প্রাচীন মিশরের নারীবান্ধব সংস্কৃতি

প্রাচীন মিশরের নারীবান্ধব সংস্কৃতি
প্রাচীন মিশরের নারীবান্ধব সংস্কৃতি
খ্রিষ্টপূর্ব ২৯৭০ এ রানী মারনেইথ প্রথম নারী হিসেবে মিশরের ইতিহাসে ফারাও বা নারী শাসক হন। মিশরের তিন হাজার বছর ইতিহাসে ১৭০ জন ফরাওয়ের মধ্যে ৭ জন ছিলেন নারী ফারাও। মারনেইথ ছাড়াও এর মধ্যে হাতশেপসুত, নীথহোটেপ ছিলেন অন্যতম। হাতশেপসুত তার সুশাসনের জন্য ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন।

পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলির অন্যতম হলো প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা। পৃথিবীর শুরু থেকেই অনেক রহস্য নিয়ে গড়ে উঠেছে এই প্রাচীন মিশর। কয়েক হাজার বছর পূর্বে বিশ্বের সকল সভ্যতায় নারীদের যখন তুচ্ছ করে দেখা হতো তখন কেবল মিশর দিয়েছে নারীদের অগ্রাধিকার। প্রাচীন মিশরে স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা, অধিকার, ক্ষমতায় নারীরাই ছিলো পুরুষের সমান। সেইসময় মিশরে অনেক প্রভাবশালী পদেও নারীরা ছিলো।  


প্রাচীন মিশরে বিশ্বাস করা হতো যে একজন নারীই পরিবার ও জীবনকে আলোকিত করে রাখে। জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণে নারী ভূমিকাই বেশি। তাই মিশরের ইতিহাসে নারীদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। প্রায় ৫০০০ বছর পূর্বে মিশরে ফারাওদের শাসন শুরু হয়। মিশরে রাজাদের ফারাও বলা হতো। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ পর্যন্ত ফারাওদের শাসন ছিলো মিশরে। সাধারণ মানুষদের কাছে ফারাওরা ছিলেন ঈশ্বর তুল্য। ফারাওদের স্ত্রীরাও ছিলেন দেবীর আসনে। তারাও ফারাওদের সম্পদে ভাগ পেতেন। কেবল পুরুষরাই না নারীরাও ফারাও হতে পারতেন। ফারাওদের অবর্তমানে তাদের স্ত্রীরা রাজা হতে পারতো। 


খ্রিষ্টপূর্ব ২৯৭০ এ রানী মারনেইথ প্রথম নারী হিসেবে মিশরের ইতিহাসে ফারাও বা নারী শাসক হন। মিশরের তিন হাজার বছর ইতিহাসে ১৭০ জন ফরাওয়ের মধ্যে ৭ জন ছিলেন নারী ফারাও। মারনেইথ ছাড়াও এর মধ্যে হাতশেপসুত, নীথহোটেপ ছিলেন অন্যতম। হাতশেপসুত তার সুশাসনের জন্য ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। ফারাও এর সর্বোচ্চ কর্মকর্তাকে বলা হতো উজির। এই উজির পদেও ছিলো নারীদের স্থান। 


প্রাচীন মিশরে নারীদের পুরুষের সমান মনে করা হতো। সামাজিকভাবে ও আইনগত ভাবে নারীদের মর্যাদা ছিলো পুরুষদের সমান। নারীরা তাদের সম্পত্তির পূর্ণ মালিকানা পেতো। বিবাহের পর সম্পত্তি তাদের স্বামীর কাছে হস্তান্তর করতে হতোনা। তারা চাইলে সেই সম্পত্তি বিক্রি করতে বা অন্য কাউকে দিতে পারতো। বিবাহ বিচ্ছেদের পূর্ণ অধিকার ছিলো নারীদের। আবার সন্তানের ভরণপোষণের জন্য স্বামীর সম্পদের এক অংশ দাবি করার অধিকার ছিলো তাদের। মিশরের নারীরা লেখাপড়া জানতো। প্রায় সব শ্রেণীর নারীরাই লিখতে পারতো। বাড়ির কাজ করার পাশাপাশি তারা ইচ্ছা করলে বাইরের কাজও করতে পারতো। আবার কাজের জন্য তাদের বেতনও দেওয়া হতো। চাইলে ব্যবসা-বাণিজ্যও করার অধিকার ছিলো তাদের।


মিশরে যৌনতা নিয়ে কোনো কঠোরতা ছিলোনা। বর্তমানে সমাজ পুরুষদের বিবাহ পূর্ববর্তী সম্পর্ক মান্য করলেও একজন নারীর ক্ষেত্রে তা সহজে মানতে চায়না। খারাপ দৃষ্টিতে দেখে। প্রাচীন মিশর ছিলো এর পুরো উল্টো। পুরুষদের মতো নারীরাও চাইলে ইচ্ছামতো বিবাহ পূর্ববর্তী যৌন সম্পর্ক করতে পারতো। সেসময়ে ‘ভার্জিন’ বলে কোনো শব্দ ছিলোনা মিশরে। 


মিশরের ধর্মও নারীর পূর্ণ স্বীকৃতি দেয়। মিশরীয় পুরাণমতে ওরেসিস হলেন জীবন, মৃত্যু ও উর্বরতার দেবতা। তার স্ত্রী আইসিস হলেন মাতৃত্ব, যাদু ও উর্বরতার দেবী।  মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো সৃষ্টির পর পৃথিবী শাসন করতো ওরেসিস এবং আইসিস। তারা মানতো যে আইসিস নারী ও পুরুষকে সমান শক্তিতে তৈরি করেছেন। তাই নারী-পুরুষ সমান। নারীদেরও পূর্ণ নাগরিকতা ছিলো প্রাচীন মিশরে। 


সেসময়ে নারীদের নিরাপত্তার জন্য আইন কঠোর ছিলো। কোনো নারীকে উত্ত্যক্ত করা হলে উত্ত্যক্তকারীর বিরুদ্ধে বিচার ও শাস্তির বিধান ছিলো। ধর্ষণেরও ছিলো কঠোর শাস্তি। কোনো নারীকে ধর্ষণ করা হলে আইনগত ভাবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ধর্ষণকারীকে নিবীর্য খোজায় পরিণত করা হতো। ফলে সে সন্তান তৈরিতে অক্ষম হয়ে যেত। শাস্তির ব্যবস্থাও ছিলো যথাযথ। এ থেকে বোঝা যায় নারীদের জন্য আইনি ব্যবস্থাও অনুকূল ছিলো। 


এভাবে প্রায় ৩০০০ বছর প্রাচীন মিশরে নারীরা তাদের অধিকার ধারণ করে ছিলো। জানা যায়, ৪১৫ খ্রিষ্টাব্দে বিজ্ঞানী হাইপেশিয়ার মৃত্যুর পর মিশরে নারীর সমঅধিকারও শেষ হয়ে যায়। বর্তমানে মিশরে নারীদের অবস্থা ভিন্ন। সেই সময় মিশরীয়রা উপলধ্বি করেছিলো নারী-পুরুষের সমঅধিকার ছাড়া সামাজিক ও জাতিগত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তারা নারীদেরও পুরুষদের সমান মর্যাদা বজায় রেখেছিলেন। বিশ্বের অন্যসব দেশে যখন নারীরা অবহেলিত ছিলো, পিছিয়ে ছিলো প্রাচীন মিশর তখন নারীকে সম্মান, পদমর্যাদা, সমঅধিকার দিয়ে এগিয়ে এনে পুরো বিশ্বের কাছে, সভ্যতার কাছে দৃষ্টি স্থাপন করেছে।