সম্পত্তি আইন

এই বিভেদ ঘুচবে কবে?

সম্পত্তি আইন
সম্পত্তি আইন
মেয়েদের পিতার সম্পত্তিতে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারলে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই মঙ্গল। সাধারণত স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া হলে স্বামী বলে ফেলেন, ‘ভালো না লাগলে তুমি আমার সংসারে থেকো না’। বা স্ত্রী রাগের বশে বলেন, ‘থাকো তোমার সংসার নিয়ে’। কিন্তু স্ত্রী যাবেন কোথায়? বাবার বাড়ি তো এখন তার ভাইদের বাড়ি। আবার ঘরছাড়া হলে স্বামীর বাড়িও তার নিজের বাড়ি থাকে না। নারীর এই নিরাপত্তাহীনতার কারণ হলো তার সম্পত্তিতে সমান অধিকার না থাকা। আমি মনে করি, উপরের বিষয় ছাড়াও, সবক্ষেত্রে পিতা-মাতার সম্পত্তিতে ছেলেমেয়ের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক। আমার বোন যেমন পৈতৃকসূত্রে আমার সমান সম্পত্তি পাবেন, আমার স্ত্রীও তেমন তার পৈতৃকসূত্রে তার ভাইদের সমান সম্পত্তি পাবেন। আমি তো সমস্যার কিছু দেখছি না।

মুসলিম আইন এবং দেশের চলমান আইন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির একজন মেয়ে থাকলে এবং কোনো ছেলে না থাকলে মেয়ে মৃত ব্যক্তির মোট সম্পত্তির অর্ধেক পাবে। যদি একাধিক মেয়ে থাকে এবং ছেলে না থাকে সেক্ষেত্রে মেয়েরা মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ পাবে এবং এ-অংশ সকল মেয়ের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হবে। [স্ত্রী জীবিত থাকলে স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তির সন্তান থাকা অবস্থায় ১/৮ অংশ (এক-অষ্টমাংশ) পাবেন এবং সন্তান না থাকলে ১/৪ অংশ (এক-চতুর্থাংশ) পাবেন।] বাকি সম্পত্তি মৃত ব্যক্তির ভাই বা ভাইয়ের ছেলেরা পাবেন। 


অর্থাৎ এক্ষেত্রে শুধু কন্যা সন্তানের কোনো পিতা সারাবছর খেটে কিছু সম্পত্তির মালিক হলে, ভাইয়ের ছেলেদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকলেও তার মৃত্যুর পর সম্পত্তির একটা অংশ ভাইয়ের ছেলেদের নামে চলে যাবে। একজনের একক পরিশ্রমের ফল যেটা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত নয়; কিন্তু ছেলে সন্তান না থাকলে সম্পত্তি ধরে রাখা যাবে না। কিন্তু কেন? মেয়েরা কেন বাবা-মায়ের অর্জিত সম্পদের সমান অংশ পাবেন না?  
ইসলামে আইনটি যখন করা হয় তখন সমাজে কমিউনিটিভিত্তিক জীবনব্যবস্থা চালু ছিল। সেখানে পরিবারের চেয়ে সমাজ কিংবা কমিউনিটির স্বার্থ বেশি দেখা হতো। কিন্তু এখন আর সেটা নেই। এখন সমাজ পরিবারকেন্দ্রিক। প্রতিটি পরিবার অন্য পরিবার থেকে স্বতন্ত্র। সম্পত্তি অর্জন কিংবা দেখভালের জন্য পরিবারের বাইরের সদস্যদের কোনো ভূমিকা এখন থাকে না। এ রকম সমাজব্যবস্থায় পুত্রের অবর্তমানে মৃতের নিজের কন্যাসন্তানকে বাবার পুরো সম্পত্তি প্রদান না করে তুলনামূলকভাবে দূরবর্তী আত্মীয় চাচা-ফুফুদের কাছে সেই সম্পত্তি হস্তান্তর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য আইন হতে পারে না।


এর সম্ভাব্য প্রতিকার হিসেবে অনেকে যা করে থাকেন, পুত্রসন্তানের অনুপস্থিতির কারণে পিতা তার জীবদ্দশায় কন্যাসন্তানের অনুকূলে সম্পত্তি উইল করে যান। এক্ষেত্রে সমস্যা হলো উইল করতে হলে সহ-শরিকদের মতামত গ্রহণ করতে হয়, যা বাস্তবে বেশ কঠিন ব্যাপার। আবার জীবদ্দশায় কন্যাসন্তান সম্পত্তি দান করে দিলে মুশকিল হলো বাবা-মায়ের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। কারণ সম্পত্তিতে আইনগতভাবে পিতার মালিকানা থাকে না। সম্পত্তিহীনভাবে জীবনের বাকি সময়টা মেয়ের গলগ্রহ হয়ে থাকার ঝুঁকি অনেকে নিতে চান না। কিংবা আজ দেবো কাল দেবো করে হঠাৎ করে মারা গেলে বা অপমৃত্যু ঘটলে মেয়েরা নিজের বাবার সম্পত্তির একটা বিরাট অংশ থেকে বঞ্চিত হন। 


