নাগরিকমত

মহামারির নাম অজ্ঞতা!

মহামারির নাম অজ্ঞতা!
"বিশ্বাসের ভাইরাস অনেককে ঠেলে দিয়েছে জনসমাবেশের দিকে, আবার অনেককেই ঠেলে দিয়েছে অমানবিকতার দিকে।"

দুই শ্রেণির মানুষ কথা শুনতে নারাজ- এক ধর্মান্ধ, আরেক উন্মাদ। এদের কাণ্ডকীর্তি মহামারী করোনা ভাইরাসও ঠেকাতে পারছে না। এদেরকে আগে না দমিয়ে এই লকডাউনের আদৌ প্রয়োজন ছিলো বলে মনে করি না। অযথাই লকডাউন করে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে লাভ কি? যতদিন বাঁচি, খেয়ে পরেই বাঁচি। আর এই ঘাড়তেরা মানুষগুলো যা ইচ্ছে তাই করুক! আমার এই কথাগুলো শুনে অনেক ধর্মান্ধ মানুষ খেপে উঠলেও ধর্ম ভীরু মানুষেরা নিশ্চয়ই একমত হবেন।

 

গত ১১ এপ্রিল। করোনা আক্রান্ত হয়ে বাঞ্ছারামপুরের এক ব্যক্তি এবং করোনার আলামত নিয়ে দুই নারীর মৃত্যুর পর পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এই বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে পূর্ব ঘোষণা দিয়ে হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে এক ধর্মীয় নেতার জানাজার নামাজের আয়োজন হলো কোন যুক্তিতে? প্রশাসনই বা এই বেআইনি আয়োজন করার সুযোগ দিলো কীভাবে? ফলশ্রুতিতে লকডাউন করা হয়েছে আশেপাশের ১৮টি গ্রাম। ব্যাপক জনসমাগম ঠেকাতে না পারায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এএসপি সার্কেল (সরাইল) ও সরাইল থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু জনসমাগমকে জানাজায় আমন্ত্রণকারী ঐ ধর্মীয় নেতার পরিবার, দল, গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

 

করোনার শুরু থেকেই ধর্মীয় শিক্ষাগুরু ও বক্তাদের অনেকেই একে পাত্তা দিতে চাননি। বরং ওয়াজ-মাহফিলে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন, বাংলাদেশে করোনার আক্রমণ হবে না। ভক্ত-আশেকানদের মাঝে নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন বা দিচ্ছেন। ফলে কার্যত করোনা সংক্রান্ত সরকারের সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পুরোটাই হুমকির মুখে পড়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় লাখো মানুষের জমায়েত ধর্মীয় আবেগেরই অংশ। ধর্মীয় আবেগকে দমন করা সহজ কাজ নয়। তবে সময়কে বিবেচনায় নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ধর্মীয় বক্তারা কি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারতেন না? করোনা থেকে বাঁচতে সৌদি আরবসহ অন্যান্য ইসলামি দেশ মসজিদে জমায়েত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আর আমাদের দেশে অনেক ধর্মীয় বক্তা, আলেম, ওলামা মসজিদ খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। জাতি হিসেবে আমরা শিক্ষিত হলেও আমাদেরকে ধার্মিক ও ধর্মভীরু হওয়ার পরিবর্তে ধর্মান্ধ বানানো হয়েছে। বুদ্ধির পরিবর্তে ধর্মকে সম্পূর্ণ আবেগ দিয়ে গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে ধর্মান্ধ আবেগী বাঙালির পক্ষে এর চেয়ে আর কী-ইবা দেওয়ার আছে?

 

আমাদের অজ্ঞানতা আছে, বিজ্ঞানমনস্কতা নেই– জনগণকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলার দিকে গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে রাষ্ট্র ও সরকার কী চেষ্টা চালিয়েছে? প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। মানুষ এখন শুধু বিজ্ঞানমনস্কতার ওপরেই আস্থা হারায়নি, শাসনতন্ত্রের ওপরেও আস্থা হারাচ্ছে। আর এই আস্থার ফাঁকাস্থান এখন পারলৌকিকতায় ঠাঁসা। স্বামী, সন্তান সবাই মিলে বয়সী এক নারীকে বনের মধ্যে ফেলে রেখে এসেছে করোনা ভাইরাসের ভয়ে। এই অমানবিক নিষ্ঠুরতা মূলত ব্যাখ্যাতীত। যদি ওই পরিবারের লোকজন বিশ্বাস করতো অসুস্থতার কথা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় সরকার, পাড়া-প্রতিবেশী কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে, মানুষটিকে ঘরে রাখতে কোনো সমস্যা হবে না তাদের, তাহলে কি তারা পা বাড়াত বনের পথে? বিশ্বাসের ভাইরাস অনেককে ঠেলে দিয়েছে জনসমাবেশের দিকে, আবার অনেককেই ঠেলে দিয়েছে অমানবিকতার দিকে।


"বিশ্বাসের ভাইরাস অনেককে ঠেলে দিয়েছে জনসমাবেশের দিকে,
আবার অনেককেই ঠেলে দিয়েছে অমানবিকতার দিকে।"

 

মহামারীর সময় একটি এলাকা লকডাউন করার কিংবা মানুষজনকে ঘরে রাখার প্রধানতম লক্ষ্যই হলো, একজন নাগরিক নিজে সংক্রমিত হোন বা না হোন, অন্য কারও সংক্রমণের কারণ যেন না হন- সে জন্যে তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের জানাচ্ছে, এ সময় তাকে খাদ্য পৌঁছে দেয়া হয়, তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। ঘরের মধ্যেই তিনি কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবেন, তার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সেসবের কিছু হচ্ছে না, বরং যা হয়েছে বা হচ্ছে তা অকল্পনীয় অমানবিকতা। সরকারি ছুটি দিয়ে অথচ লকডাউন ঘোষণা না করে এখানে নগরের অসংখ্য মানুষকে গ্রামের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। আবার গার্মেন্টস কারখানা খোলার ঘোষণা দিয়ে গ্রাম ও মফস্বলে যাওয়া অসংখ্য মানুষকে আবার রাজধানীমুখী করা হয়েছে। এখন আবার কিছু গার্মেন্টসের সামনে বেতনের দাবিতে হাজার হাজার শ্রমিক বিক্ষোভ করছে। ঢাকার কাওরানবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় তুচ্ছ কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জমায়েত হচ্ছে। সঙ্গত কারণেই মনে প্রশ্ন জাগে, এই যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার কথা বলা হচ্ছে, তার কি কোনো যৌক্তিকতা আছে?

 

আপনারা সব মেনে নিয়ে পেটে পাথর বেঁধে চোখে গগলস লাগিয়ে মুখে মাস্ক পরে একটু পর পর সাবান পানিতে হাত ধুলেই কি বিপদমুক্ত থাকবেন? মোটেও না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে যতই সচেতন থাকুন না কেনো, কোনোভাবেই আপনি নিরাপদ নন। বারোটা কিন্তু ইতিমধ্যেই বেজে গেছে। মিরাকেল বা অতি অলৌকিক কিছু না ঘটলে বাংলাদেশ মহামারীর ছোবল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। আমাদের অজ্ঞতাই আজ জাতির আগাম জানাজার খবর দিয়েছে!

 

লেখক: রিয়াদ খন্দকার

সংবাদকর্মী ও ফিচার লেখক