বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা ও আগামী প্রজন্ম

প্রতীকী ছবি
টুয়েন্টি ফাস্ট সেঞ্চুরিতে, আমরা করোনা কালীন সময়ে সামাজিক দূরত্ব মেনে জীবনযাপন অতিবাহিত করছি । কিন্তু, তাই বলে কি জীবনযাত্রার ধরণ আর ছেলে-মেয়েদের চাওয়ার ধরণ কি একেবারে বদলে গেছে ? নতুন সম্পর্ক তৈরি হওয়া কি বন্ধ হয়ে আছে ? শুধু প্রশ্ন করলেই হবে না এবং একচেটিয়া সমাজ ব্যবস্থাকে আঙ্গুল তুললেও হবে না । বুঝতে হবে এই শতাব্দীর প্রজন্ম জীবনসঙ্গী চান তার মনের মত ।

অতীতে, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ এ এই চাওয়ার ধরণটা বরাবরই আলাদা ছিলো, তাই হয়তো বদলেছে সঙ্গী চাওয়ার ধরণ অথচ চাওয়াটা কিন্তু একই আছে । কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো স্বাধীনচেতা ছেলে-মেয়েদের সংখ্যাও বেড়েছে এবং আরও বাড়বে । আর বদলাবেই বা না  কেন ! সময় এসেছে স্বাধীনতার জয়-জয়কার । আজ যদি একার আয়ে সংসার চালানো মুশকিল হয়, দুজনকেই সংসারের হাল ধরতে হয় । তবে সংসারের বাকি কাজের দায়িত্ব আর স্বাধীনতার ভাগ ও ভাগাভাগি করে নিতে হবে সঙ্গীর সাথে ।  সাথে পুরানো পৈতৃক মতাদর্শীর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয় । যেখানে দায়িত্ব ভাগ করলেও স্বাধীনতার ভাগাভাগি একদম আকাশকুসুম গল্প, তা রয়ে গিয়েছে একটা বড় অংশ পুরুষের মাঝে ।

 

স্বাধীনতাও পৈতৃক মতাদর্শীর ছেলেদের কাছে সম্পত্তির মতো । যা তারা একদম পূর্বপুরুষ থেকে জন্মগত ভাবে পেয়েছে বহুযুগ ধরে । তবে একই মাপকাঠিতে সব ছেলেকে ফেলে দিলে খুব অবিচার বা অন্যায় করা হবে । কারণ আমাদের বাবারা কি শুধুই নিষ্ঠুর পুরুষ ছিলেন ? নির্যাতনকারী ছিলেন ? কখনোই না, বাবারা ছিলেন ছায়ার মতো, যার ছায়ায় স্বাধীনতার শিক্ষা । ভাইয়ের ভালোবাসার সাহস আর বন্ধুর অনুপ্রেরণা আর সাথে এগিয়ে যাবার করতালিও আছে ।  সাথে পৈতৃক মতাদর্শীর পাশে, ছায়া দেওয়া মত বাবা ,ভাই, বন্ধুও আছে । এখন সামাজিক ভাবে পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে বেড়ে উঠা মুক্ত চিন্তা আর পৈতৃক মতাদর্শীর ছেলে মিলিয়ে, আমাদের বর্তমান সময়ের যারা পাত্রী খুঁজছেন । তারা আজ নানা ভাবের, নানা রঙের, নানা মনের মানুষ খুঁজছেন । এই ভিড়ের মাঝে, তাই নিজের মতো করে কাউকে খুঁজে নিতে হচ্ছে এতো দ্বিধা ।

আবার সব মা কি ত্যাগী? মহীয়সী ? স্বার্থপর অথবা সঙ্কীর্ণ ? আমাদের যেমন মায়াবী মা, বোন, বন্ধু আছে, তেমনি সুমিতাদেবী মতো চরিত্রের মা বা স্ত্রী আছেন । তাই নারী মানেই সহজ সরল বলা যাচ্ছে না ।  কোনো কোনো সংসার বা জীবন কোনো নারী এমন ভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে বা দিচ্ছে । যার ফলাফলে আরও ১০০ জন পুরুষকে ভীত করেছে । তাই হাজারও মনের মানুষ থেকে নিজের জন্য মনের মত কাউকে খুঁজে নেয়া কখনোই সহজ নয় । নারী বা পুরুষ উভয়ের জন্যই ।

