কাজ বন্ধ, অনিশ্চয়তায় ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ভবিষ্যৎ

কাজ বন্ধ, অনিশ্চয়তায় ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ভবিষ্যৎ
ছোট ছোট কোম্পানিগুলো মূলত ওয়েডিং ইভেন্ট আয়োজন করে। জন্মদিন, বিয়ে, খতনার মত অনুষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার এবং ভিডিও এডিটর নিয়োগ দিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। অনেকেই ডেকোরেশনের কাজও করে থাকেন। অধিকাংশ সময় বে-সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এসকল অনুষ্ঠানে কাজ করতে দেখা যায়।

 

মাসুম হাসান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্র শখের বশে টুকিটাকি ছবি তুলতে গিয়েই জড়িয়ে পড়েন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজে। এমনকি ভিডিও এডিটিং করেও বেশ ভালো একটা আয়ের উৎস গড়ে নিয়েছিলেন। তাতে নিজের খরচ সহও মধ্যবিত্ত পরিবারকে প্রায়শই নানাভাবে সাহায্য করতে পারতেন। কিন্তু করোনার পর থেকেই কাজ অনেকাংশেই কমে গিয়েছে। যদিও এখন কিছু কিছু বিয়ের অনুষ্ঠান কিংবা পার্টি আয়োজিত হয়, তবু তাতে খুব একটা কাজ পাওয়া যায়না। ফলশ্রুতিতে বন্ধ হয়ে গেছে কাজ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হয়ে ক্যামেরাটাও শখের বশে তুলে নিতে পারেন না।

 

শুধু মাসুমই না, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজের সাথে জড়িত ছিলেন দিনাজপুরের নিয়াজ মোরশেদ। বিভিন্ন ওয়েডিং ইভেন্ট আয়োজনের দায়িত্ব পালন করে নিজের অবস্থা ফিরিয়েও এনেছিলেন। কিন্তু এখন তাকে অনলাইনে বিভিন্ন ব্যবসার মাধ্যম খুঁজে বের করতে হচ্ছে। তাতে হয়তো টেনেটুনে পার পাওয়া যাচ্ছে - কিন্তু স্বস্তির দেখা মিলছে না।

 

মাসুম হাসান জানালেন, ভার্সিটি থাকার সময় ক্যাম্পাসেই অনেক ইভেন্টের কাজ পাওয়া যেতো। প্রায় প্রতিদিনই নানা সেমিনার, কন্সার্ট, এবং ইভেন্টের আয়োজনে যোগ দিতে হতো। ফটোগ্রাফি এবং ভিডিও এডিটিং এর চাপে প্রায়ই নিজের জন্যে সময় বের করা যেতোনা। এমনকি ভার্সিটি বন্ধের আগেও অনেক বিয়ের অনুষ্ঠান এবং ইভেন্টের জন্য বুকিং পেয়েছিলো। কিন্তু সেগুলো তো আর হলোনা। বাসা থেকে টাকা চাওয়া যায়, মেসের ভাড়াটুকু বাবা দিচ্ছেন। কিন্তু বুঝতে পারি ভীষণ সমস্যা হচ্ছে তার। এইরকম অবস্থা হবে একবারও ভাবতে পারিনি।

 

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট খুব নতুন কোনো ধারণা নয়। যদিও বর্তমানে অনেকেই এই নামটির সাথে পরিচিত। ১৯৯৯ সালে এর যাত্রা শুরু হলেও খুব সীমিত পরিসরের মানুষই অর্থ-ব্যয়ে এসকল প্রতিষ্ঠানের সেবা ভোগ করতে পারতো। বিগত এক দশকে বিশ্ববিদ্যালয় এবং পারিবারিক অনুষ্ঠানে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের বিকাশ চোখে পড়ার মতো। লেখাপড়া শেষ করে অনেকেই ফ্রিল্যান্সিং পেশা হিসেবে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন।

 

