হার্টের সুরক্ষায়

প্রতীকী ছবি
যান্ত্রিক জীবনে যতই যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে হৃদরোগের ঝুঁকি ততই বাড়ছে। লিফটের কল্যাণে সিঁড়ি ভাঙ্গার অভ্যাস আমরা অনেক আগেই ত্যাগ করেছি৷ অফিস, বড় বড় বিপণী বিতান থেকে শুরু করে বাসাতেও রয়েছে লিফট অথবা এস্কেলেটর। বাসার নিচেই গাড়ি, গাড়ি না থাকলেও সমস্যা নেই৷ বাসার গেট থেকেই ওঠা যায় রিকশা নামক ত্রিচক্রযানে। আবার অফিসের গেটেই নামা। তাই হাটার অভ্যাসও আমরা ভুলতে বসেছি । সেই সাথে যোগ হয়েছে দুশ্চিন্তা ও নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা, খাদ্যাভ্যাসের হয়েছে যথেষ্ট পরিবর্তন । প্রচলিত বাংলা খাবার ছেড়ে আমরা ঝুঁকি ফাস্টফুডের দিকে। মুখরোচক ও আবেদনশীল পরিবেশন ফাস্টফুডকে আমাদের দেশে করেছে জনপ্রিয়

হৃদয়ের তাড়নায় কত মানুষ কবি সাহিত্যিক হয়েছেন, হয়েছেন সংসার ত্যাগী, সৃষ্টি হয়েছে কত কবিতা, সাহিত্য, মহাকাব্য! সাহিত্যে এই হৃদয়ের তাড়না যতই উপভোগ্য হোক না কেন বাস্তবে আমাদের এই হৃদয়ের একটু ব্যথাই আমাদের করে বিচলিত, হবারই কথা! মায়ের পেটে তিন সপ্তাহ বয়স থেকে যে হৃদযন্ত্র কাজ শুরু করে- জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত একইভাবে তার দায়িত্ব পালন করে। হৃদযন্ত্রের এই নিয়মিত কর্মে একটু বাধা এলেই শুরু হয় নানা বিপত্তি। ডাক্তারি ভাষায় আমরা যাকে বলি হার্ট অ্যাটাক। “Prevention is better than cure" " প্রতিরোধ প্রতিকারের  চেয়ে উত্তম" এই বহুল প্রচলিত বাক্যটি হৃদরোগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ হৃদরোগের প্রতিরোধ থাকলেও সম্পূর্ণ প্রতিকার সম্ভব নয়৷ অর্থাৎ একবার হৃদরোগে আক্রান্ত হলে আর সম্পূর্ণ প্রতিকার নেই। তাই প্রতিরোধই হৃদরোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।

 

আধুনিক সভ্যতা সংক্রামক ব্যাধিকে জয় করতে পারলেও এই নতুন শতাব্দীর বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে অসংক্রামক ব্যাধি বা ‘non-communicable disease। হৃদরোগ তেমনই একটি অসংক্রামক ব্যাধি যা বর্তমান বিশ্বে এক নম্বর ঘাতক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত।  প্রতি বছর প্রায় ১৮ মিলিয়ন মানুষ মারা যাচ্ছে শুধু এই হৃদরোগের কারণে। বিশ্বে এক-তৃতীয়াংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী এই হৃদরোগ। আমাদের দেশে অল্প বয়সী (৪০ বছরের কম) হৃদরোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা খুবই আশঙ্কার কথা। যে বয়সে মানুষ তার নিজের, পরিবারের, সমাজের বা দেশের জন্য কিছু করতে পারে, জীবনের সেই গতিময় সময়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখে ঢোলে পড়ছে অথবা সারা জীবনের জন্য হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সামাজিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে।

 

যান্ত্রিক জীবনে যতই যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে হৃদরোগের ঝুঁকি ততই বাড়ছে। লিফটের কল্যাণে সিঁড়ি ভাঙ্গার অভ্যাস আমরা  অনেক আগেই ত্যাগ করেছি৷ অফিস, বড় বড় বিপণী বিতান থেকে শুরু করে বাসাতেও রয়েছে লিফট অথবা এস্কেলেটর। বাসার নিচেই গাড়ি, গাড়ি না থাকলেও সমস্যা নেই৷ বাসার গেট থেকেই ওঠা যায় রিকশা নামক ত্রিচক্রযানে। আবার অফিসের গেটেই নামা। এর সাথে যোগ হয়েছে প্রায় গত দুই মাস ধরে চলতে থাকা লকডাউন। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে ঘরের বাইরে যাওয়াই বন্ধ। তাই হাটার অভ্যাসও আমরা ভুলতে বসেছি । সেই সাথে যোগ হয়েছে দুশ্চিন্তা  ও নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা, খাদ্যাভ্যাসের হয়েছে যথেষ্ট পরিবর্তন । প্রচলিত বাংলা খাবার ছেড়ে আমরা ঝুঁকি ফাস্টফুডের দিকে। মুখরোচক ও আবেদনশীল পরিবেশন ফাস্টফুডকে আমাদের দেশে করেছে জনপ্রিয়!

