ঘুণে ধরা মানসিকতা!

ঘুণে ধরা মানসিকতা!
ছবি: সংগৃহীত
দেশজুড়ে যখন চলছিলো হিন্দু ধর্মের অন্যতম বৃহৎ উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা৷ ঠিক তখনই দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে জেগে ওঠে একদল বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ। কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে পবিত্র 'কুরআন শরীফ অবমাননার' অভিযোগের ঘটনা নিয়ে শুরু হয় দাঙ্গা। পুরো দেশ শিকার হয় একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের৷ 

বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে চলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথা কারোই অজানা নয়। খবরের কাগজ, টেলিভিশন কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় চোখ বুলালেই যথেষ্ট। ধর্মের নাম নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। যে পরিস্থিতি বারবার তুলে ধরছে আমাদের ঘুণে ধরা মানসিকতার পরিচয়।  

 

দেশজুড়ে যখন চলছিলো হিন্দু ধর্মের অন্যতম বৃহৎ উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা৷ ঠিক তখনই দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে জেগে ওঠে একদল বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ। কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে পবিত্র 'কুরআন শরীফ অবমাননার' অভিযোগের ঘটনা নিয়ে শুরু হয় দাঙ্গা। পুরো দেশ শিকার হয় একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের৷ 

 

১৩ অক্টোবর(২০২১) সকালে কুমিল্লায় নানুয়া দিঘীর-পাড় পূজামণ্ডপে ‘কুরআন অবমাননার’ অভিযোগ তুলে বেশ কিছু মন্দিরসহ শহরের সালাউদ্দীন রোড কালীগাছতলা ও কাপুড়িয়া পট্টির মণ্ডপেও হামলা হয়। পরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে শহরে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। এর জের ধরে গাজীপুর, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও মৌলভীবাজারে বেশ কিছু মন্দির ও পূজামণ্ডপেও হামলা-ভাঙচুর হয়। 

 

চাঁদপুরে হামলাকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে প্রাণহানিও ঘটে। পরে সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে ১৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ। বান্দরবানের লামা উপজেলায় মিছিল করে এসে মন্দির ও হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা করা হয়েছে। এ সময় দুইপক্ষের সংঘর্ষে ১২-১৩ জন আহত হন। সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে একজন এসআইসহ তিন পুলিশ সদস্যও আহত হন।

 

এরপর এসব হামলার রেশ কাটিয়ে না উঠতেই গতকাল  রোববার আনুমানিক রাত ১০টার দিকে রংপুরের পীরগঞ্জে অন্তত তিনটি গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বেশ কয়েকটি ঘর-বাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। পীরগঞ্জের রামনাথপুর ইউনিয়নের বাটের হাট নামক এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা ১৫ থেকে ২০টি বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেয় বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। 

 

ইসলামের নাম নিয়ে এ আক্রমণ, হামলা, দাঙ্গা  ইসলাম ঠিক কতটুকু সমর্থন করে? এক হাদিসে রাসুল সা. বলেন, ‘জেনে রেখ, কেউ যদি কোনো অমুসলিমকে জুলুম করে, বা তার অনুমতি ছাড়া তার কোনো বস্তু গ্রহণ করে তাহলে কাল কেয়ামতে আমি তার বিরুদ্ধে বাদী হব। (আবু দাউদ শরীফ, হাদিস নং ২৬২৬)


অন্যধর্মের মানুষের উপর হামলা, আক্রমণ নিয়ে রাসূল সা. বলেন, ‘কেউ কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যা করলে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না, অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়। (বুখারী শরীফ, হাদিস নং ৩১৬৬) অন্যদিকে পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে- ওয়াল্লাহু লা ইউহিব্বুল ফাসাদ। অর্থাৎ, আল্লাহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি পছন্দ করেন না। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২০৫)। 

 

তবুও একদল ধর্মান্ধ মানুষ ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে দাঙ্গাহাঙ্গামা৷ সুপরিকল্পিতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের ষড়যন্ত্র। শুধু যে ভাংচুর, হামলা তাই নয় আমাদের বিকৃত মানসিকতার পরিচয় মিলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতেও৷ চলমান দাঙ্গাহাঙ্গামাকে সমর্থন দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের মন্তব্য প্রকাশ করছেন অনেকেই৷  

 

অথচ এই দেশটিই একসময় সকল ধর্মবর্ণের বাঁধা পেরিয়ে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলো নিজেদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ দেশে এমন অরাজকতা স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের মানসিকতা কতটা সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। এ লজ্জা শুধু গুটিকয়েক মানুষের নয়, এ লজ্জা পুরো জাতির। আমাদের এই ঘুণে ধরা মানসিকতা সারিয়ে না তুললে হয়তো অদূরেই দাঁড়িয়ে আছে 'ধ্বংস'।