এলএসডি যেভাবে জীবনকে ধ্বংস করে

এলএসডি যেভাবে জীবনকে ধ্বংস করে
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন বলছে, এলএসডি গ্রহণের পর অনেকে মনে করেন যে তিনি সবকিছু পরিষ্কার দেখছেন এবং তার শরীরে অতিমানবিক শক্তি এসেছে। এরকম বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার ফলেও অনেকে নানা ধরণের দুর্ঘটনা শিকার হতে পারেন। 

গত শতাব্দীর শুরুর দিকে চিকিৎসা শাস্ত্রে বিশেষ এক ধরনের ওষুধ 'এলএসডি' আবিষ্কৃত হয়, যা আজকের যুগে ব্যবহৃত সবচেয়ে ভয়াবহ ও শক্তিশালী মাদক । ১৯৩৮ সালে সুইচ বিজ্ঞানী আলবার্ট হফম্যান কর্তৃক এলএসডি আবিষ্কারের ৩৩ বছর পর ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ থেকে এই মাদকের  চিকিৎসাশাস্ত্রে ব্যবহারের উপরেও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপি এর ব্যবহার সীমিত করার প্রয়াস চলে। সম্প্রতি বাংলাদেশের এক শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ খুঁজতে গিয়ে এই দেশে এলএসডির ব্যাপারে আলোচনার ঝড় বইতে শুরু করে।

 

এলএসডি স্বচ্ছ, গন্ধহীন একটি পদার্থ। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনস্থ মাদক বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ড্রাগ অ্যাবিউজের তথ্য অনুযায়ী, ডি-লাইসার্জিক অ্যাসিড ডায়েথিলামাইড বা এলএসডি রাসায়নিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি একটি পদার্থ, যা রাই এবং বিভিন্ন ধরণের শস্যের গায়ে জন্মানো এক বিশেষ ধরণের ছত্রাকের শরীরে থাকা লাইসার্জিক অ্যাসিড থেকে তৈরি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের মতে এটি পাউডার, তরল, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের আকারে পাওয়া যায়।

 

এই মাদক এতোটাই শক্তিশালী যে এর পরিমাপ করা হয়ে থাকে মাইক্রোগ্রামে অর্থাৎ ১ গ্রামের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ। সাধারণত এলএসডির একটি ডোজ ৪০ থেকে ৫০০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। এই নেশাদ্রব্য বাজারে ব্লটার কাগজে সরবরাহ করে থাকে, যা জিহ্বার উপরে বা নিচে রেখে নেশাসক্ত হয় মানুষ। 

 

এলএসডি সেবনে মানুষের মস্তিষ্কের সেরোটোনিন নামক রাসায়নিকের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে, যার ফলে মানুষের শ্রবণ ও দর্শন ইন্দ্রিয় অতি সক্রিয় হয়ে যায়। এই জন্য মানুষ এই মাদক সেবনের পর অদ্ভুত রকমের আলো বা রঙ দেখতে পায়, কেউ বা অতি প্রাকৃতিক শব্দ শুনতে পায়। এরা অনেকটা স্বপ্নের জগতে হারিয়ে যায়। বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, এটি ধীরে ধীরে মানুষের অন্যান্য ইন্দ্রিয়কেও প্রভাবিত করে যার ফলে মানুষের স্বাভাবিক বোধশক্তি ও চিন্তা-চেতনা লোপ পায়। 

 

একসময় বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তায় ভোগা রোগীদেরকে এটি পথ্য হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এর ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে বিশ্বব্যাপী এই মাদকের উপর ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আসে। এটি সেবনের ফলে মানুষের হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাত্রা এবং শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এছাড়াও গবেষণা মতে, অনেকের ক্ষেত্রে অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা, অতিরিক্ত ঘাম সহ নানা ধরণের মানসিক সমস্যাও তৈরি হয় । 

 

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন বলছে, এলএসডি গ্রহণের পর অনেকে মনে করেন যে তিনি সবকিছু পরিষ্কার দেখছেন এবং তার শরীরে অতিমানবিক শক্তি এসেছে। এরকম বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার ফলেও অনেকে নানা ধরণের দুর্ঘটনা শিকার হতে পারেন। 

 

অতিরিক্ত আতঙ্কের কারণে মানুষ অনেক সময় মনে করতে পারে যে সে শীঘ্রই মারা যাবে বা মারা যাচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতেও মানুষ আতঙ্কের বশবর্তী হয়ে নানা ধরণের কাজ করে থাকে যার ফলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আতঙ্কিত হওয়ার পাশাপাশি অতি দ্রুত অনুভূতির পরিবর্তন হওয়ার কারণেও মানুষ মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করতে পারে বলে বলছে ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন। 

 

এলএসডি গ্রহণের ফলে সেবনকারী প্রায় আধা ঘণ্টা থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত হ্যালুসিনেট করতে পারে। আর এই সময়েই সে যে কোন ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। অনেক সময় এই মাদক সেবনের প্রভাবে মানুষ আত্মঘাতী হয়ে উঠে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীটির মৃত্যুতে এমনটাই স্পষ্ট হয়ে উঠে।  এছাড়া গবেষণায় জানা যায়, এলএসডি সেবনকারীর মধ্যে কয়েক মাসও পরেও পুনরায় এর প্রভাব সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, যাকে বলা হয়ে থাকে ফ্ল্যাশব্যাক। এর ফলে মানুষ স্থায়ীভাবে মানসিক রোগের শিকার হতে পারে, চরম আসক্তিতে জীবন সম্পর্কে অনীহা চলে আসতে পারে, এছাড়া গর্ভাবস্থার জটিলতা ও ক্যান্সার সৃষ্টির কারণও এলএসডি হতে পারে।