আধুনিকতার চাদরে নারী আজও উপেক্ষিত!

আধুনিকতার চাদরে নারী আজও উপেক্ষিত!
ছবি: সংগৃহীত
কিছু পরিসংখ্যান দেখে আসলে সমাজে নারীদের উপেক্ষিত হওয়ার বিষয়গুলো আরো পরিষ্কার হয়ে যাবে। নারী পুরুষের আয় বৈষম্যের দিকটিই তুলে ধরা যাক। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা আইএলও'র গ্লোবাল ওয়েজ রিপোর্টে দেখা যায় বিশ্বে গড়ে নারী পুরুষের আয় বৈষম্য ২২ শতাংশের মতো।  

বহুকাল ধরেই নারী অধিকার আদায়ের আন্দোলন করে এসেছে৷ সময় এগোচ্ছে, দিন পাল্টাচ্ছে। সমাজ আধুনিক থেকে আধুনিকতর হচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর বিচরণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে নারীরা কি পেরেছে পুরোপুরি অধিকার আদায় করতে? আধুনিকতার চাদরে নারী কি আজও উপেক্ষিত নয়? 

 

এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি আমরা। কথা বলেছি বিভিন্ন শ্রেনীপেশার নারীদের সাথে। জানার চেষ্টা করেছি আজও নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন? সমাজে বেশ অনেককিছুই আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখা হলেও নারীদের কিছু কিছু ব্যাপার এখনও রয়ে গেছে সেই চিরাচরিত রূপেই।  

 

জাহনারা আক্তার, পেশায় একজন গার্মেন্টসকর্মী। তার আশেপাশের আর পাঁচজন পুরুষ সহকর্মীর পাশাপাশি তালে তাল মিলিয়েই কাজ করেন তিনি। কিন্তু দিনশেষে তাকে কোথাও গিয়ে শুনতে হয়,  'মেয়ে মানুষ, পারবা না। এই কাজ করতে আসছো কেন? মেয়েরা কি সব পারে নাকি?' 

 

জাহানারার ভাষায়, ' আমরা তো কাজ কম করিনা, একই কাজ করি। তাও অনেকসময় শুনতে হয় মাইয়া মানুষ এটা পারবানা, ওটা পারবানা। বেতন, বোনাসও মাঝেমধ্যে কম ধরে।'

 

একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহজাবিন। আধুনিক, শিক্ষিত পরিবারেরই মেয়ে তিনি। তবুও পরিবারের এক অংশের মানুষের তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া নিয়ে রয়েছে বেজায় আক্ষেপ। শুধু কি পরিবার, তার থেকে জানতে চাওয়া হলো তার বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা চলার পথে আধুনিক সমাজেও কি কি প্রতিবন্ধকতা পার করতে হয়? 

 

উত্তরের লিস্ট ছিলো বেশ বড়। তার মধ্যে কয়েকটা তুলে ধরাই যায়। তিনি বলেন, "যখন আমার পিএইচডি হোল্ডার শিক্ষক বলেন, তুমি তো মেয়ে এই কাজটা বরং ও (কোনো একজন ছেলে শিক্ষার্থী) করুক তখন মনে প্রশ্ন জাগে আমরা আসলেই কি একফোঁটাও আধুনিক সমাজ গড়তে পেরেছি? " 

 

এমন অভিযোগ একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শারমিন আক্তারেরও। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের থেকে প্রায়ই তাকে একটি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, 'পারবে তো?' আর তার কারণ তিনি নারী। শারমিন আক্তার বলেন, ' আমাকে এমনটাও শুনতে হয়, ঘরসংসার ফেলে চাকরি করতে আসার কি দরকার ? ' 

 

