অনুপ্রেরণার নাম জয়া

অনুপ্রেরণার নাম জয়া
অনুপ্রেরণার নাম জয়া
ফিফার রেফারি হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেই বসে থাকেননি তিনি। একে একে রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দেশি-বিদেশি অসংখ্য ম্যাচে। দেশীয় ম্যাচ পরিচালনার পাশাপাশি ২০১৩ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন শ্রীলঙ্কায়। এরপর একে একে নেপাল, ভুটান, বার্লিন, তাজাকিস্তানে অনূর্ধ্ব-১৪, সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ ও আন্তর্জাতিক ফুটবল মেলায় ৩৫টির বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করেছেন রেফারি হিসেবে।

গত কয়েক দশক ধরেই দেশের ক্রীড়াঙ্গন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এদেশের যুবকরা। এক সময় আবাহনী বনাম মোহামেডানের ম্যাচ নিয়ে টানটান উত্তেজনা ছিল দেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের মাঝে। তবে এই সাফল্য আর খেলার মাঠের পুরোটা জুড়েই ছিল দেশের পুরুষরা।  তবে দিন পাল্টে গেছে। আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাল্টে গেছে সাফল্যের দাবিদাররাও। ক্রিকেটহোক আর ফুটবলই হোক, দেশের মেয়েরা পিছিয়ে নেই কোনোদিক থেকেই। নারী ক্রিকেট দলের পাশাপাশি ফুটবল দলও বহির্বিশ্বে কুড়াচ্ছে সুনাম। আর সেই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশনেও পৌঁছে গেছে বাংলাদেশের প্রথম নারী রেফারি। খুব শিগগিরই ফিফার রেফারি হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছেন এক সাবেক বাংলাদেশি ফুটবলার ও কোচ। বলছিলাম জয়া চাকমার কথা।

বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল রাঙ্গামাটিতে জন্ম নেন বাংলাদেশের জাতীয় দলের সাবেক এই নারী ফুটবলার। সেখানেই কাটে তার শৈশব। ছোট থেকেই খেলতে ভালোবাসতেন তিনি। তাই প্রায়ই ছেলেদের সঙ্গেই হাফ প্যান্ট পরে নেমে যেতেন খেলতে। পড়াশোনার চেয়ে খেলাটাই বেশি টানতো তাকে। ২০০৮ থেকে শুরু বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলে খেলেন তিনি। এর মধ্যেই স্কুল আর কলেজের গন্ডি পেরিয়ে ২০১০ সালে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইতিহাস বিভাগে। জাতীয় দলের খেলার পাশাপাশি রেফারিংয়ের কোর্স করার পরামর্শ পান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের কাছ থেকেই। একই বছর শুরু করেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ক্লাস-৩ রেফারিং কোর্স। সেই থেকেই শুরু। বাধা-বিপত্তি, হতাশা, কষ্ট সব কিছু পেরিয়ে প্রায় দশ বছরের চেষ্টা আর ধৈর্যের পর স্বপ্ন পূরণের পথে হাঁটছেন তিনি। ফিফায় বাংলাদেশের প্রথম বাংলাদেশি নারী  রেফারি হিসেবে নাম লেখাতে যাচ্ছেন তিনি।
তবে তার এই দশ বছরের পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। তিলে তিলে নিজেকে গড়ে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হয়েছে তার। ২০১০ সালে রেফারিংয়ের ক্লাস-৩ কোর্স, এরপর প্রায় পৌনে ৩ বছরের অপেক্ষা পরবর্তী ধাপের জন্য। ক্লাস-২-এর পর আরও ২ বছর লেগেছে ক্লাস-১ রেফারি হওয়ার জন্য। একই সঙ্গে চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা। রেফারি হওয়ার দিকে একপা, দুইপা করে এগোনোর পাশাপাশি ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) নারী ফুটবল দলের কোচ হিসেবে যোগ দেন তিনি। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। আন্তর্জাতিকমানের রেফারি হওয়ার স্বপ্ন তাড়া করে ছুটেছেন তিনি। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে অংশ নিয়েছেন ফিফার পরীক্ষায়। তবে অবশেষে ২০১৯ সালে স্বপ্নের হাতছানি পান তিনি। প্রাথমিকভাবে সবগুলো পরীক্ষা উতরে যান। তার ভাষায়, ‘আমি একটি নাছোড়বান্দা প্রকৃতির মানুষ। তাই হাল ছাড়িনি।’


ফিফার রেফারি হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেই বসে থাকেননি তিনি। একে একে রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দেশি-বিদেশি অসংখ্য ম্যাচে। দেশীয় ম্যাচ পরিচালনার পাশাপাশি ২০১৩ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন শ্রীলঙ্কায়। এরপর একে একে নেপাল, ভুটান, বার্লিন, তাজাকিস্তানে অনূর্ধ্ব-১৪, সাফ অনূর্ধ্ব-১৫  ও আন্তর্জাতিক ফুটবল মেলায় ৩৫টির বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করেছেন রেফারি হিসেবে।
ছোট থেকেই সাম্প্রদায়িক কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকলেও খেলাধুলার জন্য তাকে মুখোমুখি হতে হয়েছে বিভিন্ন রকম বাধা-বিপত্তির। হাফ প্যান্ট পরা কিংবা ছেলেদের সঙ্গে খেলা কিংবা এখন খেলার সময় না, পড়াশোনা করো বা মেয়ে হয়ে এত দৌড়াদৌড়ি কেন, এ-জাতীয় নানাধরনের কথাও শুনতে হয়েছে তাকে। তবে জয়ার মানসিকশক্তি তাকে প্রথমে এনেছে জাতীয় নারী ফুটবল দলে আর আজকের এই উচ্চতায়। তিনি জানান, ক্রীড়াঙ্গনে সফল হতে হলে একটি মেয়ের তিনটি দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রথমত তাকে মানসিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে, দ্বিতীয়ত তাকে পড়াশোনা করতে হবে আর তৃতীয়ত তাকে একাগ্রচিত্তের অধিকারী হতে হবে।
ফুটবলকে ভালোবেসে এরজন্য কিছু করতে চাওয়া থেকে একে একে জাতীয় দলের ফুটবলার, এরপর কোচ ও সর্বশেষ রেফারি হিসেবে নিয়মিত কাজ করে গেছেন তিনি। উদ্দেশ্য, দেশের নারীসমাজকে উৎসাহিত করা। তিনি বলেন, ‘যে ফুটবল আজ আমাকে এত কিছু দিয়েছে, তার জন্য আমি কিছু করতে চাই। আমি ফুটবলার কিংবা কোচ কিংবা রেফারি যাই হই না কেন, আমি চাই নারীদের ফুটবলকে আরও উপরে নিয়ে যেতে। আমি কাজ করে যাচ্ছি এই ভেবে, যেন অন্তত আমাকে দেখে বাকিরা শিখতে পারে। এখন যে-কোনো খেলায় পুরুষরা বেশি আর নারীরা কম অংশ নেয়। এর পিছে অনেক কারণ থাকলেও আর্থিক অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা মানসিকশক্তির অভাবের কারণেই মেয়েরা খেললেও বড়ো কোনো স্বপ্ন দেখতে পারে না। আর এগুলোর সঙ্গে প্রচুর চেষ্টা, এবং একাগ্রতার অভাব তো আছেই। আমি চাই, তারা ফুটবলে আসুক, দেখুক এবং শিখুক, স্বপ্নকে জয় করুক।’