নারীর গড় আয়ু বেশি কেন?

নারীর গড় আয়ু বেশি কেন?
ছবি: সংগৃহীত
গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রক্রিয়াতেই পুরুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচেন না নারীরা। মহামারী, দুর্ভিক্ষ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগময় পরিবেশেও পুরুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচেন তারা। নারী পুরুষের আয়ুষ্কালের এই পার্থক্যের কারণ অনুসন্ধান করেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় তারা নারী পুরুষের আয়ু ব্যবধানের কিছু কারণ পেয়েছেন। জৈবিক পার্থক্যকেই এর মূল কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে। 

বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বেই পুরুষের চেয়ে নারীদের আয়ুষ্কাল বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৬ সালে বিশ্বে মানুষের গড় আয়ু ছিল ৭২ বছর। গবেষণায় দেখা যায়,পুরুষদের গড় আয়ু যেখানে ৬৯ বছর আট মাস এবং  নারীদের গড় আয়ু ৭৪ বছর দুই মাস। অর্থাৎ নারীরা পুরুষদের চেয়ে প্রায় পাঁচ বছর বেশি বেঁচেছিলেন। 

 

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এর 'বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি ২০২১' প্রতিবেদন অনুযায়ী,  বাংলাদেশে পুরুষদের গড় আয়ু ৭১ বছর ও নারীদের গড় আয়ু ৭৫ বছর। অর্থাৎ দেশে নারীদের গড় আয়ু পুরুষদের তুলনায় ৪ বছর বেশি। ২০১০ সালের আদমশুমারিতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৫৩ হাজার ৩৬৪ জন ব্যক্তিকে পাওয়া যায় যাদের বয়স ১০০ বছরেরও বেশি। তাদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা মাত্র ৯১৬২ জন। অন্যদিকে নারীর সংখ্যা ৪৪ হাজার ২০২ জন। 

 

গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রক্রিয়াতেই পুরুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচেন না নারীরা। মহামারী, দুর্ভিক্ষ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগময় পরিবেশেও পুরুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচেন তারা। নারী পুরুষের আয়ুষ্কালের এই পার্থক্যের কারণ অনুসন্ধান করেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় তারা নারী পুরুষের আয়ু ব্যবধানের কিছু কারণ পেয়েছেন। জৈবিক পার্থক্যকেই এর মূল কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে। 

 

১. ভ্রুণগত কারণ

 

ভ্রূণের কারণে পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি দিন বাঁচেন। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ডেভিড জেমস বলেন, নারী ভ্রূণের চেয়ে পুরুষ ভ্রূণের নাকি অধিক হারে মৃত্যু হয়। লিঙ্গ নির্ধারণকারী ক্রোমোজোমগুলোর কারণেই এমনটি হয়।

 

২. মাতৃগর্ভে পরিপক্বতা

 

মাতৃগর্ভে পুরুষ ভ্রূণে পরিপূর্ণ গড়নের পরিপক্বতা আসে না। শিশু জন্মের পরও দেহের পরিপক্বতা আসতে অনেক সময় লাগে। অন্যদিকে সন্তান  ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগের নারী ভ্রূণ মাতৃগর্ভ থেকে পরিপূর্ণতা পায়। ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হয়। এতে তাদের আয়ু দীর্ঘ হয়।

 

৩. হরমোন

 

পুরুষের আয়ুষ্কাল তুলনামূলক কম হওয়ার জন্য টেস্টোস্টেরন হরমোনও দায়ী। টেস্টোস্টেরন এমন একটি হরমোন যেটা মূলত পুরুষের বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণ করে। যেমন- দীর্ঘকায় দেহ, শক্তিশালী পেশি, ভারী কণ্ঠ এবং লোমশ শরীর ইত্যাদি। সাধারণত বয়ঃসন্ধিকালের শেষ সময়টার দিকে ছেলেদের শরীরে এই টেস্টোস্টেরন হরমোন নিঃসরণ হয়। এ সময় তাদের মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি থাকে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হরমোন থাকার কারণে পুরুষরা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে উৎসাহী হয়, যেমন লড়াই করা, খুব দ্রুত গতিতে মোটরসাইকেল বা গাড়ি ড্রাইভিং এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতাও পুরুষের বেশি থাকে। এ হরমোনের কারণেই যে কোনো দুর্ঘটনায় পুরুষের মৃত্যুর মুখে পড়ার হার বেশি। 

 

৪. ক্রোমোজম

 

নারীদেহের ক্রোমোজোমে দীর্ঘজীবী টেলোমেয়ার  নামক উপাদান থাকে। এটি ক্রেমোজোমকে সুরক্ষিত রাখে। দীর্ঘজীবী টেলোমেয়ার থাকার কারণে নারীরা বেশিদিন বাঁচেন।

 

৫. আচরণ ও পরিবেশ

 

সংঘাতপূর্ণ এলাকায় পুরুষের আয়ু কম হয়। এছাড়া ধূমপান, মদপান ও অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার ওপরও নির্ভর করে কে কত বছর বাঁচবে। যেমন রাশিয়ান পুরুষ, রাশিয়ার নারীদের চেয়ে ১৩ বছর আগে মারা যায়, কারণ রাশিয়ার পুরুষরা প্রচুর মদ পান করে।

 

৬. সামাজিক বন্ধন

 

একটি গবেষণায় জানা যায়, যারা সামাজিক যোগাযোগ করে, তারা অনেক বেশিদিন বাঁচেন। নারীরা সাধারণত পুরুষদের তুলনায় বেশি সামাজিক যোগাযোগ স্থাপন করে।

 

৬. অন্যান্য

 

নারীরা বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং হিউম্যান জিনোম পদ্ধতিতে অবদান রাখে যা নারীদের দীর্ঘজীবী করতে সাহায্য করে বলে সাম্প্রতিক কিছু গবেষক মত প্রকাশ করেছেন। এছাড়াও শারীরিক পরিশ্রম তাদের শরীরকে আরো মজবুত করে তোলে।

 

বর্তমানে নারী পুরুষের আয়ুকালের এই পার্থক্য থাকলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, ভবিষ্যতে নারী ও পুরুষের মধ্যে আয়ুষ্কালের এ ব্যবধান আর থাকবে না।