সুন্দরের ফানুস একদিন উড়বে আকাশে

সুন্দরের ফানুস একদিন উড়বে আকাশে
হিমঠান্ডা স্পন্দনহীন শরীর তখন জীবিতদের মনে করিয়ে দেয়, এই শীতলতাই চরম নিয়তি! বাংলার প্রকৃতিতে হেমন্ত আর বসন্তের মাঝে শীত যেন আসে শূন্যমাঠের আলপথ ধরে। শহর থেকে গ্রামীণজীবন যেন বিচিত্রসব উৎসব-আয়োজনে মেতে ওঠে এই সময়। কেবল নিম্নবিত্তের জন্য শীত কখনোসখনো অসহনীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু আমরা নাকি নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে ক্রমশ মধ্য এবং উচ্চ-মধ্যআয়ের দেশের পথে পা বাড়াচ্ছি! অথচ আমাদের উন্নয়নের সঙ্গে ওত পেতে রয়েছে ভয়ানক দুঃসংবাদ। জানা গেল, মাত্র পঞ্চাশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে শীতঋতু বলে বিশেষ কোনো ঋতু থাকবে না।

গরমের দেশে শীতঋতু যেন আসে প্রাণজুড়াতে। হলুদে মাতানো সরিষা ক্ষেত, ঝিলের মাঝে শাপলাফুল, খেঁজুর রসের মিষ্টি আবেশ যেন মাতিয়ে তোলে গ্রামবাংলার মাঠ-ঘাট-আঙিনা। কী এক অনাস্বাদিত রহস্যের ঘোমটায় ঢাকা পড়ে যায় শীতের কুয়াশাঘেরা সকাল। জীবনানন্দ যেন এমনই কোনো এক শীতঋতুতে মৃত্যুগন্ধের অনুভূতির দোলায় দুলতে দুলতে লিখে ফেলেছিলেন- এদিকে কোকিল ডাকছে- পৌষের মধ্যরাতে;/কোনো একদিন বসন্ত আসবে বলে?/কোনো একদিন বসন্ত ছিল তারই পিপাসিত প্রচার?/ জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য তবে শূন্যতায়, অমোঘ মৃত্যুতে।’ সত্যিই তো! মৃত্যুও তো চরম এক শীতল রূপান্তর! মৃত্যুর মধ্য দিয়েই সমস্ত উষ্ণতা হারায় শরীর। হিমঠান্ডা স্পন্দনহীন শরীর তখন জীবিতদের মনে করিয়ে দেয়, এই শীতলতাই চরম নিয়তি!  
বাংলার প্রকৃতিতে হেমন্ত আর বসন্তের মাঝে শীত যেন আসে শূন্যমাঠের আলপথ ধরে। শহর থেকে গ্রামীণজীবন যেন বিচিত্রসব উৎসব-আয়োজনে মেতে ওঠে এই সময়। কেবল নিম্নবিত্তের জন্য শীত কখনোসখনো অসহনীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু আমরা নাকি নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে ক্রমশ মধ্য এবং উচ্চ-মধ্যআয়ের দেশের পথে পা বাড়াচ্ছি! অথচ আমাদের উন্নয়নের সঙ্গে ওত পেতে রয়েছে ভয়ানক দুঃসংবাদ। জানা গেল, মাত্র পঞ্চাশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে শীতঋতু বলে বিশেষ কোনো ঋতু থাকবে না। ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অব ক্লাইমেট চেঞ্জ আইপিসিসি বা জলবাযু বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্যানেলের এক রিপোর্টে এ কথাই উচ্চারণ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রায় সব ঋতুতেই টের পাওয়া যাচ্ছে। আর সবচাইতে বেশি প্রভাব পড়েছে শীতঋতুতে। আরো ভয়ঙ্কর তথ্য হলো, এই ঋতুতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে শীতকাল পরিণত হবে শুষ্ক ও খরা মৌসুমে। সেই সঙ্গে শীতকালে বৃদ্ধি পাবে তীব্র বায়ুদূষণ। ইতিমধ্যেই দিল্লিকে হারিয়ে ঢাকা হয়ে উঠেছে বিশ্বের সবচাইতে দূষিত বায়ুর শহর। মনে রাখতে হবে বিশুদ্ধ পানির মতোই স্বাস্থ্যকর বাতাস আমাদের জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দূষিত বাতাসে নিশ্বাস নেওয়া আর নোংরা পানি পান করার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। 
বিশ্বের উষ্ণায়ন রোধ করতে প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণে বৃক্ষরোপণ। কী ভয়ঙ্কর কথা, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে ২০০ গাছ লাগাতে নাকি খরচ হয়েছে ১১ কোটি টাকা! দেখা যাচ্ছে, আমরা অক্সিজেন-সমৃদ্ধ বৃক্ষরোপণ না করে বপন করছি দুর্নীতির বিষবৃক্ষ। কে উৎপাটন করবে এসব বিষবৃক্ষের শেকড়? কে বসবাসযোগ্য করে তুলবে এই পৃথিবীকে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘শীত’ কবিতায় লিখেছেন- পাখি বলে ‘আমি চলিলাম’,/ ফুল বলে ‘আমি ফুটিব না’,/ মলয় কহিয়া গেল শুধু/ ‘বনে বনে আমি ছুটিব না’। 
এখন শীতঋতু যদি সত্যিই বিদায় নেয়, তাহলে ঋতুভিত্তিক ফসলের কী হবে? প্রবাদ আছে, চাষা বাঁচে আশায়। আমরাও আশাবাদী, সুন্দরের ফানুস একদিন উড়বে আকাশে।
এই অগ্নিজগতে সবাইকে জানাই শীতের শুভেচ্ছা।