 

জেনে নিই বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়েদের যেই চিন্তা গুলো দ্বিধায় ফেলছে -

 

ব্যক্তিত্ব:


প্রত্যেকটা মানুষ নিজের মতো । ছোট থেকেই নিজের সত্ত্বা নিয়ে বড় হয় । কিন্তু, রিসার্চ বলে ব্যক্তিত্ব সময়ের সাথে বদলায় । তাই হয়তো মানুষকে জন্ম জন্মান্তরের জন্য একেবারে চেনা মুশকিল । তবে সম্পর্কের সাথে ব্যক্তিত্ব খুব রহস্যময় একটা বিষয় । খুব রাগী বা খুব অমায়িক নরম বিনয়ী  একজন মানুষ ঠিক কেমন সঙ্গী চাইছেন তা বলা দায়, তার সঙ্গীর সাথে কেমন আচরণ করবেন এটাও বলা দায় ।  এটা একটা সম্পর্কই তৈরি করে । ভালো মনের মানুষ, মুক্ত মনের মানুষ আর কঠিন বা সংকীর্ণ মনের মানুষ বুঝতে একটা বড় সময় এর প্রয়োজন । যা হঠাৎ দেখা বা কিছু দিনের দেখায় বুঝা মুশকিল । খুব শান্ত স্বভাবের বা গম্ভীর ছেলে ও হুট করে খুব চঞ্চল টাইপের কাউকে পছন্দ করে ফেলতে পারে । আবার খুব চঞ্চল ছেলে ও দেখা যায় শান্ত বা চুপচাপ কাউকে মন দিয়ে বসে আসেন ।  কেন কোথায় কি কারণে কাকে কার পছন্দ বা অপছন্দ হবে, সাধারণ ভাবে বললে ভুল হবে ।

 

তবে ব্যক্তিত্ব গড়তে পরিবার বিশেষ করে আমাদের সমাজে পরিবারের বাবা-মা, নানা-নানী আর দাদ-দাদীদের একটা বড় ভূমিকা আছে । পরিবারের, বন্ধুদের আর নিজের যোগ্যতা, মন মানুষিকটা, চিন্তাধারা সব মিলিয়ে যেই পরিবেশে থাকছেন তার একটা বড় প্রভাব । যা ব্যক্তিত্বর রূপ নেয় । যা ব্যক্তিকে কোন না কোনো ভাবে সবার থেকে আলাদা করবে ।

 

এখন কথা হলো ব্যক্তিত্ব টা কি ? মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ব্যক্তিত্ব হচ্ছে “কোনো একজনের মানসিক প্রক্রিয়া ও আচরণের এমন এক স্বতন্ত্র ধরন, যা ব্যক্তির মধ্যেই বিদ্যমান থাকবে । যেটি কিনা অন্যদের কাছ থেকে সেই ব্যক্তিকে আলাদা করবে।  ক্যামব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল ডিকশনারি অব ইংলিশ এর মতে, আপনি যে ধরনের মানুষ, সেটিই আপনার ব্যক্তিত্ব এবং তাহাই আপনার আচরণ, অনুভূতি এবং চিন্তায় প্রকাশ পায় ।”

 

ব্যক্তি আর ব্যক্তিত্ব মিলিয়ে পাত্র-পাত্রী খোঁজার বিড়ম্বনা । ছেলেমেয়েরা বিয়ের আগে একরকম, পরে একরকম হবেই, সবাই হয়েছে । কিন্তু কেন আর কতদিনে এই ধারা চলবে ?

