মাতৃভূমি: এ ল্যান্ড উইদাউট উইমেন

মাতৃভূমি: এ ল্যান্ড উইদাউট উইমেন
ছবিটি শুরু হয় আৎকে ওঠার মতো একটি দৃশ্য দিয়ে একটি শিশুর জন্ম হচ্ছে ভারতের বিহারের ছোট্ট এক গাঁয়ে। বাড়িজুড়ে মানুষ। উঠোনে নাদাভর্তি গরুর দুধ। জন্মানোর পরপরই শিশুটিকে সেই সেই দুধে গোসল করানোর কথা। সবাই অপেক্ষা করছে শুভ সংবাদ শোনার জন্য। ঘোষণা এলো শিশুর জন্ম হয়েছে; তবে ছেলে নয়, মেয়ে শিশু। বিধি বাম! সঙ্গে সঙ্গে উঠোনভর্তি মানুষ নিমিষেই নেই হয়ে গেল। শিশুপিতা শিশুকে তুলে এনে দুধের নাদায় ডুবিয়ে ধরে থাকলো কিছুক্ষণ। ৩০ সেকেন্ডে সবশেষ। শিশুটি জন্মানো মাত্রই মৃত।

 

পৃথিবীতে আসা মাত্রই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার নির্মম বলি হল সে। ‘বাইসাইকেল থিপ’ সিনেমায় ছেলের সামনে বাবার চোর হিসেবে সাব্যস্ত হওয়ার দৃশ্যটি যদি হয় সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্য, ‘সিনডলাার লিস্ট’ সিনেমায় সিনডলারের হাতের আংটি দেখিয়ে এইটা না রাখতে আমি হয়ত আরো ক’জনকে বাঁচাতে পারতাম (নাৎসি ক্যাম্প থেকে) বলার দৃশ্যটি যদি হয় সবচেয়ে মানবিক দৃশ্য, তাহলে বলতেই হয়, এই সিনেমার শিশুহত্যার দৃশ্যটি চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে নারকীয় দৃশ্য।

 

এমন একটি অমানবিক দৃশ্যের ভেতর দিয়ে শুরু হয় ভারতীয় পরিচালক প্রকাশ ঝার ছবি মাতৃভূমি, যার ইংরেজি সাবটাইটেল, ‘এ নেশন উইদাউট উইমেন’। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড স্বরে বলা হয় “প্রতিদিন ভারতে হাজার হাজার ভ্রূণ ও শিশুহত্যা করা হয়। এই সব শিশুদের অপরাধ তারা কন্যাশিশু। কারণ, একটা মোটা অংকের যৌতুক ছাড়া বিয়ে হয় না তাদের, ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে চাই না কেউ। এই অপরাধ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে?”

 

এরপর সিনেমার গল্প এগুতে থাকে। আমরা উপস্থিতি হয় ভবিষ্যতের এক গ্রামে। খুন হতে হতে নারীশূন্য হয়ে পড়েছে গ্রামটি। এরপর হাস্যরসের ভেতর দিয়ে স্যাটায়ার করা নারীশূন্য জেনারেশনের যৌন কর্মকাণ্ডকে। যুবকরা পর্নোভিডিও দেখে গরুর গোয়ালে ঢুকে যায়। নারী অভাবে ১৫ বছরের ভেতর গ্রামে কোনো বিয়ে হয় না। বিপত্নীক রামসারান-এর পাঁচ ছেলের মধ্যে বড় ছেলের জন্য বিয়ের পাত্রী খোঁজা হচ্ছে। এরপর একদিন পাশেই মাঠে এক বাবা তার কুমারী মেয়েকে গ্রাম থেকে বাঁচিয়ে গোপনে বসবাস করার খবর আসে রামসারানের কাছে। রামসারান তার বড় ছেলের জন্য যান ওই বাবার কাছে। বাবা প্রথমে রাজি না হলে চাষের জমি, নগদ টাকা আর হালের গরু দিয়ে রাজি করানো হয়। আসবার সময় রামসারান বলে আমাদের সময় মেয়ের বিয়েতে ছেলেকে এসব (টাকা-জমি) দিতে হতো, আর এখন মেয়ের বাপকে দিতে হচ্ছে! কালকি নামের ওই মেয়েকে ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে বাড়ি তোলেন রামসারান। কালকি চরিত্রে অভিনয় করেছেন টিউলিপ জোশি।

 

সবচেয়ে ছোটছেলের সঙ্গে কালকিকে বিয়ে দিয়ে ঘরে তুললেও আসলে তাকে আনা হয় পুরো পরিবার এমনকি গ্রামের অন্যসব পুরুষদের জন্যও! এখানে উপহাস হল কালকির বাবা কালকি ছোটো বলে রামসারানের বড় ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে আপত্তি তোলেন। এরপর তিনি ছোটো ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিলেও তার অজান্তেই তিনি মেয়ের বিয়ে দেন একগ্রাম পুরুষের সঙ্গে! কালকিকে বাড়ি তুলেই কে কতরাত কালকির সঙ্গে থাকবে সেই ভাগাভাগিতে বসে রামসারানের পাঁচ ছেলে। রামসারান নিজের নামও প্রস্তাব করেন সেই ভাগাভাগিতে। বস্তুত, পিতা হিসেবে ছেলের বিবাহিত স্ত্রীর সঙ্গে তিনিই প্রথম রাত্রিযাপন করেন। এরপর শুরু হয় কালকিকে পালাক্রমে ধর্ষণ। প্রায় গ্রামসুদ্ধ মানুষ একটা অল্পবয়সী মেয়েকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করে চলে। কালকিকে ভালোবাসার অপরাধে রামসারানের এক ছেলেকে হত্যা করে অন্য ছেলেরা। কালকি অন্তঃসত্ত্বা হলেও তাকে ধর্ষণ চালিয়ে যাওয়া হয়। পরে অন্তঃসত্ত্বার খবর প্রকাশ পেলে পিতৃত্বের দাবি তোলে প্রায় সকলেই। শেষ পর্যন্ত পিতা রামসারানের দাবির কাছে চুপ মেরে যায় ছেলেরা। পিতৃত্বের দাবি নিয়ে দুই মহল্লার বিবাদ বাধে। বিবাদ থেকে হানাহানি-খুনোখুনি। এরইমাঝে কালকি সন্তান প্রসব করে বলাই বাহুল্য কন্যাসন্তান। ভাগ্যের কি পরিহাস যে সন্তানের জন্য একদিন সকলেই মুখ ফিরিয়ে নিতো আজ সেই সন্তানের পিতৃত্বের দাবিতে সকলে খুনোখুনি করছে। এরই ফাঁকে, মেয়েকে নিয়ে সটকে পড়ে কালকি।

 

এমনই এক সাহসী চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন পরিচালক মনিষ ঝা। মুক্তি পায় ২০০৩ সালে, বাংলাসহ পাঁচটি ভাষায় ডাব করে। কেন্দ্রিয় চরিত্রে টিউলিপ জোশি ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুশান্ত সিং, আদিত্য শিবাস্তব ও পিযুষ মিশ্র।

 

ছবিটি বিশ্বব্যাপী সাধুবাদের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়। প্রদর্শিত হতে থাকে একের পর এক চলচ্চিত্র উৎসবে। ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কৃতও হয়। ছবিটি সম্পর্কে পরিচালক প্রকাশ জানান, তিনি একদিন গুজরাটের নারীশূন্য হতে যাওয়া এক গ্রামের খবর পেপারে পড়েন। এরপরই তার মাথায় এই ছবির আইডিয়াটা আসে।