ভারতীয় ফ্যাশন জগতে সাইজ নিয়ে একচোখা ভাব!

ভারতীয় ফ্যাশন জগতে সাইজ নিয়ে একচোখা ভাব!
ভারতীয় ফ্যাশন জগতে সাইজ নিয়ে একচোখা ভাব!
কল্পনা করুন শপিংমলে গিয়ে সাজিয়ে রাখা পোশাকটি আপনার পছন্দ হয়ে গেল। কিন্তু কিনতে গিয়ে আপনি জানতে পারলেন যে এই পোশাকটি আপনার সাইজের নয়, আবার আপনার সাইজের মাপে এই পোশাক তৈরিই করা হয়নি। কেমন লাগবে তখন আপনার? এসব পরিস্থিতি শুধু গ্রাহকের আত্মবিশ্বাসকেই হ্রাস করে না বরং অনেকের আত্মসম্মানও হ্রাস করে এবং শপিংকে একটি ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা দেয়। 

ফ্যাশন জগতে প্লাস সাইজ নারীদের প্রতিনিয়ত সম্মুখীন হতে হয় নানা প্রতিকূলতার। শুধু ফ্যাশন জগতেই নয় এখনো অনেক নারী আছেন যারা রানওয়ে থেকে দুরে থেকেও নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী আরামদায়ক পোশাক খোঁজার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ক্রমাগত পরিবর্তনশীল ফ্যাশন দুনিয়ায় এ লড়াই একটু জটিলই বটে।

 

চেন্নাইয়ের একজন প্লাস সাইজ মডেল বর্ষিতা থাথাবর্থী এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার গল্প তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "আমাকে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে আমার নিজের পোশাকে শ্যুট করার জন্য বলা হয়েছিল। আমি যখন সেটআপে আসি তখন দেখতাম যে পাতলা মডেলদের জন্য আকর্ষণীয় পোশাক সাজিয়ে রাখা আছে।" 

 

 

২০১৯ সালে তিনি বিখ্যাত সব্যসাচী মুখার্জীর ব্রাইডাল ক্যাম্পেইনে প্রথম শ্যুট করেছিলেন। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিন লাল লেহেঙ্গা এবং চমৎকার গহনাতে বর্ষিতার অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার হয়েছিল। সেদিন তিনি অনেক প্লাস সাইজ মেয়েদের কাছেই অনুপ্রেরণা হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তার অনেক ফলোয়ার তাকে ‘brand for tokenism in casting a curvier model’ হিসেবে সম্বোধন করে থাকে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে প্লাস সাইজ মডেল হওয়া আশ্চর্যর কিছু নয়। 

 

সব্যসাচী মুখার্জীর তত্ত্বাবধানে তিনি বেশ কয়েকবার ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করেছেন। সিকুইনড ককটেল শাড়ী থেকে শুরু করে অলঙ্কৃত জ্যাকেট পর্যন্ত প্রায় সব পোশাকেই তাকে দেখা গিয়েছে। তবে সেই সাথে ইন্ডাস্ট্রিতে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীনও হতে হয়েছে তাকে।

 

 

পরিসংখ্যান পোর্টাল ‘স্ট্যাটিস্টা’ বলছে যে, ভারতের মোট গ্রাহকের প্রায় অর্ধেক অংশ ‘প্লাস সাইজ’ গ্রহণ করছে। যাদের স্ট্যান্ডার্ড সাইজ ০-১২ এর বাইরে। “ফ্যাশনে বর্তমানে ১২ শতাংশ প্লাস সাইজ রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তা বৃদ্ধি পেয়ে ২৫ শতাংশে দাঁড়াবে। প্লাস সাইজের জন্য একটি বড় অব্যাহত বাজার রয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলির সাথে যেগুলোর বাজার আরও গভীর সম্ভাবনা রয়েছে” 2019 সালে ফোর্বসের এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন ম্যান্ট্রা জাবংয়ের প্রধান অমর নাগরাম।

 

দৈনন্দিন ক্ষেত্রে বেশিরভাগ মহিলাদের ক্ষেত্রে কেনাকাটা একটি মনোরম অভিজ্ঞতা। কেনাকাটা ক্রেতাদেরকে মানসিক ও আবেগিক প্রশান্তি দেয়। কিন্তু কল্পনা করুন শপিংমলে গিয়ে সাজিয়ে রাখা পোশাকটি আপনার পছন্দ হয়ে গেল। কিন্তু কিনতে গিয়ে আপনি জানতে পারলেন যে এই পোশাকটি আপনার সাইজের নয়, আবার আপনার সাইজের মাপে এই পোশাক তৈরিই করা হয়নি। কেমন লাগবে তখন আপনার? এসব পরিস্থিতি শুধু গ্রাহকের আত্মবিশ্বাসকেই হ্রাস করে না বরং অনেকের আত্মসম্মানও হ্রাস করে এবং শপিংকে একটি ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা দেয়। 