 

মজার বিষয় পাত্র-পাত্রী যিনিই হন না কোনো বিয়ের বেলায় নিজের উচ্চতা, ওজন, চেহারা, চাকুরী, আর্থিক বা পারিবারিক ব্যাপারটা শুধু অন্য জনের থাকবে । নিজের লাগবে না এমন ভাবলেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব । সে ক্ষেত্রে দুজনার ব্যক্তিগত সমঝোতাই একমাত্র সমাধান । শুধু নিজের করে ভাবলে, অন্য জন ছাড় দিবে ভাবনাটা কোনো মতেই  ব্যক্তিত্বের লক্ষণ বলা চলে না । এইটা কেবল ইগো বা স্বার্থপরতার বহি প্রকাশ ।

 

পরিবার :


ছেলে বেলায় যেই পরিবেশ, যেই নীতি বা শাসনে বড় হয় । তার বড়ো একটা প্রভাব চিন্তা চেতনায় থাকে । পরিবারের রীতি রেওয়াজ স্বভাবে সূক্ষ্ম ভাবে চলে আসে প্রতিটা মানুষের মধ্যে, যা আমরা প্রায় সময় বুঝতে পারি না । কিন্তু, এটাই ঠিক আমরা আমাদের পারিবারিক শিক্ষা আর সংস্কৃতি বয়ে বেড়াই।  

 

তাই বলে সব ছেলেই, তার বাবাকে দেখে বৌয়ের গাঁয়ে হাত দিচ্ছেন বা ঝগড়া করছে তা না । তবে শৈশবে তার পরিবার কেমন শিক্ষা দিয়েছেন মানুষ সম্বন্ধে, সম্পর্ক বা নারী সম্বন্ধে । এই ক্ষেত্রে নারী বা পুরুষ কিছুটা ভিন্ন ভূমিকা রাখেন কিন্তু দুটোই গুরুত্বপূর্ণ।

 

যেমন বাবা কে দেখে ছেলে কখনো শিখছে মারধর করতে, কখনো শিখে সাহায্য করতে বা কখনো শিখে খারাপ আচরণ । অনেক ক্ষেত্রে মা তাকে শেখান ভালোবাসা । মাকে বাবা পিটিয়েছেন আর ছেলেও শিখলো বৌ পেটাবে, এখানে মা যদি সুশিক্ষা দেন হয়তো সেই ছেলে কোনোদিন বৌ পেটাবে না । বরং সে নিজের মধ্যে গড়বেন কিভাবে এর থেকে নিজেকে বা অন্যকে মুক্ত  রাখা যায় । মা বাবার সাথে ঝগড়া করছে বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা চাহিদা নিয়ে তুলকারাম করেছে । তাই বাবার কষ্ট হয়েছে দেখে, মেয়ে শিখতে পারে এমন করবে না বা এমন করবে । নির্ভর করছে বাবা-মা কিভাবে শিখিয়েছেন।


প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা :

 

যেমনটা বলেছিলেন নেপলিয়ান "আমাকে একটা শিক্ষিত মা দাও, আমি শিক্ষিত জাতি দিবো "। আমি বলবো শিক্ষিত মাকে শিক্ষিত করবেন, শুধু কি মা ? তিনি কি একাই করবেন, যদি বাবা সুশিক্ষায় শিক্ষিত না হন । একা একা রকেট, প্লেন চালানো যায় এই যুগে, প্লেন পাইলট ছাড়াও চালানো যাবে । কিন্তু, সংসার মা বা বাবা শুধু একজন কেন চালাবে ? চালালে কি পরিবারের সবাই খুশি হবেন ? ডেমোক্রেসি থাকবে ?

 

তাই শিক্ষার গুরুত্ব বুঝানোর জন্য শিক্ষিত না হলে মুশকিল । আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আমি বলবো এই কারণে । কারণ, কোন প্রতিষ্ঠান কি শিক্ষা দিচ্ছেন ? তা শিক্ষার মান বলে দেয় । ওই প্রতিষ্ঠান কি ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থা অনুশীলন করেছেন ? বলে দেয় শিক্ষার্থীরা কত টুকু নিবেন । প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকরা কতটা সততার অনুশীলন করেন, কোয়ালিটি শিক্ষা দেন বা সম্পর্ক রাখেন, শিক্ষার্থীর সাথে বা স্বার্থ রক্ষা করেন । তাই কিন্তু অনেকটা শিক্ষার্থীকে উদ্বুদ্ধ করবেন শিক্ষার্থী কি নিয়ে যাচ্ছেন । সার্টিফিকেট নাকি শিক্ষার মূল্যবোধ শিক্ষার আদর্শ !

