ভগ্ন হৃদয়ের গল্প

দিল বেচারা
নক্ষত্রের নাম- সুশান্ত সিং রাজপুত! এই রাজপুত অভিনেতা মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই, তার ইচ্ছে পূরণের হালখাতাকে মাঝপথে ফেলে চাঁদের দেশে পাড়ি জমালেন। মফস্বল থেকে উঠে আসা এক তরুণ প্রতিভা, ফিজিক্স অলিম্পিয়াড চ্যাম্পিয়ন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের র‍্যাংকার ছেলেটি টেলিভিশনের তুমুল জনপ্রিয়তার গণ্ডি পেরিয়ে মাত করেছিলেন বলিউড। তার অর্জনের গল্প ঠিক রূপকথার মতো আলো ছড়িয়েছিলো। কিন্তু, জীবনটা তো আর রূপকথা নয়। প্রয়াণের এক মাস ১০ দিন পর মুক্তি পেলো তার অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র 'দিল বেচারা', সেটাও তথাকথিত রূপকথায় মোড়ানো নয়। পুরো গল্প জুড়ে সুশান্ত প্রতিকূলতায় হারিয়ে না গিয়ে জীবনটাকে উপভোগ্য করে তুলতে বলেছেন; যেমনটা তার 'ছিছোড়ে' চলচ্চিত্রেও।


মধ্য দুপুর। ১৪ জুন ২০২০। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পরা খবরটি যেন ভুল হয় এই প্রত্যাশায় গুগলের সার্চ ইঞ্জিনে ঝড় তুলেছিকেন অনেকেই। কিন্তু, নক্ষত্রের ভালোবাসায় ডুবে থাকা এক নক্ষত্রের পতনের খবর ভুল ছিলো না।
 

নক্ষত্রের নাম- সুশান্ত সিং রাজপুত! এই রাজপুত অভিনেতা মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই, তার ইচ্ছে পূরণের হালখাতাকে মাঝপথে ফেলে চাঁদের দেশে পাড়ি জমালেন। মফস্বল থেকে উঠে আসা এক তরুণ প্রতিভা, ফিজিক্স অলিম্পিয়াড চ্যাম্পিয়ন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের র‍্যাংকার ছেলেটি টেলিভিশনের তুমুল জনপ্রিয়তার গণ্ডি পেরিয়ে মাত করেছিলেন বলিউড। তার অর্জনের গল্প ঠিক রূপকথার মতো আলো ছড়িয়েছিলো। কিন্তু, জীবনটা তো আর রূপকথা নয়। প্রয়াণের এক মাস ১০ দিন পর মুক্তি পেলো তার অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র 'দিল বেচারা', সেটাও তথাকথিত রূপকথায় মোড়ানো নয়। পুরো গল্প জুড়ে সুশান্ত প্রতিকূলতায় হারিয়ে না গিয়ে জীবনটাকে উপভোগ্য করে তুলতে বলেছেন; যেমনটা তার 'ছিছোড়ে' চলচ্চিত্রেও।


'দিল বেচারা' জন গ্রিনের বেস্ট সেলার উপন্যাস ' ফল্ট ইন আওয়ার স্টারস' বইটির অবলম্বনে তৈরি।


পরিচালনায় প্রথমবার বলিউডে পা রাখছেন মুকেশ ছাবড়া এবং সুশান্তের বিপরীতে রয়েছেন নবাগত সঞ্জনা সাংঘি। এছাড়াও এতে সাবলীল অভিনয়ে দেখা গেছে টলিউডের বড় পর্দার অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় এবং শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়কে। সেই সাথে একটি দৃশ্যে অতিথি শিল্পী হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে সাইফ আলী খান বরাবরের মতোই নজর কেড়েছেন দর্শকদের। চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনায় ছিলেন এ আর রহমান।


'দিল বেচারা' মুক্তির পূর্বেই রেকর্ড ভেঙেছে, শুধুমাত্র ট্রেলার মুক্তির ২৪ ঘণ্টার মাঝেই অ্যাভেঞ্জার্স এন্ডগেমের রেকর্ড ভেঙ্গে সর্বোচ্চ লাইক প্রাপ্ত ট্রেলার হিসেবে ইউটিউবে জায়গা করে নিয়েছে। সিনেমাটি ডিজনি প্লাস হটস্টারে সরাসরি মুক্তি পেয়েছে। অভিনেতার অকাল প্রয়াণকে সম্মান প্রদর্শনের জন্যই এই প্রথমবার ওটিটি প্ল্যাটফর্মে একেবারে বিনামূল্যে চলচ্চিত্র উপভোগের সুযোগ পেলেন দর্শকরা।  


প্রিয় অভিনেতাকে শেষবার স্ক্রিনে দেখার বিষাদ- হর্ষে মিলিত আবেগে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন লক্ষ-কোটি ভক্ত হৃদয়। মুক্তির পর চলচ্চিত্রটির আইএমডিবি রেটিং ৯.৯।

 

 


গল্পটা ছিমছাম সাধারণে মোড়া। জীবন এবং মৃত্যুর মতো অমোঘ সত্যের উপর ভিত্তি করে গড়া এক সত্যিকারের রূপকথা কম বাস্তবতার গল্প। যেখানে নক্ষত্রের ভ্রমে প্রণয়ের মিষ্টি রূপকথা গড়ে উঠলেও পিছু ছাড়েনি বাস্তবতার করাঘাত।


