পোশাক নয়, আত্মবিশ্বাসই নারীর আসল সৌন্দর্য!

পর্দা নয়, আত্মবিশ্বাসই নারীর আসল সৌন্দর্য!
ছবি: সংগৃহীত
সাইকেল রেইসে যে মেয়েটি হিজাব পরে সাইকেল চালাচ্ছে সেই হোক, আর হাতাকাটা ব্লাউজ পরে কপালে বড় টিপ দিয়ে যে জোর গলায় নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলন করছে সেই হোক। দুজনকেই মানুষ বিবেচনা করছে তার পোশাক দিয়ে। এখানে কর্মদক্ষতার গুণগান গাইবার মানুষ কই?

ধরা যাক একটা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার খাতা দেখা হচ্ছে। সেখানে শিক্ষক শিক্ষার্থীর নাম, লিঙ্গ কিছুই জানে না৷ শিক্ষকের কাজ হচ্ছে নিরপেক্ষভাবে খাতা দেখা। তো তিনি পরপর পাঁচটা খাতা দেখলেন। প্রত্যেকেই সমান বা কাছাকাছি নাম্বার পেলো। শিক্ষক জানলেনই না সেই শিক্ষার্থীর বিষয়ে কিছু। শিক্ষার্থী ছেলে না মেয়ে, পর্দাশীল নাকি অপর্দাশীল৷ হিন্দু না মুসলিম। তিনি খাতাগুলো বিবেচনা করলেন উত্তরের মান দ্বারা।


তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ায়? শিক্ষার যোগ্যতার প্রশ্নে সকল স্তরের মানুষই আসলে সমান। কারো পোশাক, বা ধর্ম বা তার লিঙ্গ কি তাতে কিছুই যায় আসে না। যায় আসে তার মেধা কতটুকু। তার মেধা কি সে দেশ ও জাতির উপকারের জন্য কাজে লাগাতে পারবে কিনা। একই কথা যায় সমাজের মানুষ মানদণ্ডের ক্ষেত্রে। আইন সকলের জন্য সমান বিধান করে রেখেছে এবং এই বিধান ধর্ম বর্ণ জাতি নির্বিশেষে সকলের জন্যই প্রযোজ্য। তবে সামাজিক পারিপার্শ্বিক নারীদের বিচার করার জন্য বিভিন্ন মানদণ্ড তৈরি করে রেখেছে। পর্দাশীল নারী ও বেপর্দাশীল নারীর জন্য সামাজিক মানদণ্ড ভিন্ন হয়। যেমন, একজন পর্দাশীল নারীকে সমাজ বেশী সম্মান ও বাহবা দেয়ার প্রত্যাশা রাখে।  কিন্তু হাতাকাটা ব্লাউজ পড়া কপালে বড় টিপ আর নিজস্ব মতামত বহনকারী একজন নারীকে ততটাই ঘৃণার চোখে দেখে।   

 

 

সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম হোক কিংবা আড্ডায়ই হোক। নারীবাদী নারীদের নিয়ে এখন কৌতুক করার প্রবণতা দেখা যায় প্রচুর। আবার ওনারাই একজন পর্দাশীল নারীকে ক্রিকেট খেলতে দেখলে  কিংবা সাইকেল চালাতে দেখলে বিরাট বাহবা দিয়ে বলে "এটাই আসল নারীবাদ।"

 

এখন কথা হচ্ছে, সাইকেল রেইসে যে মেয়েটি হিজাব পরে সাইকেল চালাচ্ছে সেই হোক, আর হাতাকাটা ব্লাউজ পরে কপালে বড় টিপ দিয়ে যে জোর গলায় নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলন করছে সেই হোক। দুজনকেই মানুষ বিবেচনা করছে তার পোশাক দিয়ে। এখানে কর্মদক্ষতার গুণগান গাইবার মানুষ কই? 

 

 

যদি একান্তই আলোচনা বা সমালোচনা করতে হয় তাহলে এই আলোচনাটি হওয়া উচিত "একজন নারী কিভাবে সাইকেল রেসিং এ অংশগ্রহণ করার কথা চিন্তা করলেন বা কি করে তিনি সাহস যুগিয়েছেন এ পথে আসার।" সেটা না করে সেই নারীর হিজাবকেই হাইলাইট করা হচ্ছে বেশী। একজন মানুষ হিসেবে এটা যথেষ্ট অপমানজনক হওয়ার কথা। যে সেই মানুষটা কি কাজ করছে সেটা কেউ পরোয়া না করে সে আজ বাসা থেকে কি পরে বের হয়েছে সেটা নিয়ে সকলের মাথাব্যথা। 

 


একই রকম দেখা যায় যে নারীটি তথাকথিত ধর্মীয় পর্দা পালন করে চলে না তার ক্ষেত্রেও ঘুরে ফিরে তার পোশাক নিয়েই মন্তব্য চলে। হতে পারে ঐ নারী একজন পিএইচডি ডিগ্রীধারী ব্যক্তি। তাতে কার কি আসে যায়? সকলে নারীকে পোশাক দিয়ে মাপতে চায়। কিন্তু এইযে পোশাক দিয়ে নারীর চারিত্রিক বিশ্লেষণ করা হয়,  সেটা দিয়ে নারীর বিভিন্ন খাতে অংশগ্রহণ এর খবর টা ঢাকা পড়ে যায়। পাবলিক সেন্টিমেন্ট নারী থেকে সরে গিয়ে তার পরিধান করা বস্ত্রের দিকে বেশী অগ্রসর হয়। যা সমাজের তথাকথিত নিয়ম পরিবর্তনে খুবই আনপ্রোডাক্টিভ ভূমিকাই পালন করছে না কি? 

 


অতএব, নারীর পোশাকের চেয়ে নারীর কর্মদক্ষতা ও জ্ঞান দিয়ে বিবেচনা  করলে সেটা আরো ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবে৷ দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা কে পুতুল বানিয়ে অহেতুক ফ্যাশন আইকন বানানোর অপচেষ্টা বন্ধ করতে হবে৷ নারীকে সর্বক্ষেত্রে পদচারণা করতে দিলে হয়তো মনোভাব কিছুটা হলেও পরিবর্তন হবে৷ নারীকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে শিখবে সবাই।