ভিন্নমাত্রার এক রোমান্টিক কমেডি

ভিন্নমাত্রার এক রোমান্টিক কমেডি
পালাকারই প্রথম যারা বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় একাডেমিক নাট্যচর্চার বাইরে স্টুডিও থিয়েটারচর্চা শুরু করেছিলেন। ২০০৩ সালে বেইলী রোড়ে নিজস্ব থিয়েটার স্টুডিও প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তাদের যাত্রা শুরু হয়। সেসময় বেশ কিছু নান্দনিক নাটক উপহার দিয়েছিলেন। ২০০৭ সালে এসে নানাবিধ কারণে তাদের স্টুডিওটি আর গতিশীল থাকেনি। এ ‘রং লেগেছে’ নাটক নির্মাণে নির্দেশক মূলত স্টুডিও থিয়েটার কনসেপ্টেই এগিয়েছেন। নাট্যচর্চায় ঘরোয়া পরিবেশের মতোই থিয়েটার করার এ স্টুডিও থিয়েটার প্রথাটি বিংশ শতকে উদ্ভাবনের পরপরই সারাবিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পায়। স্টুডিও কনসেপ্ট-এ সাধারণত ছোট পরিসরে স্বল্পব্যয়ে অল্প দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। ্এটি স্বল্পপরিসরে ন্যূনতম সামর্থে তৈরি হয়।

বিরহিনী দময়ন্তী যেমন করে একরূপধারী পাঁচজনের মধ্যে তার প্রেমিককে খুঁজে পেতে সন্ধিহান ছিলেন, তেমনি মেঘমালাদেরকেও রণবীরকে খুঁজে পেতে হতে হয় দ্বিধান্বিত। এমনই রোমান্টিক হাস্যাত্মক নাটক গত ২৮ জুন ২০১৯ শুক্রবার বিকাল ৫.০০ টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়। এ নাটকের নাম ‘রং লেগেছে’। ব্রিটিশ শাসনের কালে কলকাতার দি রয়েল বেঙ্গল থিয়েটার ‘পৌরাণিক পঞ্চরং’ শিরোনামে যে নাটকটি উপস্থাপন করেছেন তার থেকে সংযোজন-বিয়োজন-পরিবর্তন-পরিবর্ধনের মাধ্যমে এ ‘রং লেগেছে’ নাটক। এ নাট্যনবায়ন, পরিকল্পনা ও নির্দেশনা- আমিনুর রহমান মুকুল। এটি পালাকারের স্টুডিও থিয়েটার প্রযোজনা।


পালাকারই প্রথম যারা বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় একাডেমিক নাট্যচর্চার বাইরে স্টুডিও থিয়েটারচর্চা শুরু করেছিলেন। ২০০৩ সালে বেইলী রোড়ে নিজস্ব থিয়েটার স্টুডিও প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তাদের যাত্রা শুরু হয়। সেসময় বেশ কিছু নান্দনিক নাটক উপহার দিয়েছিলেন। ২০০৭ সালে এসে নানাবিধ কারণে তাদের স্টুডিওটি আর গতিশীল থাকেনি। এ ‘রং লেগেছে’ নাটক নির্মাণে নির্দেশক মূলত স্টুডিও থিয়েটার কনসেপ্টেই এগিয়েছেন। নাট্যচর্চায় ঘরোয়া পরিবেশের মতোই থিয়েটার করার এ স্টুডিও থিয়েটার প্রথাটি বিংশ শতকে উদ্ভাবনের পরপরই সারাবিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পায়। স্টুডিও কনসেপ্ট-এ সাধারণত ছোট পরিসরে স্বল্পব্যয়ে অল্প দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। ্এটি স্বল্পপরিসরে ন্যূনতম সামর্থে তৈরি হয়। এ-ধারায় বাণিজ্যিকরণের বিপরীতের নিজেদের থিয়েটারচর্চা, উন্নয়ন বা থিয়েটার নিরীক্ষা বড় হয়ে দাঁড়ায়। নির্দেশক এ-নাটকে স্বল্পপরিসরে রোমান্টিসিজমে হাস্য-রস তৈরি করতে সচেষ্ট ছিলেন। সা€ú্রতিক বিশ্বে নবীনদের শিক্ষামূলক কারণে, নানানিরীক্ষা কিংবা নিজেদের উৎকর্ষ সাধনে এধরনের চর্চা সারাবিশ্বেই অব্যাহত রয়েছে। 
নাটকের গল্পে দেখা যায়Ñ ইন্দ্রের নির্দেশে মদন আর বসন্তদেব বেশ ধারণ করে পৃথিবীতে এসেছেন। উদ্দেশ্য, সিংহলের সেনাপতি রণবীর সিংহ ও তার স্ত্রী মেঘমালার প্রেমের গভীরতা মাপা। রণবীরের ছদ্মবেশ নিলো মদনদেব আর রণবীরের চাকর শশীর ছদ্মবেশ নিলো বসন্ত। দুই দাসী চাঁপা ও কাতির নানা কৌশল অত্যাচারে দেবতাদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। দ্ইু রণবীর, দুই শশী থেকে সত্যিকার রণবীর ও শশী কোনটা বের করা হয়ে পড়ে দুষ্কর। এভাব্ইে হাস্যাত্মক নানা ঘটনা-উপঘটনায় কাহিনি এগিয়ে চলে। 
বৈপরীত্যমুখী শিরোনাম অনুসন্ধিৎসু দর্শক আকৃষ্ট না করে পারে না। মঞ্চে প্রবেশ করেই দেখা গেল চারদিকের দর্শকবেষ্টিত মধ্যমঞ্চ। সহজ সরল সেট ডিজাইন। অতি স্বল্পখরচে উপর থেকে জাল দিয়ে গল্প-আবহের প্লট তৈরি করেছে। নানারূপে নানাদৃশ্যকল্প তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে। কখনো প্রাসাদ, কখনো বন ইত্যাদি। জালের সাথে আবার ছোট ছোট বৈদ্যুতিক বাতি রয়েছে। অসংখ্য উইংস অভিনেতৃদের অভিনয় স্পেস তৈরি করেছে। দৃশ্য রূপায়ণে সেট-প্রপসের অনুষঙ্গে নির্দেশনের চিন্তা ও সৌন্দযবোধের উৎকৃষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। আলো-ছায়া, ফ্রগসের ধোঁয়া ও প্রপসের দ্বারা দৃশ্যগভীরতা তৈরিতে সচেষ্ট ছিলেন। স্বর্গ-মর্তের ভাববাদী গল্প হলেও উপস্থাপনে বস্তুবাদী রূপই পরিগ্রহ লাভ করেছে। পোশাকের ক্ষেত্রে সাজেস্টিক্ ও পৌরাণিক রীতির।

অভিনয়-আলো-পোশাক-সেট-প্রপসের আন্তঃক্রিয়াশীলতা রং-রেখায় মনে ‘রং লেগেছে’-ই লাগায়। তবে হাসাতে হলে কী চরিত্র একেঁবেঁকে হাসাতে হবে! কিংবা মুখ বিকৃতির অঙ্গভঙ্গি করে কাঁদাতে হবে। চার্লি চ্যাপলিন কিংবা ভ্যাগাবন্ড, বাংলাদেশের সঙ কিংবা ইতালির কমিডিয়া ডেল আর্তে-এ বিকৃত অঙ্গভঙ্গি কিছুটা থাকলেও গল্পের  স্রোতই হাসায়। কমিডিয়া ডেল আর্তের মুখোশ ব্যবহারের সঙ্গে নাটকের মুখোশ ব্যবহারের সাদৃশ্য হয়েছে। অভিনয় ও গল্পকথন ধারাটির আরো সুস্পষ্টতা নাট্যকে উপভোগ্য করে তুলতে পারত। যদিও নির্দেশক বল্ইে নিয়েছেন অভিনেতৃবৃন্দ নতুন। তবু বলতে হয়,অপ্রয়োজনীয় ও অর্থহীন অঙ্গভঙ্গি যে-কোনো নাটকের জন্যই ক্ষতিকর। আর যুক্তিহীন ঠুনকো হাসানোর প্রবণতা তো শিল্পবোধহীনতার পরিচয়ই দেয়। আর এ-নাটকের আন্তঃস্রোতে যে শক্তি আছে। গল্পটি পরিবেশনেই তা হাস্যরস উঠে আসা সম্ভব। অভিনেতৃবৃন্দের উচিত ভাড়ামির রিপরীতে গল্পের ক্রমগতির সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য অভিনয়। নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন- বাবর খাদেমী. আসাদুজ্জামান শুভ, রিয়াজ হোসেন, ফাহমিদা মল্লিক শিশির, তামান্না ইয়াসমিন স্বর্ণা, শাহনাজ আঁখি, মিশকাতুর রহমান মুরাদ, শাহাদাত সাব্বির, রিয়াজ হোসেন। নেপথ্যে ছিলেন- মঞ্চ ও কোরিওগ্রাফি পরিকল্পনা- অনিকেত পাল বাবু, আলোক পরিকল্পনা- বাবর খাদেমী, সংগীত পরিকল্পনা ও সুর সংযোজন- অজয় দাশ, সুমন নরম্যান কা€úু, পোশাক পরিকল্পনা- শামীম সাগর, প্রপস্ পরিকল্পনা- চারু পিন্টু, নির্দেশনা- আমিনুর রহমান মুকুল
ইস্পাহানী চা কোম্পানি নাট্যটি নির্মাণের স্পন্সার করেছেন সেটি অতি আনন্দের। এভাবে বড়কোম্পানিগুলো নাট্য নির্মাণে যদি পাশে দাঁড়ান তাহলে নাট্যজগৎ সমৃদ্ধতর হয়ে উঠবে। তবে, প্রসেনিয়াম থিয়েটার দেখে যারা অভ্যস্ত, তারা  যদি এ স্টুডিও প্রযোজনাকে প্রসেনিয়াম আঁর্চে খুঁজতে বা তুলনা করতে যান, তবে তিনি বিব্রত হবেন। নাট্য গল্প-চরিত্রের সাবটেক্ট ও বিশ্বাসযোগ্যতায় এগিয়ে যাওয়া উচিত। প্রেমের দেবতা মদন একটি হাস্যকর চরিত্র বটে। যে অবিবেচক নিজেই দগ্ধ হয়ে মরে গেছেন। নাটকের গল্পটির মধ্যে রহস্যময়তা থাকলেও নাটকটি একমুখীন। এটি একটি ভিন্নমাত্রার নাটক। তবে ‘রং লেগেছে’ দর্শকের মনে রং লাগিয়েই ছাড়ে। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে নাটকটি মঞ্চসফল হয়ে উঠুক সেট্ইা আমাদের প্রত্যাশা।