শীতলপাটি - বাঙালির শৌখিনতার প্রতীক

বাঙালির শৌখিনতার প্রতীক
কেবল বাংলাদেশেই নয় পুরো উপমহাদেশেই এই পাটি শীতল, মসৃণ ও আরামজনক হিসেবে বেশ বিখ্যাত। পুরো উপমহাদেশে কমবেশি এই পাটি তৈরি হয়ে এলেও বাংলাদেশেই সবচাইতে উৎকৃষ্ট পাটি প্রস্তুত হয়ে থাকে। এই ধরনের পাটিতে বেত্র রঞ্জিত ক্রমানুসারে পাশা, দাবা প্রভৃতি বিবিধ খেলার ছকসহ নানান নকশা আঁকা হয়ে থাকে। শুরুর দিকে এই পাটি ১০ আনা হতে ১০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হয়। এই সময়ে রাজারা ও তাদের রানিরা এই ধরনের পাটি ব্যবহার করত। এক সময়ে ইট ও চোঁয়ালিশ পরগণাতেই দেশের সর্ব্বোৎকৃষ্ট শীতল পাটি প্রস্তুত করা হতো এবং পাটি প্রস্তুতকারকগণ ‘পাটিয়ারা দাস’ নামে খ্যাত ছিল।

সুপ্রাচীনকাল থেকেই বাঙালির শৌখিনতার সুনাম রয়েছে পুরো বিশ্বজুড়ে। শীতলপাটি তেমনি এক শৌখিনতার প্রতীক। শীতল পাটি মূলত এক ধরনের মেঝেতে পাতা আসন। এটি বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যগত কুটিরশিল্পের অংশ। পাটি মূলত বেত বা মোস্তাক নামক গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের ছাল থেকে তৈরি হয়ে থাকে। হস্তশিল্প হিসাবে সারাবিশ্বেই এগুলোর যথেষ্ট কদর রয়েছে। 


কেবল বাংলাদেশেই নয় পুরো উপমহাদেশেই এই পাটি শীতল, মসৃণ ও আরামজনক হিসেবে বেশ বিখ্যাত। পুরো উপমহাদেশে কমবেশি এই পাটি তৈরি হয়ে এলেও বাংলাদেশেই সবচাইতে উৎকৃষ্ট পাটি প্রস্তুত হয়ে থাকে। এই ধরনের পাটিতে বেত্র রঞ্জিত ক্রমানুসারে পাশা, দাবা  প্রভৃতি বিবিধ খেলার ছকসহ নানান নকশা আঁকা হয়ে থাকে। শুরুর দিকে এই পাটি ১০ আনা হতে ১০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হয়। এই সময়ে রাজারা ও তাদের রানিরা এই ধরনের পাটি ব্যবহার করত। এক সময়ে ইট ও চোঁয়ালিশ পরগণাতেই দেশের সর্ব্বোৎকৃষ্ট শীতল পাটি প্রস্তুত করা হতো এবং পাটি প্রস্তুতকারকগণ ‘পাটিয়ারা দাস’ নামে খ্যাত ছিল। 


যেই গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ থেকে শীতল পাটি তৈরি করা হয় তার স্থানীয় নাম ‘মুর্তা’। স্থানভেদে একে ‘মুসতাক’, ‘পাটিবেত’ ইত্যাদি নামেও একে অভিহিত করা হয়। পাটি যারা তৈরি করে থাকে তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে মুর্তার ছাল থেকে যতটা সম্ভব সরু ও পাতলা ‘বেতি’ তৈরি করে নেওয়া। বেতি যত সরু ও পাতলা হবে পাটি তত নরম ও মসৃণ হবে।

এজন্য হাতের নখ দিয়ে ছিলে বুননযোগ্য বেতি আলাদা করা হয়ে থাকে। বেতি তৈরি হওয়ার পর এক-একটি গুচ্ছ বিড়ার আকারে বাঁধা হয়। তারপর সেই বিড়া ঢেকচিতে পানির সঙ্গে ভাতের মাড় এবং আমড়া, জারুল ও গেওলা ইত্যাদি গাছের পাতা মিশিয়ে সিদ্ধ করা হয়। এরফলে বেতি হয় মোলায়েম, মসৃণ ও চকচকে। রঙিন নকশাদার পাটি তৈরির জন্য সিদ্ধ করার সময় ভাতের মাড় ইত্যাদির সঙ্গে রঙের গুঁড়া মেশানো হয়। দক্ষ কারিগর একটি মুতা থেকে ১২টি পর্যন্ত সরু বেতি তৈরি করতে সক্ষম। পাটি বোনার সময় বেতিগুলোকে ঘন আঁটসাঁট করে বসানো হয় যাতে ফাঁক-ফোকড় না-থাকে।

এর আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে নকশায়, যা এই পাটি তৈরিকারকেরা মনের মাধুরী মিশিয়ে আঁকায়। সিলেট অঞ্চল মূলত এই পাটির জন্য বিখ্যাত। এছাড়াও বরিশাল, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুর অঞ্চলেও এই গাছ জন্মে এবং পাটিও পাওয়া যায়। ঢাকার নিউমার্কেট, কারওয়ান বাজারে শীতলপাটি কিনতে পাওয়া যায়। এর দাম আকার অনুযায়ী বিভিন্ন হয়। নকশা করা পাটিগুলো দাম বেশি হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে পাটি তৈরি হয়। কিন্তু সিলেট এলাকায় বিভিন্ন স্থানে যে মানের শীতল পাটি তৈরি হয় তা অসাধারণ। সিলেট অঞ্চলের সুনামগঞ্জ এলাকায় পাটিকররা তাদের নিপুণতার জন্য শত শত বৎসর যাবৎ প্রসিদ্ধ। শীতল পাটিতে বসে বা শুয়ে যে আরামপ্রদায়ী শীতল অনুভূতি পাওয়া যায় তা ব্যাখ্যাতীত। বাংলাদেশের এই বিখ্যাত ঐতিহ্য জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কো বাংলাদেশ সরকারের     সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আবেদনক্রমে ৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ সালে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নিবর্স্তুক বা ইনট্যানজিবল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। প্লাস্টিক, পলিথিনের এই বিস্তৃতির জুগেও আজও শীতল পাটির সৌন্দর্য ও আরাম প্রতিটি মানুষকে মুগ্ধ করে চলেছে।