জামসেদপুরের ছোট্ট গণ্ডির মাঝে বেড়ে ওঠা ক্যান্সার আক্রান্ত কিজি বসু, ঔষুধ, অক্সিজেন সিলিন্ডার, টেস্ট আর হাসপাতালের করিডোরে যার জীবনটা বিষণ্ণতায় অবরুদ্ধ । সেখানে মুক্ত বাতাসের মতো এক ঝটকায় তার জীবনের গল্প বদলে দিতে পর্দায় প্রবেশ করে ইম্যানুয়েল রাজকুমার জুনিয়র ওরফে ম্যানি। প্রাণ শক্তিতে ভরপুর এই যুবকও কিন্তু ভাগ্য বিড়ম্বিত, ব্যোন ক্যানসারে ভুগে ইতিমধ্যেই হারিয়েছে একটি পা। কিন্তু সাহসী এই যোদ্ধা মৃত্যু খুব সন্নিকটে জেনেও জীবনটাকে উপভোগ্য করে তুলবার অদম্য ইচ্ছাতে সামিল করে নেয় অবসাদগ্রস্ত কিজি বসুকে। কিজি যে স্বাভাবিক জীবনের প্রত্যাশা স্বপ্নেও ভুলতে বসেছিলো ম্যানি সেই সেই স্বপ্নের ক্যানভাসে ঢেলে দিয়েছিলো রংধনুর সব গুলো রং। প্রেয়সীর ইচ্ছে পূরণে সুদূর প্যারিসে পাড়ি জমাতেও দ্বিধা করেনি সে।


তবে স্বপ্ন দৈর্ঘ্যের এই চলচ্চিত্রের প্রতিটি কোণ জুড়ে প্রতিকূলতার মাঝেও মুখে হাসি ফুটিয়ে বেঁচে থাকবার মূলমন্ত্র ছড়ানোর পাশাপাশি প্রিয়জনের পাশে বেঁচে থাকবার প্রচণ্ড আকুলতাও প্রকাশ পেয়েছে ম্যানির চরিত্রে। যেই আকুলতা কোথায় যেন রিল লাইফের গণ্ডি পেরিয়ে ব্যক্তি সুশান্তের জীবনের গল্পে কড়া নাড়ে। চলচ্চিত্র জুড়ে বলা সুশান্তের প্রতিটি সংলাপ যেন রিল- রিয়েল লাইফের মিশেলে তৈরি এক অদ্ভুত ঘোর তৈরি করে।

 


সেই ঘোরে শেষ কুড়ি মিনিট চোখের কোণে জমে উঠবে জল, একি সত্যিই সিনেমা! নাকি সত্যিই অভিনেতার বাস্তব জীবনের শেষযাত্রার উদযাপন, এ দৃশ্যে অভিনেতার অশ্রুসিক্ত চেহারা ভক্ত হৃদয়ে তুলবে তুমুল আলোড়ন। কি সাবলীল অভিনয় তাঁর, পার্শ্ব চরিত্রে নবাগত সঞ্জনা সাংঘির অভিনয়ও স্বাভাবিক সৌন্দর্য বজায় রেখেছে। ক্যান্সার আক্রান্ত উৎকণ্ঠিত মা- বাবার চরিত্রে স্বস্তিকা -শ্বাশত'র অভিনয় অনবদ্য। সাইফ আলি খানও অল্প সময়ে তার চরিত্রের আকুলতা ফুটিতে তুলছেন সাবলীলভাবে। চলচ্চিত্রের দৃশ্যয়ানও নজর কেড়েছে। এ আর রহমানের পরিচালনায় গানগুলো পুরো চলচ্চিত্রের আবহ তৈরির গাঁথুনিকে মজবুত করেছে।


এ চলচ্চিত্র দেখতে বসে দর্শকের ‘দিল বেচারা’ হয়ে উঠবে দিশেহারা। কখনো ম্যানির হাস্যোজ্জল সংলাপে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠবে হাসি, কখনো চোখ ভিজে যাবে তার কর্কট যন্ত্রণায়, কখনো বা প্রেমের শহর প্যারিসের অলিগলিতে কিজি- ম্যানির প্রণয়ে মন ডুবে যাবে অজান্তেই, অবসাদ- আনন্দ - প্রণয়- প্রিয়জন হারানোর তীব্রতা সব মিলিয়ে পরিপূর্ণ এই প্যাকেজ দর্শককে নিরাশ করবে না।


যদিও চলচ্চিত্রটি মুল বই এর ভাবগাম্ভীর্য থেকে ভারতীয় ধাঁচে প্রকাশের টানাপোড়েনে কিছুটা সরে এসেছে। তবে চিত্রনাট্যের ছোট খাটো সকল ভুল-ভ্রান্তি যে আবেগে চাপা পড়ে যায় তাঁর নাম 'সুশান্ত সিং রাজপুত'। তথাকথিত হিট-ফ্লপের গণ্ডি পেরিয়ে চলচ্চিত্রটি হয়ে উঠেছে প্রিয় অভিনেতার আধখানা অধরা জীবনের এপিটাফ।


“পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়
প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রের ও একদিন মরে যেতে হয়।
হয় নাকি?”