লকডাউনে বাড়ছে পারিবারিক নির্যাতন!

প্রতীকী ছবি
বিশ্বের উন্নত কিংবা গবীর দেশ বলে নয়, এই লকডাউন পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে নারী ও শিশুদের উপর নির্যাতনের হার যে বাড়ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ভারতের সেই গৃহবধূর স্বামী যখন কাজে যেত, বাচ্চারা যখন স্কুলে যেত, তখন সে যতটুকু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, বর্তমানে স্বামীর আয় কমে আসার পর সেই নির্যাতনের পরিমাণ কোনোভাবেই কমার কথা নয়। বরং বেড়েছে অনেক গুনে। সেই সঙ্গে বাচ্চাদের মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে এই আতঙ্ক আর চোখের সামনে এই অমানবিক দৃশ্য যে কতটা ক্ষতিকর সেটাও ভাবা যায় না। ভারতের এই গৃহবধূর মতো যুক্তরাষ্ট্রে যেই কিশোরী হোম-কোয়ারেন্টাইনের প্রতিটা দিন পাড় করছে আতঙ্কের মধ্য দিয়ে, এরই বা শেষ কোথায়!

নিঃসন্দেহে বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু করোনা ভাইরাস। গত বছরের ডিসেম্বরে চীন থেকে শুরু করে এপ্রিল পর্যন্ত এর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় ১৯০টি দেশে। বেশি সংক্রমিত দেশগুলোতে চলছে 'টোটাল লকডাউন' পরিস্থিতি। আর বাকিগুলোতেও সতর্ক অবস্থানে জনগণ। খুব প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন না কেউই। বিশ্বে সবগুলো সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাই এক নাগারে চলছে একের পর এক খবর আর আলোচনা-সমালোচনা। বাংলাদেশের পরিস্থিতিও এর ব্যতিক্রম নয়। পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সবখানেই আলোচনার শীর্ষে করোনা। আর হবেই না কেন! বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুসারে পুরো বিশ্বে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ। সংক্রমণের শিকার হয়েছেন প্রায় ১৩ লাখ। আর এই মুহূর্তে সরকারি হিসেবে বাংলাদেশে মৃতের সংখ্যা ১২, আক্রান্তের সংখ্যা ১২৩।


করোনায় সংক্রমণের হাত থেকে রেহাই পাননি বিশ্ব নেতারাও। এই ভাইরাসের ওষুধ বা টিকা নেই কারো কাছেই। তাই বিশ্বনেতারাও এখন যার যার অবস্থান থেকে লড়াই করে যাচ্ছেন নিজ নিজ দেশের জনগণকে সুরক্ষিত রাখতে। স্বাভাবিকভাবেই সেগুলো নিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুললেই এখন দেখা যায় মানুষের মধ্যে চাপা আতঙ্ক। নতুন করে কতজন মারা গেল, আক্রান্ত কতজন কিংবা কোন দেশের কি অবস্থা, ট্রাম্প অথবা মোদি কি বলছে, কিংবা দেশের রাজনীতিবীদরাই বা কি বলে চলছেন, এগুলো নিয়ে নানা মতামত আর আলোচনা করেই অলস সময় পাড় করছেন কোয়ারেন্টাইনে থাকা বাঙালীরা।  


কিন্তু এই পরিস্থিতির মধ্যেই একটা নতুন প্রশ্নের জন্ম দিলো আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা বিবিসি। গত ৩১ মার্চে 'করোনাভাইরাস: নানা দেশে পারিবারিক সহিংসতা যেভাবে বাড়ছে' শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে তারা। তুলে ধরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দুইজন নারীর গল্প। বিভিন্ন সংগঠন বলছে সাধারণ সময়ে এসব নির্যাতন থেকে বাঁচতে যারা বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা পেতেন বা সাহায্য নিতেন সেরকম নারীদের জন্য এখন একটা কঠিন সময়। কারণ লকডাউনের কারণে তারা না যেতে পারছেন বাইরে বা বাইরে থেকে তাদের সাহায্য করতেও এসব সংস্থাগুলো পারছে না, কারণ সব জায়গায় সব কিছু বন্ধ হয়ে গেছে।


ভারতের গ্রামে থাকা একটি দরিদ্র পরিবারের এক গৃহবধূর কথা উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে। তার স্বামী অটোরিকশা চালক, লকডাউনের ফলে যার আয় প্রায় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ, তাই তারাও থাকছে বাড়িতেই। স্বামীর হাতে নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হন এই গৃহবধূ। আগে বাচ্চারা সেই দৃশ্য না দেখলেও এখন সব কিছু হয় তাদের সামনেই। তাদের সামনেই মাতাল বাবা মাকে নিয়ম করে মারেন, চুলের মুঠি ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে বেড়ান। আর রাগ বেশি থাকলে হয়তো বাচ্চাদেরও সহ্য করতে হয় বাবার এও আচরণ। ভয় পায় তারা, মায়ের পেছনে লুকায়। আগে স্বামী কাজে বের হলে গোপনে এলাকার একটি সংগঠনের মাধ্যমে সেলাই ও লেখাপড়া শিখছিলেন এই গৃহবধূ। নিজে উপার্জনক্ষম হলে অত্যাচারী স্বামীকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবতেন তিনি। ঘরে নির্যাতনের শিকার নারীদের নানাভাবে সহায়তাও দিত সেই সংগঠনের পরামর্শদাতারা। কিন্তু লকডাউনে এখন ক্লাস বন্ধ, ফলে নির্যাতনের ব্যাপারে কোনো সহায়তাও নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।


