চলে গেলেন ফকির আলমগীর

চলে গেলেন ফকির আলমগীর
ফকির আলমগীর
একুশে পদকপ্রাপ্ত এই শিল্পীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, “ফকির আলমগীরের মৃত্যুতে দেশের সঙ্গীত অঙ্গনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হল তা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তাঁর গান তরুণ প্রজন্মের মাঝে দেশপ্রেমের নবজাগরণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।”

ফকির আলমগীর নামটির সাথে পরিচিত নয় এমন লোক হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে নাহ। যার লোকগীতি এখনো প্রতি মানুষের মনে।কাজের শৈলীতে তিনি ছিলেন অনন্য। মানুষটির গানের জাদু বশ করেছে সকলকে। না ফেরার দেশে পারি জমালেন এই গুণী মানুষটি। 


ফকির আলমগীর ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার কালামৃধা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মো. হাচেন উদ্দিন ফকির, মা বেগম হাবিবুন্নেছা। ফকির আলমগীর কালামৃধা গোবিন্দ হাই স্কুল থেকে ১৯৬৬ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। তিনি জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। পরবর্তী পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় এমএ পাস করেন। ১৯৬৬ সালে ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের সদস্য হিসেবে ছাত্র রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী ও গণশিল্পী গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে ষাটের দশকে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সঙ্গীত বলয়ে প্রবেশ করেন। 


৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে শিল্পী একজন শব্দ সৈনিক হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। অবশ্য এর আগে ষাটের দশক থেকেই গণসংগীত গেয়ে আসছিলেন তিনি। ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী ও গণশিল্পী গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে অসামান্য ভূমিকা রাখেন তিনি।

 

ষাটের দশক থেকে গণসংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ফকির আলমগীর। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কেন্দ্রে যোগ দেন তিনি। সংগীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সরকার ১৯৯৯ সালে ফকির আলমগীরকে একুশে পদক দেয়।

 

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তাঁর কণ্ঠের বেশ কয়েকটি গান দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। এর মধ্যে ‘ও সখিনা’ গানটি মানুষের মুখে মুখে ফেরে এখনও। কিংবদন্তি গানের তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে গানটি।


স্বাধীনতার পর ফকির আলমগীর পপ ঘরানার গানে যুক্ত হন। পাশ্চাত্য সংগীতের সঙ্গে বাংলার লোকজ সুরের সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি বহু গান করেছেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ রাষ্ট্রীয় শেরেবাংলা পদক পুরস্কারে তাঁকে ভূষিত করা হয়।

 

একুশে পদকপ্রাপ্ত এই শিল্পীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, “ফকির আলমগীরের মৃত্যুতে দেশের সঙ্গীত অঙ্গনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হল তা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তাঁর গান তরুণ প্রজন্মের মাঝে দেশপ্রেমের নবজাগরণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।”

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর শোকবার্তায় বলেন, “এ দেশের সংগীতাঙ্গনে, বিশেষ করে গণসংগীতকে জনপ্রিয় করে তুলতে তাঁর ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

 

গত বুধবার (১৪ জুলাই) ফকির আলমগীরের শরীরে করোনার সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় থেকেই চিকিৎসা  নিচ্ছিলেন তিনি। তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে তার জ্বর ও শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। এজন্য তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে বৃহস্পতিবার (১৫ জুলাই) দিবাগত রাত ১টায় হাসপাতালের কোভিড ইউনিটে ভর্তির পরপরই তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। পরে রবিবার (১৮ জুলাই) আইসিইউ থেকে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। শুক্রবার (২৩ জুলাই) তার হার্ট অ্যাটাক হয়।

 

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গুলশানের ইউনাইটেড  হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার (২৩ জুলাই) রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন ছেলে মাশুক আলমগীর রাজীব।মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। রাজধানীর খিলগাঁওয়ের তালতলা কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।

 

বাদ জোহর চৌধুরীপাড়া মাটির মসজিদে ফকির আলমগীরের দ্বিতীয় জানাজা হয়। সেখান থেকে দাফনের জন্য মরদেহ তালতলা কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে সকাল ১১টা ১৬ মিনিটে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের পল্লীমা সংসদ প্রাঙ্গণে ফকির আলমগীরের প্রথম জানাজা হয়। এরপর সেখান থেকে তাঁর মরদেহ দুপুর পৌনে ১২টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হয়। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় শহীদ মিনারে ফকির আলমগীরকে নাগরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি দেয়া হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট।

 

মানুষ হয়ত দিনে দিনে ভুলে যাবে এই চিরঞ্জীব শিল্পীকে কিন্তু তার সৃষ্টি‘ও সখিনা’ কিংবা ‘মায়ের একধার দুধের নাম’ গানগুলো এ দেশের মানুষকে ঝাঁকড়া চুলের দরাজ কণ্ঠের এই শিল্পীটির কথা মনে করিয়ে দেবে বারবার।