একজন ব্যাংক কর্মকর্তা উম্মে নাজমা। আবার তিনি একজন সিঙ্গেল মাদারও। তার বিবাহবিচ্ছেদের কারণ হিসেবে আজও সমাজ এবং পরিবারের বেশিরভাগ মানুষ তার শিক্ষা এবং চাকরিকেই দোষারোপ করেন৷ তার কর্মস্থলের উচ্চশিক্ষিত বস থেকে শুরু করে বাসার কাছের চায়ের দোকানদার। প্রতিনিয়ত সকলের বাঁকা কথা শুনে চলছেন তিনি।   

 

পেশাগত কারণেই প্রায়ই রাত করে বাড়ি ফিরতে বা বাড়ি থেকে বের হতে হয় বিমানবালা আঁখিকে। আর প্রতিদিনই দারোয়ান থেকে শুরু করে আশেপাশের মানুষ ভিন্ন চোখে তাকান তার দিকে। আঁখি বলেন, 'প্রায়দিনই এমন শুনি যে, 'এসব ঢংয়ের কাজ।  এতোরাতে আবার কিসের কাজ?'  

 

আজও সমাজে কোনো মেয়ে হেনস্তা কিংবা ধর্ষণের শিকার হলে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় তার পোশাক কিংবা চলাফেরাকে। রাত ১০ টায় কোনো মেয়ে প্রয়োজনীয় কাজে বাইরে থাকলেও প্রশ্ন করা হয় 'এতোরাতে বাইরে কি?' 

 

কিছু পরিসংখ্যান দেখে আসলে সমাজে নারীদের উপেক্ষিত হওয়ার বিষয়গুলো আরো পরিষ্কার হয়ে যাবে। নারী পুরুষের আয় বৈষম্যের দিকটিই তুলে ধরা যাক। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা আইএলও'র গ্লোবাল ওয়েজ রিপোর্টে দেখা যায় বিশ্বে গড়ে নারী পুরুষের আয় বৈষম্য ২২ শতাংশের মতো।  

 

খেয়াল করলে দেখতে পাবেন যত বড় বড় পদের দিকে আমরা তাকাই ধীরে ধীরে নারীদের উপস্থিতি কমতে থাকে। ওভারটাইমের সুবিধা পুরুষদের জন্য বেশি। কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ ও নিরাপত্তার বাধা তো রয়েছেই৷ আর এসব কারণেই আয়ের বৈষম্যও প্রকট হয়। 

 

এবার চলুন একটু প্রযুক্তি খাতের দিকে নজর দেই। এইযে প্রযুক্তির এতো এতো উৎকর্ষ সাধন হচ্ছে। আজকাল দিনের বেশিরভাগ সময় আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাটাই ।  কিন্তু এই আধুনিকতার ভিড়েও কি নারী নিরাপদ? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী প্রায় প্রতিটিই নারীই কোনো না কোনো সময় সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে।  

 

২০১৯ সালে সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন (সিসিএ ফাউন্ডেশন) ''বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের প্রবণতা" শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, সাইবার অপরাধের শিকার ৬৮ শতাংশই নারী। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি দেশের সাইবার অপরাধ নিয়ে একটি গবেষণার প্রতিবেদনে দেখা যায় শতকরা প্রায় ৫২ ভাগ অভিযোগই আসে নারীদের থেকে৷ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী মেয়েরা। অভিযোগের একটি বড় অংশের অভিযোগ ফেসবুক সংক্রান্ত৷ যার মধ্যে আইডি হ্যাক থেকে শুরু করে সুপার ইম্পোজ ছবি এবং পর্নোগ্রাফির মতো ভয়াবহ অভিযোগও রয়েছে৷

 

বেশিরভাগক্ষেত্রেই নারীরা সঠিক বিচার পাননা। বরং লোকলজ্জার ভয়ে গুটিয়ে নেন নিজেদের। আজকের এই আধুনিক সমাজেও নারীকে হেনস্তা হতে হয় পদে পদে। ধর্ষিত হয়েও মুখ লুকোতে হয় ঘরের এককোনে। আঙ্গুল তোলা হয় হেনস্তার শিকার একজন নারীর দিকেই। অথচ আমরা নাকি এক আধুনিক সমাজে বসবাস করছি!