যুক্তরাষ্ট্রের আরেক কিশোরীর কথা উঠে এসেছে একই প্রতিবেদনে। শিশুকাল থেকেই যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে নিজ বাবা হাতে। তবে এই কথা তার মা অথবা বোনকে ঠিকঠাক মতো বলতে পারেনি সে। বাবা বাড়িতে থাকলে তাই আতঙ্কিত থাকে সে। ঘর থেকে পর্যন্ত বের হয় না। মাত্র কয়েক মাস আগে থেরাপি নিতে শুরু করে সে। এক সময় মায়ের সহায়তার আশায় বাবার বাড়ি ছেড়ে দেয়। তবে করোনার কারণে মায়ের স্বল্প আয়ের পথটিও বন্ধ হয়ে যায় একদিন। মেয়েকে আবারো বাবার কাছেই ফিরে যেতে বলে মা। এদিকে থেরাপি নেওয়ার ফলে কিছুটা আশার আলো দেখতে পেলেও এক সময় সেটাও বন্ধ হয়ে যায় করোনার প্রকোপে। এখন একরকম বাধ্য হয়েই বাবার সঙ্গে থাকতে হচ্ছে তাকে। একটা একটা করে দিন কাটাতে হচ্ছে আতঙ্কের মধ্যে।


করোনার কারণে যেখানে জীবনের তাগিদে বাড়িতে থাকতে হচ্ছে বিশ্ববাসীকে, সেখানে এই ধরনের সমস্যা দিন দিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আর এই অবস্থা শুধু ভারত কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নয়। চীনের হুবেই প্রদেশে পারিবারিক নির্যাতনের হার বেড়েছে তিনগুণ, ব্রাজিলের বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছে এই হার বাড়বে আরো ৩০-৪০ শতাংশ, স্পেনের কাতালানে নির্যাতনের হার বেড়েছে ২০ শতাংশ, সাইপ্রাসে বেড়েছে ৩০ শতাংশ, ইতালি, জার্মানি ও ভারত প্রভৃতি দেশেও আশংকাজনক হারে বাড়ছে পারিবারিক নির্যাতন। ইতালিতে ভায়োলেন্স নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে নারীদের নিয়ে কাজ করা ডিআইআরইয়ের সভাপতি লেলা প্যালাডিনো জানান, একটি বার্তা এমন ছিল যে, এক নারী নিজেকে বাথরুমে আটকে রেখে সাহায্য চাইছিল। এই অভূতপূর্ব জরুরি অবস্থায় নারীরা বাইরে যেতে না পারায় আরও হতাশা বৃদ্ধি পেয়েছে।


আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোতেও প্রকাশ পেয়েছে লকডাউনের ফলে নারী ও শিশুদের উপর পারিবারিক নির্যাতনের ক্রমবর্ধমান চিত্র। বিবিসির তথ্য বলছে,  ব্রিটেনে নির্যাতনের ঘটনা রিপোর্ট করার জন্য জাতীয় পর্যায়ে যে হটলাইনের ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে গত সপ্তাহান্তে ৬৫ শতাংশের বেশি টেলিফোন কল এসেছে বলে সরকার জানিয়েছে। দ্যা গার্ডিয়ান  বলছে, মানুষের জীবন বাঁচাতে বিশ্বব্যাপী গৃহীত পদক্ষেপ লকডাউনের কারণে আমাদের সমাজের একটি দুর্বল গ্রুপ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। আর এই দলে রয়েছে নারী ও শিশুরা। বিশ্বব্যাপী চলা হোম কোয়ারেন্টাইনে নির্যাতনকারীদের হাতে আরও নির্যাতিত হবে নারী ও শিশুরা। আর এর আলামত ইতোমধ্যে মিলতে শুরু করেছে।


বিশ্বের উন্নত কিংবা গবীর দেশ বলে নয়, এই লকডাউন পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে নারী ও শিশুদের উপর নির্যাতনের হার যে বাড়ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ভারতের সেই গৃহবধূর স্বামী যখন কাজে যেত, বাচ্চারা যখন স্কুলে যেত, তখন সে যতটুকু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, বর্তমানে স্বামীর আয় কমে আসার পর সেই নির্যাতনের পরিমাণ কোনোভাবেই কমার কথা নয়। বরং বেড়েছে অনেক গুনে। সেই সঙ্গে বাচ্চাদের মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে এই আতঙ্ক আর চোখের সামনে এই অমানবিক দৃশ্য যে কতটা ক্ষতিকর সেটাও ভাবা যায় না। ভারতের এই গৃহবধূর মতো যুক্তরাষ্ট্রে যেই কিশোরী হোম-কোয়ারেন্টাইনের প্রতিটা দিন পাড় করছে আতঙ্কের মধ্য দিয়ে, এরই বা শেষ কোথায়! আমেরিকা ও ব্রিটেনের মতো পৃথিবীর উন্নয়নশীল বেশির ভাগ দেশে হটলাইনে সাহায্য চাইবার মত ব্যবস্থা নেই। এসব দেশে যেখানে নিম্ন আয়ের পরিবারে এক বা দু কামরার মধ্যে মানুষকে দিন কাটাতে হয়, সেখানে নির্যাতনকারীর অত্যাচারের প্রতিকার চাওয়া এই কঠিন সময়ে নির্যাতিতদের জন্য একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ।