহিক সৌন্দর্য নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগেন, যেটি মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।


অনেকেই ভেবে থাকেন, কম ক্যালরির ডায়েট মেনে খুব দ্রুত ওজন কমিয়ে ফেলবেন। এতে ওজন যতটা তাড়াতাড়ি কমে, ফিরেও আসে ততই দ্রুত। শরীরবৃত্তীয় কিছু বৈশিষ্ট্যই শরীরকে এই স্থিতিস্থাপকতা এনে দিয়েছে, যা উল্লেখ আছে Body's set point theory তে।


আমাদের সবকিছুই হরমোন নিয়ন্ত্রিত। খাদ্যগ্রহণও তার ব্যতিক্রম নয়। কম ক্যালরির ডায়েটে দ্রুত ওজন কমার পাশাপাশি বিপাকীয় হারও কমে যায়। একটানা এই অবস্থা চলতে থাকলে শরীর তার কমে যাওয়া মেটাবলিক রেট-এর সাথে খাপ খাওয়াতে পারেনা। ফলে দেহ আবার ওজন বাড়তে শুরু করে।


মানসিক চাপ এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আমরা প্রায়শই নানা চাপে ভুগি, যার ফলে শরীরের প্রতি আর খেয়াল রাখা হয় না। অন্যদিকে স্ট্রেসের জন্য দায়ী cortisol এর মতো হরমোনই আমাদের ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয়। সেটি ট্রিগার হিসেবে কাজ করে বেশি খেতে, শারীরিক পরিশ্রম কমিয়ে ফেলতে, কম ঘুমোতে,  এমনকি দেরিতে ঘুমানোর মতো বদভ্যাস তৈরি করতে। আবার এই হরমোন খাবারের প্রতি আসক্তিও বাড়িয়ে দেয়। এই অবস্থায় বেশি খেলে দ্রুত লেপ্টিন, ইনসুলিনের মত satiety hormone release এর কারণে একরকম আমোদ অনুভব হয়। অনেকেই খাবার হিসেবে বাছাই করে নেন ফ্যাটি ডিপ ফ্রাইড, অতিরিক্ত কোলেস্টেরলযুক্ত খাবারগুলো। অনেকের ক্ষেত্রেই দেহে পরিমিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের অভাবে LDL cholesterol জারিত হয়ে যায়। এই অবস্থাকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বলা হয়। ঘুরেফিরে আবার আগের অবস্থা সৃষ্টি হয়ে হারানো ওজনও ফিরে আসে।


তাই ওজন কমানো এবং শরীরকে স্ট্যাবল রাখতে হলে মেটাবলিক রেট ঠিক রেখে নির্দিষ্ট set point মেইনটেইন করতে হবে। এক্ষেত্রে নিয়মিত শরীরচর্চা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পেশির সংকোচন-প্রসারণে miokin হরমোন নিঃসৃত হয়ে একদিকে যেমন বিপাকীয় হার বাড়ায়, তেমনি অতিরিক্ত ফ্যাট বার্ন ও ব্লাড শ্যুগার কমাতে  সাহায্য করে। শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি micronutrients গুলোতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে; পরিমিত পরিমাণে ভিটামিন-এ, সি, ই জাতীয় খাবার খেতে হবে।


ওজন কমানোর পাশাপাশি এই বিষয়গুলোকে খেয়াল রাখতে হবে। আর মানসিক চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে। প্রয়োজনে মেডিটেশন, ইয়োগা করা যেতে পারে। ওজন কমাতে লো ক্যালরি ডায়েট বেছে না নিয়ে পরিমিত পরিমাণে খাবার খেতে হবে, সঙ্গে শরীর ও মনের যত্ন নিলেই চলবে। উপরিউক্ত বিষয়গুলো খেয়াল রাখলে ওজন হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি যেমন নিয়ন্ত্রণে থাকবে তেমনি দীর্ঘস্থায়ী হবে, এবং ভালো থাকবেন।


লেখক: স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী,
পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়