পৈতৃক সম্পত্তির সমান অধিকার!

তাসমিমা হোসেন
যদিও প্রধানমন্ত্রী শরিয়া আইন সংশোধন না করে পৈতৃক সম্পত্তিতে ছেলেমেয়ের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। কিন্তু এ-নিয়ে বিতর্ক এবং জটিলতা কম নেই। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের সামাজিক প্রেক্ষিত, পারিবারিক কাঠামো, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রেক্ষাপটে পৈতৃক সম্পত্তিতে ছেলেমেয়ের সমান অধিকারের বিষয়টি অত্যন্ত জটিল।

নারীকে বঞ্চিত করার কত শত সিস্টেম এই সভ্যজগৎ তৈরি করে রেখেছে সেই প্রাচীনকাল থেকে। সময় এগিয়ে চলেছে। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-প্রযুক্তিতে, সুযোগ-সুবিধার এক বিস্ময় বিচ্ছুরণ দেখতে পাওয়া যায় সভ্যজগতের চারদিকে। কিন্তু সময় যতটা এগিয়েছে, মানুষ কি ততখানি এগোতে পেরেছে? সভ্যতার জ্যোতি কিংবা চাকচিক্যের যেই রোশনাই আমাদের মুগ্ধ করে, নারীকে এখনো পেছনে টেনে ধরার যাবতীয় সিস্টেম কি এমন সভ্যতার মুখে কালিমা লেপন করে না? নারী আর পুরুষ মিলেই তো মানবজাতি, মানবসভ্যতা। তাহলে নারীকে কেন এখনো ছলে-বলে-কৌশলে বঞ্চিত করা হয় পদে পদে? এটা ঠিক যে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। তিনি বলেছেন, যদি কারো দুই মেয়ে হয়, তাহলে আইনের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। তাই মেয়ে বা ছেলে না লিখে সন্তান লিখে দিলে, সেখানে সন্তান ছেলেই হোক বা মেয়েই হোক তার অধিকারটুকু সে পাবে। 
এক্ষেত্রে ধন্যবাদ দিতেই হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। এ-বছর এপ্রিল মাসে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০১৯’-এর একটি অনুষ্ঠানে তিনি সম্পত্তি ভাগে, ছেলেমেয়ের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন আইনসংশ্লিষ্টদের প্রতি।

যদিও প্রধানমন্ত্রী শরিয়া আইন সংশোধন না করে পৈতৃক সম্পত্তিতে ছেলেমেয়ের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। কিন্তু এ-নিয়ে বিতর্ক এবং জটিলতা কম নেই। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের সামাজিক প্রেক্ষিত, পারিবারিক কাঠামো, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রেক্ষাপটে পৈতৃক সম্পত্তিতে ছেলেমেয়ের সমান অধিকারের বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। প্রতিটি ধর্মেই উত্তরাধিকারের বিষয়টি ভিন্ন ভিন্ন ভাবে রয়েছে। খ্রিষ্টানদের জন্য একভাবে বলা আছে, হিন্দুদের জন্য আরেকভাবে, মুসলমানদের জন্য অন্যভাবে এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য তাদের প্রথাগত যে আইন আছেÑসেটাও আলাদা। অর্থাৎ, উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে আমাদের সার্বজনীন কোনো আইন নেই। এক্ষেত্রে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আইন এবং সেসব আইনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর জন্য সমানাধিকারের ব্যবস্থা নেই। তাহলে উপায় কী?

১৯৯৭ সালে নারীউন্নয়ন নীতিতে ভূমির অধিকারে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলা হলেও এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক চেষ্টার পরেও বিষয়টি সমাধান করা খুব সহজ নয়। আরো বড়ো প্রশ্ন হলো, মুসলিমদের ক্ষেত্রে শরিয়া আইন ঠিক রেখেও কি এর সমাধান সম্ভব? এক্ষেত্রে কোনো কোনো আইনজীবী মনে করেন, শরিয়া আইনে হেবা বা দানের যে বিধান আছে, সেটাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। যে-সকল পিতা-মাতা তাদের সম্পত্তি সমানভাবে ছেলেমেয়েদের মধ্যে ভাগ করে দিতে চান, তারা জীবিতকালেই যদি তাদের সন্তানদের কাছে সম্পত্তি হেবা করে দেন, সেখানে তারা সমান ভাগ দিয়ে হেবা’টা করতে পারেন। তবে শেষ অর্থে এটা কিন্তু আইনি অধিকার হলো না, বরং বলা যায়, এটা একটা কৌশলমাত্র। 
তাহলে কি এক্ষেত্রে নারীর আইনি অধিকার অধরাই থেকে যাবে?
আমরা চাই, পুরুষের পাশাপাশি নারীর অবদান রাখার ক্ষেত্রটুকু নষ্ট না করে এগিয়ে যাক সভ্যতা। সভ্যতা অর্জন করুক তার প্রকৃত অর্থ।