 

সামাজিক মূল্যবোধ :

 

সমাজ কি করে পাত্র-পাত্রী কে অনুপ্রেরিত করবে । কেন সামাজিক মূল্যবোধ দরকার, এটা তো বিয়ের কথা বলছি ? বলছি, বলতেই হবে । কারণ, সমাজ যদি বাল্য বিবাহকে বা বয়স্ক বিবাহকে বা বুড়া বিবাহকে সাপোর্ট করেন । তবে অনায়াসে আমরাও তাই চাইব । সমাজ যদি পরকীয়াকে মেনে নেয়, তবে সবাই স্ট্যাটাস রক্ষা করতে বিয়ে করবে, বহুবিবাহ বা পরকীয়াও করবে । তাই সমাজকে সুন্দর আপনাকে আমাকে রাখতেই হবে । শুধু টাকার বা ক্ষমতার জোরে মন বেঁধেছেন এমন কোথায় কজন আছে । নিজের মতো করে ব্যবস্থা করে নিবে যদি সমাজ ঘুণে খেয়ে যায় । তবে এ দায়বদ্ধতা কি পাত্র নাকি পাত্রীর ।  সমাজ তো আমরা সাজালাম ।

 

বিশ্বাস, অবিশ্বাস,সম্মান এবং সততার উপহার তো আমরা দিলাম । ওদের দায়বদ্ধতায় কেন আনলাম ? ওরা কতটুকু বড় হয়েছে নিজের মত করে নিজের করে করার ।

 

দেশীয় সংস্কৃতি :

 

এখন পর্যন্ত অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ আমাদের সন্তানরা স্বাচ্ছন্দ্য ভাবেই মেনে নিচ্ছে । কারণ তারা শিখেছে, দেখেছেন, এমনি করেই চলছে । কিন্তু পরিবর্তন তো চলে এসেছে । কারণ, জীবন ধারা পাল্টেছে, সামাজিক মূল্যবোধ বদলেছে । ডিজিটাল যুগে আমরা চাই সব চকচকে, নিত্য নতুন, উজ্জ্বল ঝলমলে পোশাকে , রুচিতে ব্যবহারে ইয়ো ইয়ো । আবার চাইছি দেশীয় ঐতিহ্য !!

 

চিন্তায় চেতনায় সামঞ্জস্য না থাকলে, সমাজে কোন কিছুর সুর ঠিক থাকবে না । পরিবর্তন আসবে, আসছে, এসেছে মেনে নিতে হবে । যার যার জায়গায়, তার তার মতন করে । নিজের দায়িত্ব মেনে নিয়ে ছেলে-মেয়েদের কে একটু দিক নির্দেশনা দিলে আমাদের এই প্রজন্ম আসার আলো দেখবে । সুন্দর করে বাঁচবার অনুপ্রেরণা পাবে । তাই এই তরুণ প্রজন্ম হতাশ বা বেশি এক্সপেকটেশন করছে না বলে পরিবার থেকে তাদের কে বাস্তবতা এবং নীতিবাচক শিক্ষার তুলনা নেই । আর আমাদের সন্তান ওদের দোষ না খুঁটিয়ে কাছে টেনে তাদেরকে ভালোবাসা দিয়ে ভালো করে কথা বলে জীবন জ্ঞান দেয়ার প্রয়োজন । তবে নিজে না করে, কাউকে উপদেশ দিলে তা নিছক সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই না ।

 

ভালো থাকুক আমাদের আগামী প্রজন্ম , ভালো করে বাঁচুক নিজের সংসারে নিজের প্রিয়জন এর সাথে ।

 

শুভকামনা

 

লেখক: সম্পর্ক এবং বিবাহ বিষয়ক কনসালটেন্ট,
বাটারফ্লাই ম্যাট্রিমনিয়াল।