আমি লক্ষ্য করে দেখেছি, যাদের এক বা একাধিক কন্যা সন্তান আছে কিন্তু ছেলে সন্তান হওয়ার আর সম্ভাবনা নেই বা আর সন্তান নিতে চান না, তারা নিজের সম্পত্তি কিভাবে তাদের কন্যারা সম্পূর্ণ অংশই পেতে পারে তার জন্য সিস্টেমের ফাঁকফোকর বা বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, বিকল্প ব্যবস্থার অনুসন্ধান করা মানে যদি হয় ইসলামি আইনের বিপক্ষে যাওয়া, তাই যদি করতে চান, তাহলে আইনটা পরিবর্তনের জন্য আওয়াজ তোলা উচিত না? দেশে পুত্র-সন্তানহীন দ€úতির সংখ্যা অসংখ্য, কেবল তারাই এ-আইনের বিরোধিতা করলেই তো আইনটি বদলে যেতে পারে। 


পুত্রের অবর্তমানে কন্যাকে মৃত পিতার অবশিষ্ট সম্পত্তি প্রদান করে আইন প্রণয়নের ব্যাপারে বাংলাদেশ আইন কমিশন বেশ আগেই সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে। কমিশনের দাবি, ইসলামি নীতির মধ্যে থেকেই এভাবে আইন প্রবর্তন করা সম্ভব। এ-প্রসঙ্গে তারা ইন্দোনেশিয়ার সর্বোচ্চ আদালতের একটি রায়কে উল্লেখ করেছেন। ইন্দোনেশিয়ার আদালত ছেলে সন্তানের অনুপস্থিতিতে মেয়ে সন্তানকে মৃত পিতার উত্তরাধিকার সম্পত্তির অবশিষ্টাংশ প্রদানের পক্ষে রায় প্রদান করেছেন। রায়ে যুক্তি দিয়ে বলা হয়েছে, সূরা নিসার ১৭৬ ন€^র আয়াত অনুসারে, নিঃসন্তান ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি জীবিত ভাই-বোনের কাছে চলে যায়। এ-আয়াত থেকে বোঝা যায়, মৃতের সন্তান-সন্ততি না থাকলে তবেই সম্পত্তি মৃতের ভাই-বোনদের কাছে চলে যাবে। সুতরাং মৃতের সন্তান থাকলে তার ভাই-বোনেরা সেই সম্পত্তির অংশ পাবে না, সেটিই এ-আয়াত থেকে সাব্যস্ত হয়। নিঃসন্তান ব্যক্তি বলতে বর্তমানে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যার ছেলে সন্তান নেই; অথচ কোরআন শরিফে সন্তান বলতে পুরুষবাচক কোনো শব্দ উল্লেখ করা হয়নি। সে হিসেবে একজন মেয়ে সন্তান থাকলেও মৃতের সম্পত্তি তার ভাই-বোনদের কাছে যাবে না বলেই এ আয়াত থেকে সাব্যস্ত করা সম্ভব। সুতরাং, মৃতের ছেলে সন্তানের অবর্তমানে যে সম্পত্তি বর্তমানে মৃতের ভাইবোন বা দূরের কোনো আত্মীয়ের কাছে চলে যাচ্ছে, তা কন্যাসন্তানের অনুকূলে প্রদান করে বিশেষ আইন করার পক্ষপাতী বাংলাদেশ আইন কমিশন।


পুত্রসন্তানের অবর্তমানে কন্যাসন্তানের কাছে পুরো সম্পত্তি না গিয়ে মৃতের তুলনামূলক দূরবর্তী আত্মীয়ের কাছে সম্পত্তি চলে যাওয়ার এ-ধারণা কি কোরআন শরিফে নির্দিষ্টভাবে বর্ণিত আছে? এ-ব্যাপারে ইসলামি উত্তরাধিকার আইন বিশেষজ্ঞ মো. ইমদাদুল্লাহ বলেন (দৈনিক যায় যায় দিনকে), কোরআন শরিফে কেবল নারীদের নির্দিষ্ট অংশ দেওয়া হয়েছে। সূরা নিসায় পুত্রসন্তানের অবর্তমানে কন্যাসন্তানদের জন্য উত্তরাধিকার সম্পত্তির সর্বোচ্চ দুই-তৃতীয়াংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পুত্রসন্তান না থাকলে কন্যাসন্তানকে নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর বাকি সম্পত্তি কোথায় যাবে, সে ব্যাপারে কোরআন শরিফে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। মূলত হাদিসের মধ্য দিয়ে এ বিধান সাব্যস্ত হয়েছে।


