নারীর ক্ষমতায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নারীর ক্ষমতায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নারীর ক্ষমতায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠালগ্নে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা ছিল ৬০ জন। এর মধ্যে কোন নারী শিক্ষক ছিলেননা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য কোন পদেও সে সময় নারী কর্মী ছিলেন না। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ১৯৯২জন শিক্ষকের মধ্যে এখন নারী শিক্ষকের সংখ্যা ৬৬৮জন।

আজ থেকে ১০০ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠা হয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিলেন ৮৪৭ জন, যাদের মধ্যে ছাত্রী ছিলেন একজন। ক্রমেই একজন মেয়ে শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু করা বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে নারী ক্ষমতায়নের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজের এলিট পরিবারের বা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত পরিবারের মেয়েরা পড়তে আসতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রথম শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া একমাত্র ছাত্রী ছিলেন লীলা নাগ।  তার জেদ ছিল তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়বেন।  তখন  বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষার অর্থাৎ ছেলেমেয়ে একসাথে পড়ার প্রচলন ছিল না। মেয়েরা কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে না এই মর্মে লীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও ভাইস চ্যান্সেলরের সঙ্গে দেখা করে নিজের কেস প্লীড করেন। তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর স্যার পি জে হার্টজ লীলার মেধা ও আকাঙ্ক্ষা বিবেচনা করে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বিশেষ অনুমতি প্রদান করেন। এভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়।   তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করতে ভর্তি হয়েছিলেন, ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। এরপর তিনি নারীশিক্ষা প্রসারে আত্মনিয়োগ করেছিলেন।

 

লীলা নাগের পর  তিন শিক্ষাবর্ষে আর কোন ছাত্রী ভর্তি হয়নি। ১৯২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন প্রথম মুসলিম নারী শিক্ষার্থী ফজিলাতুন্নেসা জোহা। ১৯২৫ সালে গণিত বিভাগে এমএসসিতে ভর্তি হন তিনি।  ১৯২৭ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান দখল করে বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন তিনি। পরে তিনি ইংল্যান্ডে উচ্চশিক্ষা নিয়ে ফিরে এসে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।

 

এরপর থেকে ক্রমেই বাড়তে থাকে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা। ১৯২৭ সালে সেখানে ছাত্রী ছিলেন নয়জন। ১৯৩৪-৩৫ সালে ছাত্রী ছিলেন ৩৯ জন। এক দশক পরে ১৯৪৫-৪৬ সালে ৯০ জন ছাত্রী ভর্তি হন। ষাটের দশকের প্রায় শেষদিকে, অর্থাৎ ১৯৬৭-৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ১,৩৩৬ জন। আর ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ সমাবর্তনের সময় প্রকাশিত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪৩ হাজার ৩৯৬জনের মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা ১৩ হাজার ১৯৫ জন।


প্রতিষ্ঠালগ্নে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা ছিল ৬০ জন। এর মধ্যে কোন নারী শিক্ষক ছিলেননা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য কোন পদেও সে সময় নারী কর্মী ছিলেন না। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ১৯৯২জন শিক্ষকের মধ্যে এখন নারী শিক্ষকের সংখ্যা ৬৬৮জন।


২০০৯ সাল থেকে নারী শিক্ষক নিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ১১ বছর ধরে শিক্ষকের সংখ্যার ক্ষেত্রে পুরুষ-নারীর ভারসাম্যহীনতা কমছে।  বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৬ বছরের ইতিহাসে উপ-উপাচার্যের পদে প্রথমবারের মতো দায়িত্ব পালন করছেন একজন নারী। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি তিনজন পুরুষ শিক্ষকের বিপরীতে রয়েছেন একজন নারী শিক্ষক। ১৬ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের চেয়ারপার্সন এবং ৫ ইনস্টিটিউটের পরিচালকের দায়িত্বও পালন করছেন নারী। অর্থনীতি, আইন ও সাংবাদিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগে পুরুষ ও নারী শিক্ষকের সংখ্যা কাছাকাছি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঐতিহাসিকভাবে দেশের সমাজ-সংস্কৃতির যে কোন পরিবর্তনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নীরব বিপ্লব চলছে। 

 

রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামে নারী শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিনি ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।  এছাড়াও  দেশের অনেক গুণী নারী ব্যক্তিত্ব রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের।