বেগমগঞ্জের বোন ‘সাহসিকা’র বয়ান

বেগমগঞ্জের বোন ‘সাহসিকা’র বয়ান
বেগমগঞ্জের বোন ‘সাহসিকা’র বয়ান
এখন কীভাবে সমাজরে মুখ দেখাব? এক মাস ঘুড়ি বেড়াইছিনা? আমি তো এখন ঘরে খাঁচায় বন্দির মতো [থানা]। বড় মুখ করে কারো সাথে হয় গেরামের বাড়িতে- এসব কথা নিয়া আলোচনা হয় [অন্যরা বলাবলি করে তা ইঙ্গিত করছেন]। শুধু আমি যেজন্য এখন যাইতেছি না এখানে আছি কিন্তু বাড়ি গেলে কী হবে? মানুষজন যখন জনে জনে আসা শুরু করব, জিজ্ঞেস করব। কিছু জিজ্ঞেস করলে আমার খারাপ লাগে। নিজের কাছে অসহায় লাগে, কেরকম যেন লাগে, বুঝতে পারি না। ওদের শাস্তি না হলে আমি দোষী হব সমাজের কাছে, মুখ দেখাতে পারব না। আমি ডুবলে দেশের সব নারী ডুববে। আমারে দিয়ে আপনারা উঠতে পারতেন। দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি না হলে শুধু বেগমগঞ্জ না সমগ্র দেশের নারীরা পরাজিত হবে। এই ঘটনার বিচার না হলে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হবে না।

নোয়াখালী বেগমগঞ্জে ধর্ষণের শিকার নারীর সাথে সাক্ষাৎ এর জন্য, ৯ অক্টোবর ২০২০ ইং তারিখে ৭ জনের নারী প্রতিনিধি দলের (খুশী কবির, শিপ্রা বোস, জান্নাতুল মাওয়া, তাসলিমা আখতার, মাহফুজা হক, বীথি ঘোষ, রেহনুমা আহমেদ) ৬ জন নোয়াখালী ও বেগমগঞ্জে গিয়ে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আলমগীর হোসেনের অনুমতি নিয়ে বেগমগঞ্জ থানার ওসি হারুন-অর-রশীদ চৌধুরীর অফিস রুমে বসলে ১৫ মি. পর সারভাইভার বোন আসলে তাঁর সাথে ৩০-৩৫ মি. কথা বলা হয়। 

 ‘সাহসিকা’ - বেগমগঞ্জের বোনকে দেয়া ছদ্মনাম; ‘ভিক্টিম’ বা ‘সারভাইভার’ এর পরিবর্তে আমরা তাঁকে এই নামেই চিনতে চাই।

ইন্টারভিউ থেকে প্রাপ্ত তার বয়ান সরাসরি তুলে ধরা হলো-

‘সাহসিকা’: ভিডিওর আগে-পিছে কী হইছে দেখবেন না। ওরা আমার সাথে যেটা করছে সেটা দেখবেন। আপনারা বিচারের দাবি ছাড়বেন না, বিচার করে ছাড়বেন। ওরা ছাড়া পেলে কী করে কওয়া বলা যায় না।

আর ভালো লাগে না। তদন্ত কী? তদন্ত কারে কয়? এখন তো পুলিশ, থানায় আছি, ওখানে (গ্রামে/বাড়িতে) যাওয়ার মতো অবস্থা নাই। যাচাই-বাছাইয়ের কী আছে? আছেনি?

আমারে বলছে যদি আমি নাকি ওদের সাথে থাকলে ওরা এটা [ভিডিও] ছাড়বে না। ওটারে ’দি আমারে সবসময় জব্দ দিত (কাবু করার চেষ্টা করত)। আমি বলছি ডাল-ভাত খেয়েও আমি যদি সুখী থাকি (অস্পষ্ট, আমি ওদের সাথে জড়াব না)।

আমার চোখে ঘুম আসে না। আমার চোখে সারাক্ষণ এটা (ভিডিও ঘটনা) ঘোরে। খাওয়াও নাই, চলনও নাই। সারারাত বই (বসে) থাকি, আমার চোখে ঘুম আসে না। কালগা রাত ২টা বাজি (বেজে) গেছে, চোখেই ঘুম আসে না। তখন উঠি নামাজ পড়ি। নফল নামাজ পড়তে পড়তে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ি।

 

আমারে ’দি আপনাদের জয় হবে। আপনারা সবকিছু পারেন করতে। টাকাপয়সা, শিক্ষা সব আছে আল্লার [দেয়া]। আমি নারী। আপনারা নারী। আমি গরীব, আপনি ধনী। রক্তমাংস এক। কেউ সুখী, কেউ দুঃখী। দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াইয়া যদি প্রতিবাদ করেন, ভবিষ্যতে আপনাদের ছেলে-মেয়ে সবার সম্মান [অস্পষ্ট, বাড়বে]। পুলিশ অফিসার [আমাকে বলে], আমরা যাচাই করব। যাচাই-টাচাই কী? [অস্পষ্ট]।

[ভিডিও] পুরাটা দেখেছেন? পুরাটা দেখেছেন? চোখ মুখ বন্ধ কইরা দেখতেন। লজ্জায় হোক আমি এটা ঘোরা দিয়ে [ঢেকে] রাখছি। আমারে না পাই, [কোন] জায়গা [-য় লুকাই আছি] বার করতে না পারি এরা [ভিডিও] ছাড়ি দিছে। কিন্তু সরকার যে আমারে টানব চুম্বকের মতো। আমি কিন্তু চুরি করি যাই [গোপনে] বিষ খাই হালাইতাম [ফেলতাম]। আমার খেয়াল আছিল ওইটা [ভিডিও] যদি এরা ছাড়ে, আমার খেয়াল আছিল আত্মহত্যা করার।

কিন্তু মনে হয় আল্লাহ আমারে পাপী করি দুনিয়াতুন নিব না। [তাহলে] আমি এই যানাও [জাহান] পাবো না, ওই যানাও [জাহান] পাবো না। আমারে পাপী করে নিব না। আল্লাহ সবার জন্য এক, আল্লাহ পাকে সবাইরে বানাইছেন। কত রকমের মানুষ। হিন্দু কন, মুসলমান কন, খৃষ্টান কন। বিদ্যাশীল কে? একজন, একজন [আল্লাহ]। সবাইয়ে সবারটা ডাকে। কিন্তু সবাই নারী না? মায়ের জাত না আমরা? ইয়ানে কয়জন আছে? সবাই তো আমরা মা।

ওরা আমাকে শাসন করছে। এটারে শাসন করা বলে? আমার কী কলঙ্ক? আমি ১২-বছর স্বামী ছাড়া থাকি, একটা চৌকি নাই ঘরে, কারেন্ট নাই, কী খাই না খাই কেউ দেখে না। কেউ কোনো দিন ১০টা টাকাও দে’নাই।

যদি ফাঁসি হয় তাহলে আমাদের সম্মান বাড়ে, এই লোকেরা বাঁচলে লোকে বলবে, করলিও আবার ছাড়লিও। আমি ডুবলে দেশের সব নারী ডুববে। আমারে দিয়ে আমনেরা [আপনারা] উঠতে পারতেন।

 

আপনি উদিলা [বিবস্ত্র] থাকলে কি আমার শরম হবে না? [অস্পষ্ট]।

আমারে উদাম [বিবস্ত্র] করছে আপনাদের লজ্জা লাগে নাই? কলিজা ফাটি যায় নাই? একটা কথা বললে কার গায়ে লাগবে? আমরার নারীর গায়ে লাগবে, দশজনারে দশজনের লাগবে না? পুরুষের [কিন্তু] লাগবে না। [অস্পষ্ট]। আপনারা নারীরা যদি [অস্পষ্ট] সবসময় এটা নিয়ে উপরত্তুন [উপরের থেকে] আপনারা প্রতিবাদ করেন, [ভিডিওর] আগে কী হইছে সেটা দরকারি বিষয় না।