ধরুন, হাদিসে থাকলই। আমরা হাদিসের সব আইন কি এখনও রাষ্ট্রীয়ভাবে মানি? এই যে কুরআনে বলা হয়েছে, একজন পুরুষের সাক্ষ্য দুজন নারীর সমান। [২নং সূরা আল-বাকারার ২৮২ নং আয়াত] এটা কি এখন বাংলাদেশের কোর্টে বা বিচারব্যবস্থায় মানা হয়? না-হলে, এই যুগ-অনুপযোগী সম্পত্তি আইন মানা হবে কোন যুক্তিতে? তাছাড়া ইজমার অপশন কুরআনেই আছে। সুরা ইউনুসের ৭১নং আয়াতে উল্লেখ আছে : তথা তোমরা তোমাদের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত করো। রাসূলুল্লাহ(সা.) বলেন, আমার উ€§তের কাছে যা ভালো আল্লাহর কাছেও তা ভালো। ইমাম আবূ হানীফা (র.) বলেন, “শরীয়াতের কোন হুকুমের ব্যাপারে একই যুগের সকল মুজতাহিদদের একমত হওয়াকে ইজমা বলে।” অর্থাৎ ইসলামি প-িতরা ইসলামের ভেতর থেকেই এর সুরাহা করতে পারেন।
জানি, যাদের পুত্রসন্তান আছে, তারা এটা নিয়ে ততটা উচ্চবাচ্য করবেন না। কিন্তু যাদের কেবল কন্যাসন্তান আছে, তাদের উচিত কথা বলা। আপনি আপনার মেয়েকে বেশি ভালোবাসেন নাকি ভাইয়ের ছেলেকে? এটা কেবল নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপার না, আপনি পুরুষ, পিতা হিসেবে আপনার অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ও এর সঙ্গে জড়িয়ে। আপনি পুরুষ বলেই কি নিজের মেয়ের হক অন্য একজন পুরুষের হাতে তুলে দেবেন?
আমি নিজের পরিবার থেকে একটা উদাহরণ দিতে পারি। আমার বড়ভাইয়ের তিনকন্যা সন্তান। মেজভাইয়ের দুই ছেলে। বড়ভাই সারাদিন খেটে খেটে নিজের সম্পত্তি তৈরি করছেন আর মেজভাই বসে বসে পা দোলাচ্ছেন সেই সম্পত্তির ভাগ নেবেন বলে। লোকজনকে তিনি বলেনও সে-কথা। বড়ভাই হুজুর বলে হয়ত ইসলামি এই আইনের পরিবর্তন চাইবেন না; কিন্তু আমি নিশ্চিত, তিনি এই আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে বের করবেন বা ইতোমধ্যে বিকল্প ভেবে ভাবির নামে কিছু সম্পত্তি লিখে দিয়েছেন। 


মেয়েদের পিতার সম্পত্তিতে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারলে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই মঙ্গল। সাধারণত স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া হলে স্বামী বলে ফেলেন, ‘ভালো না লাগলে তুমি আমার সংসারে থেকো না’। বা স্ত্রী রাগের বশে বলেন, ‘থাকো তোমার সংসার নিয়ে’। কিন্তু স্ত্রী যাবেন কোথায়? বাবার বাড়ি তো এখন তার ভাইদের বাড়ি। আবার ঘরছাড়া হলে স্বামীর বাড়িও তার নিজের বাড়ি থাকে না। নারীর এই নিরাপত্তাহীনতার কারণ হলো তার সম্পত্তিতে সমান অধিকার না থাকা। আমি মনে করি, উপরের বিষয় ছাড়াও, সবক্ষেত্রে পিতা-মাতার সম্পত্তিতে ছেলেমেয়ের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক। আমার বোন যেমন পৈতৃকসূত্রে আমার সমান সম্পত্তি পাবেন, আমার স্ত্রীও তেমন তার পৈতৃকসূত্রে তার ভাইদের সমান সম্পত্তি পাবেন। আমি তো সমস্যার কিছু দেখছি না। পৈতৃক সম্পত্তিকে নারীপুরুষের সমাধিকার না থাকার কারণে দেখা যাবে দেশের যাবতীয় সম্পত্তি, জমির মালিকানা সিংহভাগই পুরুষের। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। নারীপুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজগঠনে দেশের ব্যক্তিমালাকানাধীন অর্ধেক সম্পত্তির মালিকানা নারীদের হওয়ার কথা। সেটি যদি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তাহলে দেশের নারীপুরুষের অন্যান্য ক্ষেত্রেও যে ব্যবধান ও বৈষম্য এবং সামাজিক-পারিবারিক নারী নিযাতনের চিত্র তাতে আমূল পরিবর্তন চলে আসবে। 


সবশেষে বলি, যে-কোনো বিবেচনায়, পৈতৃক সম্পত্তিতে ছেলেমেয়ের সমাধিকার অবশ্যই থাকা উচিত। এরজন্য এত যুক্তি দেখানোর প্রয়োজন আদৌ আছে কি?