নাসায় বাংলাদেশি মেয়ে মাহজাবীন

নাসায় বাংলাদেশি মেয়ে মাহজাবীন
নাসায় বাংলাদেশি মেয়ে মাহজাবীন
২০১৪ সালে মেডিকেল প্রোগ্রাম ছেড়ে ভর্তি হন মিশিগানের ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগে। পড়ার পাশাপাশি একাধিকবার শিক্ষানবিশ (ইন্টার্ন) হিসেবে কাজ করেছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত পিৎজা কোম্পানি লিটল সিজার্স করপোরেটের প্রধান কার্যালয়ে শেয়ার পয়েন্ট ডেভলপার হিসেবে কাজ করেন। পরে দুই মেয়াদে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করেন নাসায়।

নাসায় জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে বিভিন্ন দেশের চাকরিপ্রত্যাশীদের আবেদন পড়ল কয়েক লাখ। শেষপর্যন্ত এই লাখ লাখ চাকরিপ্রত্যাশীদের মাঝে মাত্র একজনকে চূড়ান্তভাবে বেছে নেওয়া হলো নাসার স্পেস সিস্টেম সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে। আর তিনি হলেন বাংলাদেশের সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার কদমরসুল গ্রামের মেয়ে মাহজাবীন হক। নাসা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাকাশ সংস্থা, যার পূর্ণরূপ ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। 

ক্লাস থ্রিতে থাকা অবস্থায় টিভিতে নাসার একটি ডকুমেন্টারিমূলক ভিডিও দেখে জীবনের গন্তব্যটা যেন ঠিক করেই ফেলেছিলেন মাহজাবীন হক। পণ করে বসেছিলেন, তিনি জীবনের একসময় নাসার হয়েই কাজ করবেন। এরই ধারাবাহিকতায় অষ্টম শ্রেণি পাস করেই ডিভি (ডাইভার্সিটি ভিসা) নিয়ে ২০০৯ সালে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ভর্তি হন নিউইয়র্কের উইলিয়াম কলেন ব্রায়ান্ট হাইস্কুলে। পরে স্থানান্তর সূত্রে ২০১১ সালে ভর্তি হন মিশিগান শহরের হ্যামট্র্যামিক হাইস্কুলে। এরপর বাবার ইচ্ছায় প্রি-মেডিকেলে ক্লাস শুরু করেন ডাক্তার হওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু, ছোটবেলা থেকে লালন করা নাসায় কাজ করার স্বপ্নটা যেন কোনোক্রমেই হেরে যেতে চাচ্ছিল না। তাই, ২০১৪ সালে মেডিকেল প্রোগ্রাম ছেড়ে ভর্তি হন মিশিগানের ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগে। পড়ার পাশাপাশি একাধিকবার শিক্ষানবিশ (ইন্টার্ন) হিসেবে কাজ করেছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত পিৎজা কোম্পানি লিটল সিজার্স করপোরেটের প্রধান কার্যালয়ে শেয়ার পয়েন্ট ডেভলপার হিসেবে কাজ করেন। পরে দুই মেয়াদে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করেন নাসায়। যার প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত কাজ করেন শিক্ষানবিশ ডেটা অ্যানালিস্ট হিসেবে এবং ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করেন নাসার মিশন কন্ট্রোল সেন্টারের সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে। আর এখন তিনি স্থায়ীভাবে নিয়োগ পেয়েছেন নাসার স্পেস সিস্টেম সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে। অক্টোবর থেকে তিনি কাজে যোগ দেবেন। 


কথা হয় নাসায় সদ্যনিয়োগ পাওয়া স্পেস সিস্টেম সফটওয়্যার প্রকৌশলী মাহজাবীনের সাথে। তিনি বলেন, ‘আমি আমার নিয়োগকর্তাকে আমাকে সিলেক্ট করার কারণ জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, আপনার অলরাউন্ডার পারফর্মেন্স বা গুণাগুণ যেমন আপনার পড়াশোনা,  সাংগঠনিক দক্ষতা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে আপনার অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন ভলান্টিয়ারিং কাজের অভিজ্ঞতা আপনাকে এগিয়ে রেখেছিল। আমরা আসলে খুঁজছিলাম যারা শুধু পড়াশোনাই নয় পারিপার্শ্বিক সবদিক দিয়ে দক্ষ তাদেরকে। আমরা চাই, নাসায় নিয়োগ পাওয়া সবাই যেন একসময় দক্ষ লিডার হিসেবে গড়ে ওঠে।’ 
উল্লেখ্য,  মাহাজাবীন ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংগঠনের পর্যায়ক্রমে সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী কাজ এবং নাচ, গানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে তার সরব উপস্থিতি ছিল।
কিন্তু, এত বড়ো একটা সাফল্যের পরেও সব নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথে যেই কমন বা অতিপরিচিত সমস্যায় পড়তে হয় সেই সমস্যার মোকাবেলা তাকেও করতে হয়েছে। কারণ, একজন মেয়ের প্রকৌশলবিদ্যায় পড়াশোনা করাটা অনেকেই নাকি ভালো চোখে দেখেননি। এমনকি এখনো, মিশিগান থেকে টেক্সসে গিয়ে নাসায় কাজ করাকে নাকি অনেকেই সমর্থন দিচ্ছেন না। কিন্তু, এক্ষেত্রে বরাবরই তার পরিবার তার পাশে ছিল এবং আছে বলেই তার এমন অবস্থানে আসা সম্ভব হয়েছে। মা ফেরদৌসী চৌধুরীতো সবসময় মেয়েকে পাশে থেকে উৎসাহ দিয়ে গেছেন। তাই, মাহজাবীনও বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন মায়ের প্রতি। মাহজাবীনের ছোটভাই সৈয়দ সামিউল হক কর্মরত আছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে এবং বাবা সৈয়দ এনামুল হক দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পুবালী ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে। কর্মসূত্রে বাবা এনামুল হক বাংলাদেশেই অবস্থান করছেন।
মাহজাবীন তরুণ প্রজন্মকে উদ্দেশ্যে করে  বলেন, ‘নাসাসহ বিভিন্ন বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠানে নিজেকে অনন্যউচ্চতায় দেখতে চাইলে আমাদের পড়াশোনার পাশাপাশি অলরাউন্ডার পারফর্মার হতে হবে। অর্থাৎ, পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে নিজেকে যুক্ত রাখতে হবে। আর পড়াশোনার বিষয় নির্বাচনে আমাদের পছন্দের বিষয়কেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বিশেষ করে মেয়েদের। কারণ আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, মেয়েরা তাদের পছন্দের বিষয় নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি বাধার সম্মুখীন হয়। আমরা যদি এই বিষয়গুলো মাথায় নিয়ে এগোতে পারি, তাহলে দেখবেন দিনশেষে সাফল্য আমাদের হাতের মুঠোয়।’