এ দৃষ্টিটা [ভিডিও] ক্যামনে ঘটল? আমি বলছি নারীর জাত এককারী [একইরকম, পার্থক্য নাই]। হ্যাঁ, [বলতে পারে] ওই মহিলা [‘সাহসিকা’ নিজে] খারাপ ছিল, কিন্তু এটা ছেলেরা কেন করল? [অস্পষ্ট]। কয়টা পাইছে খারাপ [আমার কয়টা দোষ পাইছে]? কারো সাথে কারো মিল নাই, এইটা হইতে পারে। কেউ কারো সাথে মিলে না, নয় [পরস্পরের] ঘরে যায় না। জায়গা-জমি লই [নিয়ে] ভেজাল, এইটা হইতে পারে। ওই ধরনের বাজে কারবার আমার কাছে আছে? [অস্পষ্ট, দেলোয়ার বাহিনী সারভাইভারকে দিয়ে মাদক বিμী করাতে চেয়েছিল, সেটা ইঙ্গিত করে বলছেন]।

আল্লাহ যা করে ভালোর জন্য করে না? [অস্পষ্ট]। যাদের পাপ [আল্লাহ] তারেই নিবে।

কেউ যদি আমাকে সহযোগিতা করত, কেউ সহযোগিতা করে নাই। আমাদের এলাকায় তিন শ’ মানুষ হবে। আমারে উলঙ্গ [বিবস্ত্র] করি লই [নিয়ে] যায়। বলতেছি, একটু কাপড়টা পরব, তখন [যারে] বলছি, হেও ভিডিও করে। আমারে আল্লা কীভাবে রাখছে! ওই সময় হুঁশ ছিল না। চিল্লাইছি ঠিকই, চোখ তো অন্ধকার। চামড়া হাডাই হালাইছে [ফাটিয়ে দিয়েছে]। মাথা বেড়াই [মধ্যে] বাড়ি দিছে [অস্পষ্ট]।

এখন চোখের সমস্যা। বাড়ির লগে [সাথে] চোখমুখ [এ ব্যথা পাইছি; অস্পষ্ট]।

আমাদের একজনের প্রশ্নের জবাবে-

‘সাহসিকা’: আসছে, যতজন আসছে ততজন ভিডিও করছে।

[আমাদের কাছে ‘সাহসিকা’র প্রশ্ন]: আপনারা সবাই ঢাকাতুন আইছেন?

আমরা: জি¦ আপনাকে দেখতে আসছি আর বলতে আসছি আমরা সবাই আপনার বোন, আপনার সঙ্গে আমরা আছি।

‘সাহসিকা’: হ্যাঁ দেখতেছি। টিভিতেও দেখতেছি সবাই [অস্পষ্ট]

কইলজা হাডি যাইতেছে [কলিজা ফেটে যাচ্ছে]।

এত্ত কিছু যে উড়াইছে [ভিডিও ছড়ানো], আমি বাড়ি যাইতাম হাইত্তোনো [যেতে পারব না]। চিন্তা করেন আমি আছি যে। কেমনে চিল্লাইছি, কী কই চিল্লাইছি। [অস্পষ্ট] এখনও মাথা ব্যথা। শুধু গলা শুকাই যায়।

 

এই বর্বর ঘটনার বিচার হলে দেশের নারীদের সম্মান বাঁচবো। আমারে তুলে দিলে দেশের নারীদের সম্মান বাড়বে। তোমাদের পা চাবি [পা চেপে] ধরি, ওদের ছাড়ি দিয়েন না। রাজনীতি কাকে বলে আমিতো বুঝিনা। কিন্তু এ কী রকম রাজনীতি, শতশত নারীর জীবনে এমন ঘটনা ঘটতেছে, তার বিচার নাই কেন? আপনাগো মনে, দেশবাসীর মনে প্রশ্ন জাগে না?