এসকল ব্যক্তিদের মধ্যে সিংহভাগই মূলত ছাত্র।বাংলাদেশে মূলত কর্পোরেট ইভেন্ট এবং ওয়েডিং ইভেন্ট বেশি প্রচলিত। সরকারি, বেসরকারি এবং বহুজাগতিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অনুষ্ঠানগুলোকে ঝক্কি-ঝামেলা মুক্ত করতে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এজেন্সিগুলোর ভূমিকা অপরিসীম।  একটু বড় সময় হলেও কর্পোরেট ইভেন্টগুলো আবার চালু হতে শুরু করেছে। সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে ছোটখাটো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোকে।

 

 

ছোট ছোট কোম্পানিগুলো মূলত ওয়েডিং ইভেন্ট আয়োজন করে। জন্মদিন, বিয়ে, খতনার মত অনুষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার এবং ভিডিও এডিটর নিয়োগ দিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। অনেকেই ডেকোরেশনের কাজও করে থাকেন। অধিকাংশ সময় বে-সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এসকল অনুষ্ঠানে কাজ করতে দেখা যায়। বিপুল কর নামে সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র জানালেন সেই কথা। তিনি বলেন, সবকিছু বন্ধ থাকলেও ভার্সিটি এখনো খোলা। অনলাইন ক্লাস করতে হচ্ছে এবং নিয়মিত টিউশন ফি জমা দিতে হচ্ছে। একসময় যা আয় করতাম তা দিয়েই টিউশন ফি জমা দিতে পারতাম। এখন সেটাও সম্ভব হচ্ছেনা। এতে বেশ বড় ঝামেলায় পড়ে গেছি। বাসা থেকে বাবা এত টাকা দিতে পারছেনা।

 

শুধু যে ছাত্ররাই এই সংকটে তা কিন্তু নেই। অনেকেই মূল ক্যারিয়ার হিসেবে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের মতো ফ্রিল্যান্স কাজ বেছে নিয়েছেন। এখন অনেককেই দেখা যাচ্ছে ভাড়ায় বাইক নিয়ে রাইড শেয়ার ধরণের কাজ করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি অবশ্য এখনো ঠিক ভালো তাও বলা যাচ্ছেনা। বিভিন্ন বিয়ের অনুষ্ঠান কিংবা ইভেন্টে করোনা ছড়িয়ে পড়ছে মানুষজনের অজ্ঞাতসারে।

 

তবে অনুষ্ঠান কিন্তু আয়োজিত হচ্ছে। ঢাক ও বড় বিভাগীয় শহরগুলো মিলে ছোট বড় মোট ৫০০ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি খুঁজে পাওয়া যাবে। এমনকি জেলা শহরগুলোতেও মোটমাট ৪০০ এর মতো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি আছে। বহু বছর আগে তিলে তিলে গড়ে তোলা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকরাও পড়েছেন বিপাকে। রিয়াজুল ইসলাম পড়ালেখা শেষ করেই ৬ বছর আগে গড়ে তোলেন, ইভেন্ট সলিউশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান। রাজধানীর মিরপুরে একসময় বেশ নামডাক থাকার পরেও কয়েকমাস ধরে কোনো কাজ পাচ্ছেন না। তাই অফিস চালানো এবং অন্যান্য খরচ চালাতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে জানালেন।

 

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএমএমএবি) সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক স্বপন চৌধুরীর মতে, মুজিব বর্ষ ঘোষণা হওয়ায় এবার ইভেন্ট ম্যানেজম্যান্ট খাত বেশ লাভবান হতে পারতো। কিন্তু সবকিছু বদলে গেলো। বর্তমানে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট খাত রয়ে গেছে বিশাল অনিশ্চয়তার মুখে। সামনে আসছে শীত, লকডাউন আবার হতে পারে এমন গুঞ্জন বাতাসে। তাই পরিস্থিতি এবং সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে শুরু করেছে।