 

 

পার্ল একাডেমির সহযোগী অধ্যাপক নীলাক্ষী সিং এবং একটি ফ্যাশন ব্লগার জানান, “খুব ছোট থেকেই শপিংয়ের ক্ষেত্রে আমাকে এক প্রকার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে হত। সেলস রিপ্রেজেন্টেটিসের কাছে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার সময় এক প্রকার অস্বস্তিতে পড়তে হত আমাকে। সেই সময় ডিজাইনার এবং ব্র্যান্ডগুলি আমার নাগালের বাইরে ছিল। আজ, যদিও আমি নিয়মিত ডিজাইনারদের সাথে যোগাযোগ করি এবং সেগুলিতে অ্যাক্সেসও পাই তবে আমার আকার তাদের জন্য এখনও বাধা হয়ে আছে। তারা সকলে হাতা যোগ করে, চেরা নামিয়ে বা  অন্য কোনভাবে পোশাককে আমার শরীরে ফিট করিয়ে পরিবর্তিত পোশাক তৈরির পরামর্শ দেয়।” 

 

কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও ব্র্যান্ড কনসালটেন্ট স্পর্ধা মালিক বলেন, “বছরের পর বছর থেকে ব্র্যান্ডগুলো ওভার সাইজ পোশাকের জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে আসছে। লার্জ সাইজের উপরে গেলেই তাদের জন্য গুণতে হয় অতিরিক্ত অর্থ।  এটি সচেতনতার অভাব থেকে আসে। আমার মতে, বেশিরভাগ ব্র্যান্ডগুলি এমন মহিলাদের সাথে নিজেকে যুক্ত করতে চায় না যা তাদের আদর্শ সৌন্দর্যের সাথে মানায় না। ফ্যাট ট্যাক্স মহিলাদের পোশাক পরিধান থেকে নিরুৎসাহিত করার একটি উপায়। এটি আপনার বাজার এবং চাহিদা বোঝার ব্যর্থতা। এছাড়াও দেহের আকার বাড়ার সাথে সাথে তাদের প্যাটার্ন কাটার বিষয়ে আরও কাস্টমাইজড পদ্ধতির প্রয়োজন, এবং ডিজাইনাররা কীভাবে পুরো নতুন বিভাগে মাপসই আকার বাড়াতে পারে এসব বিষয়ে গবেষণা করতে চান না তারা।”

 

 

সাইজ ইন্ডিয়া

 

2019 সালের জানুয়ারিতে ভারতের কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী স্মৃতি ইরানি ঘোষণা করেছিলেন যে খুব দ্রুত ‘সাইজ ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের আওতায় ভারতের নিজস্ব স্ট্যান্ডার্ডে পোশাকের চার্ট থাকবে। আমেরিকান এবং ইউরোপীয় আকারের ব্যতিক্রম এই চার্টে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এবং দেশে উপলব্ধ ভারতীয় ব্র্যান্ডগুলিকে প্রাধান্য দেয়া হবে যা দেশেই পাওয়া যাবে। একটি গবেষণা দল ছয়টি শহরে ১৫ থেকে ৬৫ বছরের ২৫,০০০ লোকের শরীরে 3D –র মাধ্যমে স্ক্যানারের মাধ্যমে স্ক্যান করবে। এই নতুন আকারের চার্টটি কেবলমাত্র ভারতীয় শরীরের নির্দিষ্টকরণের সাথে পোশাক তৈরি করতেই সহায়তা করবে না, গার্মেন্টসের ও ডিজাইনারদের পোশাকগুলিকে আরও সঠিক আকারে তৈরি করতেও সহায়তা করবে। ২০২১ সালের মধ্যে এই চার্টটি প্রকাশের প্রয়াসের সাথে প্রকল্পটি শুরু হলেও এটি কবে লঞ্চ হবে তা নিয়ে কিছু জানা যায়নি।

 

কনের পোশাক

 

বডি সাইজ নিয়ে প্রত্যহ খুচরা কটু অভিজ্ঞতার পর একবার ভাবুন তো বিয়ের ফ্যাশনে তাকে আবার কি পরিস্থিতিতে পড়তে হয়! ভারতে প্রতি বছর বিয়ের ফ্যাশন বিভাগে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়ে থাকে। ইউরোমনিটর আন্তর্জাতিক এর মতে, ভারতে বিবাহের জন্য বিলাসবহুল ফ্যাশন বিভাগটি আগামী পাঁচ বছরে ২০.৩ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার নিবন্ধন করবে। ভারতীয় বিয়েতে বড় জমায়েত ও খাদ্যের পিছনে বেশ ভালো অর্থ খরচ হলেও খরচের মূল কেন্দ্র থাকে কিন্তু কনের পোশাকই।

