গণমাধ্যমে নারী বডিশেমিংয়ের প্রতিবাদে বিবৃতি

গণমাধ্যমে নারী বডিশেমিংয়ের প্রতিবাদে বিবৃতি
ছবি : সংগৃহীত
প্রাচীন কবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের লেখা কবিতা ‘স্ত্রীজাতি কথন’ নিয়ে ফটোশ্যুট ও ফিচার প্রকাশ করেছিলো 'ক্যানভাস' ম্যাগাজিন। কবিতাটিতে বর্ণিত পদ্মিনী, হস্তিনী, চিত্রিণী ও শঙ্খিনী নারী কেমন হবে সেটিই তুলে ধরা হয়েছে লেখা ও ছবিতে। এক্ষেত্রে নারীদের অবমাননা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই নারী অধিকারকর্মীরা।

যদি কারও দেহের আকার, আয়তন বা ওজন নিয়ে প্রকাশ্যে এমন কোনো সমালোচনা বা মন্তব্য করেন যাতে সেই মানুষটি লজ্জাবোধ করেন বা অপমানিত হন, তবে তা বডি শেমিং। এইযে আমাদের আশেপাশে মানুষদের মোটকা, শুঁটকো ও বাটকু ইত্যাদি নামে ডাকা হয়, এটি বডি শেমিং এর উদাহরণ। এই বডি শেমিং কিন্তু ভয়াবহ ফল নিয়ে আসতে পারে জীবনে। বডি শেমিংয়ের অন্যতম ভয়াবহ ফলাফল হলো আত্মবিশ্বাসহীনতা। প্রতিনিয়ত নেগেটিভ মন্তব্য শুনতে শুনতে একপর্যায়ে মানুষ সেটাই বিশ্বাস করা শুরু করে এবং ফলাফল হচ্ছে ডিপ্রেশন, অ্যানোরেক্সিয়া ও বুলেমিয়া নার্ভোসার মতো মানসিক ব্যাধি যার সঙ্গে আসে পুষ্টিহীনতা জড়িত আর অনেক অসুখ। কেউ কেউ ড্রাগস বা গাঁজা খাওয়া শুরু করে শুধুমাত্র শুকানোর জন্য। কিন্তু আর ফেরত না আসতে পেরে নিজের, পরিবারের তথা সমাজের জীবন ধ্বংস করে দেয়। আর এর শুকার নারীদেরই বেশি হতে হয়।

 

এটি বর্তমানে বেশ বিস্তার লাভ করেছে। সম্প্রতি লাইফস্টাইল বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ক্যানভাস’ চিত্রায়নের মাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে চরম অবমাননাকর ও বডি শেমিং প্রকাশ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর বিরুদ্ধে ৩১ নারী অধিকারকর্মী বিবৃতি দিয়েছেন।

 

বিবৃতি দেয়া সেই ৩১ নারী হলেন-  সুপ্রীতি ধর, শারমিন শামস, কাবেরী গায়েন, স্নিগ্ধা রেজওয়ানা, ফারহানা হাফিজ, কাশফিয়া ফিরোজ, আফসানা কিশোয়ার লোচন, তাসলিমা মিজি, নাহিদ সুলতানা, দিলশানা পারুল, গীতি আরা নাসরিন, প্রমা ইসরাত, লাকী আক্তার, অপরাজিতা সঙ্গীতা, মাহা মির্জা, ইশরাত জাহান ঊর্মি, নাহিদ আক্তার, কানিজ আকলিমা সুলতানা, ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী, শাশ্বতী বিপ্লব, জান্নাতুন নাঈম প্রীতি, নাহিদা আক্তার,অরণি আঞ্জুম, ফাহমিদা হানিফ ইলা, মেহেরুন নূর রহমান, ক্যামেলিয়া আলম, হাবিবা রহমান, মিতি সানজানা, বীথি সপ্তর্ষি, শাহাজাদী বেগম, মারজিয়া প্রভা।

 

প্রাচীন কবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের লেখা কবিতা ‘স্ত্রীজাতি কথন’ নিয়ে ফটোশ্যুট ও ফিচার প্রকাশ করেছিলো 'ক্যানভাস' ম্যাগাজিন। কবিতাটিতে বর্ণিত পদ্মিনী, হস্তিনী, চিত্রিণী ও শঙ্খিনী নারী কেমন হবে সেটিই তুলে ধরা হয়েছে লেখা ও ছবিতে। এক্ষেত্রে নারীদের অবমাননা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই নারী অধিকারকর্মীরা। 

 

তারা বিবৃতিতে বলেছেন, মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন কন্টেন্ট সরাসরি নারীর প্রতি চরম অপমান, অবমাননাকর ও অরুচিশীল। বিবৃতিতে অবিলম্বে ক্যানভাস কর্তৃপক্ষকে এই ফিচার প্রকাশের দায়ে ক্ষমা চাওয়ার ও ম্যাগাজিনের অনলাইন সংস্করণ থেকে লেখাটি তুলে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। সেই সঙ্গে, ভবিষ্যতে এ ধরনের সেক্সিস্ট, বডি শেমিংমূলক কন্টেন্ট প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে সতর্ক থাকারও অনুরোধ জানানো হয়।

 

বিবৃতে বলা হয়, ‘কোনো একটি অসৎ মহল অসৎ উদ্দেশ্যে নারীর অগ্রযাত্রা, কুপ্রথা ভাঙার লড়াই ও মাথা উঁচু করে চলার জন্য অর্জিত সাহস, মনোবল ও আত্মবিশ্বাসকে ভেঙে দিতে তৎপর হয়েছে। তাই নারীর প্রতি এ ধরনের মনোভাব পোষণকারী কবিতাকে নতুন করে সামনে এনে এই পুরুষতান্ত্রিক, ন্যক্কারজনক মনোভঙ্গি ও চেতনা তোষণকারী গণমাধ্যম ক্যানভাসের এ ধরনের আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন নারীবাদী আন্দোলনে সক্রিয় কর্মীরা।’

 

আরো বলা হয়, ‘আমরা জানি, যে কোনো সমাজ বদলে একটি দেশের গণমাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। লিঙ্গ বৈষম্য, নারীর প্রতি অবমাননা ও অবিচার দূরীকরণে গণমাধ্যমের প্রগতিশীল চিন্তা ও পদক্ষেপ সবসময়ই জরুরি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আমরা, বাংলাদেশে নারীবাদ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত কর্মীরা লক্ষ্য করছি যে, বেশ কিছুকাল ধরেই এদেশের বেশ কিছু মূলধারার গণমাধ্যম নারীর প্রতি অবমাননাকর ফিচার, রিপোর্ট, ফটো ইত্যাদি প্রকাশ করে চলেছে। আমরা আতঙ্কিত হয়ে দেখছি যে, যেখানে ক্রমশ আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে চলবার কথা, সেখানে নানারকম কন্টেন্ট তৈরি ও প্রকাশ হচ্ছে মূলধারার গণমাধ্যমে, যে কন্টেন্টগুলো সরাসরি নারীর প্রতি চরম অপমান, অবমাননার পক্ষে অরুচিশীল বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।’

 

এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুটি হ্যাশট্যাগও চালু করেছেন এই ৩১ জন নারীবাদী অধিকারকর্মী।  হ্যাশট্যাগ দুটি হলো— #stop_body_shaming_in_media,  #feminists_of_Bangladesh