- বুঝলাম, ওই মহিলা [নিজেকে ইঙ্গিত করেন] খারাপ ছিল কিন্তু এতগুলা ছেলে কেন এমন করল? যে ঘটনা আমার সাথে হয়েছে তা কুকুর ও কুকুরের সাথে করে না।

আমার সম্মান ফিরাইয়া দেন। এদের বিচার হলে আমার সম্মান ফিরবে। বাংলাদেশের নারীদের সম্মান ফিরা আসবে। শুনছি পুলিশ এখনো যাচাই করতেছে। এতো কিছুর পর যাচাই কী করবো? প্রমাণ তো ওই ভিডিওতেই আছে।

মেয়েদের সম্মানটাও বেশি, অসম্মানটাও বেশি। অসম্মান করেছে আমার কথা’ন [শুধু আমার কথা না]। আরো অনেক, [আরো] দশজন নারীর সম্মান বাড়ার জন্য, এটার যদি বিচার না হয় আর কিসের বিচার হবে?

এটার বিচার যদি না হয় সেটা নারী কেন, আমনেরা উচ্ছৃঙ্খলতায় চলে যাবেন। ওই মেয়ের [নিজেকে ইঙ্গিত করেন] কথা ভাববি না ? ওই মেয়ে নারী, আমরা কি পুরুষ? আমরা পুরুষ না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এটাই আবেদন করি। সবাই সব কথা বলবে, উনি এক কথা - এটা বললে হবে না? [আমাদের জিজ্ঞেস করেন]। [অস্পষ্ট]।

আমাদের প্রশ্ন: আপনার বাবা-মা আছে তো?

‘সাহসিকা’: বাবা আছে, মা নাই।

ছেলেরা মেয়েরা যারা ভালো তারা তো আন্দোলন করতেছে দেখতেছি। যদি এর ফাঁসির হুকুম না হয় নারীদের কোনো দাম থাকবে না। অসম্মান তো অনেক হয়ে গেছে কিন্তু আপনারা কীভাবে আমরা জন্য খাড়াইবেন [দাঁড়াবেন] সেটা আপনারাই জানেন।

[কাঁদতে, কাঁদতে]: এখন কীভাবে সমাজরে মুখ দেখাব? এক মাস ঘুড়ি বেড়াইছিনা? আমি তো এখন ঘরে খাঁচায় বন্দির মতো [থানা]। বড় মুখ করে কারো সাথে হয় গেরামের বাড়িতে- এসব কথা নিয়া আলোচনা হয় [অন্যরা বলাবলি করে তা ইঙ্গিত করছেন]। শুধু আমি যেজন্য এখন যাইতেছি না এখানে আছি কিন্তু বাড়ি গেলে কী হবে? মানুষজন যখন জনে জনে আসা শুরু করব, জিজ্ঞেস করব। কিছু জিজ্ঞেস করলে আমার খারাপ লাগে। নিজের কাছে অসহায় লাগে, কেরকম যেন লাগে, বুঝতে পারি না। ওদের শাস্তি না হলে আমি দোষী হব সমাজের কাছে, মুখ দেখাতে পারব না। আমি ডুবলে দেশের সব নারী ডুববে। আমারে দিয়ে আপনারা উঠতে পারতেন।

দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি না হলে শুধু বেগমগঞ্জ না সমগ্র দেশের নারীরা পরাজিত হবে। এই ঘটনার বিচার না হলে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হবে না। কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে ধনী কে গরীব, কে শিক্ষিত কে অশিক্ষিত, এইসব বিবেচনার বাইরে আসতে হবে নারীদের। কেবল নারী হিসাবে নারীর উপর যে বর্বর নির্যাতন হয়েছে তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই এখন জরুরি। এই ঘটনার বিচার না হলে আমি যেমন গ্রামে মুখ দেখাতে পারব না, তেমনি দেশের নারীরাও মাথা উঁচু করে চলতে পারবে না। কারণ ধর্ষক-নিপীড়করা শুধু আমাকে না, সারাদেশের নারীদের বিবস্ত্র করছে।

যে পর্যন্ত ফাঁসি না হয় আপনারা প্রতিবাদ ছাড়িয়েনড়বা [ছাড়বেন না]।

আমার জন্য যারা আন্দোলন করছে তাদের বইলেন এটা আমার জন্য না, তাদের সম্মান ফিরানোর যুদ্ধ এটা।