 

মহামারি শুরুর পূর্বেই মালিক মহা ধুমধামে বিয়ে করেছিলো। মালিক জানায়, “বিয়ের শপিং সবচেয়ে কষ্টের অভিজ্ঞতা ছিল আমার। এমন কোন ডিজাইনার প্রায় ছিলইনা যে কিনা আমার সাইজ ও পছন্দ মতো আমার বিয়ের পোশাক ডিজাইন ও তৈরি করবে। উল্টো তাদের কাছে বারবার অপমানিত হতে হয়েছে আমাকে। পোশাক ফিট করার জন্য আমাকে বারবার ওজন কমানোর জন্য বলা হতো, যাতে ঐ পোশাকে আমাকে মানায়। লক্ষের ওপর অর্থ খরচ করেও আমি আমার মতো কোন পোশাক পাচ্ছিলামনা। আমার মতে, প্রতিটি ব্র্যান্ডেরই প্লাস সাইজের কিছু ডিজাইনার পোশাক রাখা উচিত তাদের জন্য, যারা বিয়ের পোশাকে লক্ষ লক্ষ রুপি খরচ করে।

 

অতিরিক্ত অর্থ আদায়

 

রিক্সি ভাটিয়া বলেছেন, “কাস্টমারের শারীরিক আকারের উপর ভিত্তি করে ডিজাইনাররা অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করে তাদের ওপর। ফলে একজন প্লাস সাইজ নারীকে একজন জিরো ফিগার নারীর থেকে গুণতে হয় অনেক বেশি অর্থ। একই ডিজাইনের একই পোশাক বানালেও মোটা ব্যক্তিকে গুণতে হয় অতিরিক্ত অর্থ। এক্ষেত্রে হয় কি, তারা তাদের ডিজাইন অনুযায়ী যে নমুনাগুলো তৈরি করেন সেখানে প্লাস সাইজকে কোন জায়গা দেয়া হয়না। সুতরাং কোন ক্রেতার যদি কোন পোশাক পছন্দ হয়ে যায় আর তিনি সেই পোশাকে ফিট না হয় তাহলে তার জন্য একটি এক্সট্রা পোশাক বানাতে হয়। আর এক্ষেত্রে ডিজাইনার অতিরিক্ত মূল্য চেয়ে বসে। আর ক্রেতাকে বাধ্য হয়ে তা দিতে হয়। কারণ তার সাইজের পোশাক নেই। কিন্তু ব্র্যান্ড হিসাবে, আপনি যদি একটি বিবিধ গ্রাহক বেস চান, আপনি বৈষম্য করতে পারবেন না। একটি সার্বজনীন গোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে পোশাক তৈরি করুন।”

 

অনেক ব্র্যান্ড দাবি করে যে, বড় সাইজের পোশাকের জন্য অতিরিক্ত ফ্যাব্রিক প্রয়োজন, কিন্তু নীলাক্ষি সিং বলেছেন যে, পেটাইট সাইজের পোশাক তৈরি করতে কম ফ্যাব্রিক ব্যবহৃত হয়। অনেক যুবতী কনে তাদের স্বপ্নের পোশাক কেনার জন্য সারাজীবন অর্থ সাশ্রয় করে, কেবলমাত্র তাদের সাইজের উপর ভিত্তি করে একটি পারফেক্ট পোশাকের জন্য। কিন্তু ডিজাইনারদের থেকে কটু আচরণ ও কথা অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করে।

 

 

ভারতের বিখ্যাত ও জনপ্রিয় ডিজাইনার অমিত আগরওয়াল বলেছেন, “ক্লায়েন্টদের মনবাসনা পূর্ণ করতে আমাদের বিভিন্ন ধরনের বিভিন্ন সাইজের পোশাক তৈরি করতে হবে। বডি অনুযায়ী প্রত্যেকের জন্য তৈরি পোশাকগুলি ব্যক্তিগত পছন্দগুলির উপর নির্ভর করে তারতম্য করে। আমাদের মতো ব্র্যান্ডের কাছ থেকে বা কোন নামীদামী ডিজাইনার যদি অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে থাকে, তাহলে তার ক্লায়েন্টের অনুরোধ অনুযায়ী এবং তারা কেমন যায় কীভাবে চায়, কি চায়না, পারফেক্ট সাইজের পোশাক তৈরি করে দিতে হবে। আমি বিশ্বাস করি যদি যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকে তবে আমরা এর সমাধান খুঁজে পেতে সক্ষম হবো। এক্ষেত্রে ক্লায়েন্টকেও ফ্রেন্ডলি হতে হবে।"