 

ছোট ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে বয়স্ক সবারই পছন্দের তালিকায় এই ফাস্টফুড। ফাস্টফুডের দোকান গুলোতে যে চিকেন ফ্রাই ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বিক্রয় হয় তাতে থাকে Trans Fat। এই ট্রান্সফ্যাট হৃদরোগ সৃষ্টিতে cholesterol (খারাপ চর্বি) থেকে কয়েকগুণ বেশি দায়ী। তাই যারা এই চিকেন ফ্রাইকে গরু-খাসির মাংস থেকে নিরাপদ ভেবে গ্রহণ করছেন তারাও হৃদরোগের ঝুঁকিতে আছেন। হাঁটার অভ্যাস হতে পারে একটি ভালো দাওয়াই হৃদরোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে। এই লকডাউন পরিস্থিতিতে বাসার বাইরে না হলেও বাসার ভেতরে কিংবা ছাদে সপ্তাহে ৫ দিন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট হাঁটাই যথেষ্ট। হাঁটতে পারেন সকালে অথবা সন্ধ্যায়, সময়টা ঠিক করুন আপনার সুবিধামতো। হাঁটতে হবে দ্রুত পায়ে। হাঁটার সময় ওয়াকম্যানে শুনতে পারেন প্রিয় কোন শিল্পীর প্রিয় গান।

 

গবেষণায় দেখা গেছে, গান হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। হাঁটার কারণে হৃদপিণ্ডের রক্ত সঞ্চালন বাড়বে শরীরের অতিরিক্ত ওজন ও মেদ কমবে। আর যদি ডায়াবেটিসের সমস্যা থেকে থাকে রক্তের শর্করার পরিমাণটাও থাকবে নিয়ন্ত্রণে। খাবারের ক্ষেত্রে বলা যায় যতটা দেশী খাবার থাকবে খাবারের তালিকায় ততই ভালো।

 

সকালের নাস্তায় থাকতে পারে হাতে বেলা আটার রুটি সবজি ডিম ভাজি। বয়স্কদের জন্য ডিমের কুসুমটা পরিহার করাই ভালো। দুপুর ও রাতের খাদ্য তালিকায় থাকতে পারে সাদাভাত, শাকসবজি, মাছ, ডাল। সবুজ ও রঙিন মৌসুমী শাক-সবজি গুলো স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভালো। এগুলো শুধু ভিটামিনের অভাব পূরণ করবে না, সেইসাথে রক্তে চর্বির পরিমাণটাও কমাবে। মাংসের ক্ষেত্রে ‘White meat‘ বা মুরগির মাংস খাওয়া যেতে পারে অবশ্যই পরিমাণ মতো। ‘Red meat‘ বা গরু, খাসির মাংস পরিহার করতে হবে। খাবারের তেল নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে ‘Olive oil‘  কিন্তু আমাদের দেশে প্রচলিত না হওয়ায় সবখানে সহজলভ্য নয়। ‘Sunlower oil‘ অথবা সয়াবিন তেল হতে পারে তার উপযুক্ত বিকল্প। উদ্ভিদজাত এই তেল গুল রক্তের খারাপ চর্বি কমাতে সাহায্য করে। ঘি বা বাটার ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।

 

ধূমপানের অভ্যাস থাকলে তা অবশ্যই পরিহার করতে হবে। বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের কাছে খুব জনপ্রিয় ই- সিগারেট, অনেকে ধূমপানের চেয়ে নিরাপদ ভেবে  ই- সিগারেটের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে  ই- সিগারেটেও রয়েছে হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর উপাদান, যা শুধু হৃদরোগের ঝুঁকিই বাড়ায় না ক্যানসারের মত ঘাতক ব্যাধিরও কারণ। মদ্যপান অথবা যেকোনো ধরণের মাদকই আপনার হৃদপিণ্ডকে ধীরেধীরে দুর্বল করে। এমনকি এনার্জি ড্রিঙ্ক নামক যে পানীয় আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত তাও হৃদপিণ্ডের ব্যাপক ক্ষতি করে। সিগারেটের নিকোটিন অথবা বিভিন্ন মাদক সেবনের পরে হৃদপিণ্ডের গতির যেমন তারতম্য ঘটে তেমনি ভাবে হৃদপিণ্ডের রক্তনালীতে রক্ত সঞ্চালনেরও ব্যাঘাত ঘটায়, পরিণতি হিসেবে ডেকে আনতে পারে হার্ট অ্যাটাকের মত মৃত্যু-ঝুঁকি।

 

পরিবারের কারো হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে আপনাকে একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে। দেখা গেছে হৃদরোগও ডায়াবেটিস এবং হাইপার-টেনশনের মত বংশগত । আর যদি থাকে ডায়াবেটিস অথবা  হাইপার-টেনশন তাহলে সতর্কতার মাত্রাটা একটু বাড়াতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি, অতিরিক্ত ওজন  হৃদরোগ ঝুঁকিটা বাড়ায়। তাই এগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।মানসিক দুশ্চিন্তা পরিহার করতে হবে। পরিবারকে সময় দিতে হবে এবং পরিবারের সাথে থাকতে হবে।

 

লেখক: এমবিবিএস, এমডি (কার্ডিওলজি)
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল