নারী অধিকারে পাকিস্তান থেকে অনেক এগিয়ে বাংলাদেশ!  

নারী অধিকারে পাকিস্তান থেকে অনেক এগিয়ে বাংলাদেশ!  
নারী অধিকারে পাকিস্তান থেকে অনেক এগিয়ে বাংলাদেশ!  
ফরাসি এ বিশ্লেষক তার কলামে পাকিস্তানে নারী অধিকার বিষয়ক বিভিন্ন দিক তুলে ধরে লিখেছেন , পাকিস্তানে বহু বছর ধরেই নারীরা বৈষম্যের শিকার। অর্থনৈতিক, সামাজিক, নাগরিক, রাজনৈতিক- এমন কোনও ক্ষেত্র নেই যেখানে অবহেলিত নন দেশটির নারীরা। নিজের পছন্দে বিয়ে করা বা বাইরে কাজে বের হওয়ার মতো বিষয় গুলোতে প্রতিনিয়ত বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। 

জন্মলগ্ন থেকেই অবহেলার শিকার নারী। শুধু কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলে নয় পুরো বিশ্বেই নারীরা শিকার হয় বৈষম্যের। আর যুগে যুগে সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও করতে দেখা যায় নারীদের। বৈষম্যের মাত্রা যেমন প্রতিটি দেশে এক নয় তেমনি প্রতিবাদ - লড়াই বা এর সফলতাও সব দেশে সমান নয়।  তার উদাহরণ, নারী অধিকারে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার ব্যবধান।  


দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশ বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। অনেক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস জড়িয়ে আছে এই দুই দেশের মধ্যে।  বর্তমানে এই দুই দেশে  নারী অধিকার পরিস্থিতি ঠিক কেমন? 
এ দুই দেশে নারী অধিকার পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র ফুটে উঠেছে আন্তর্জাতিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর পলিটিক্যাল অ্যান্ড ফরেন অ্যাফেয়ার্সের (সিপিএফএ) প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ফাবিয়ঁ বোসার্তের একটি কলামে। সম্প্রতি ইউরোপভিত্তিক মতামত বিষয়ক প্ল্যাটফর্ম মডার্ন ডিপ্লোম্যাসিতে প্রকাশ হয়েছে তার লেখাটি। 


ফরাসি এ বিশ্লেষক তার কলামে পাকিস্তানে নারী অধিকার বিষয়ক বিভিন্ন দিক তুলে ধরে লিখেছেন , পাকিস্তানে বহু বছর ধরেই নারীরা বৈষম্যের শিকার। অর্থনৈতিক, সামাজিক, নাগরিক, রাজনৈতিক- এমন কোনও ক্ষেত্র নেই যেখানে অবহেলিত নন দেশটির নারীরা। নিজের পছন্দে বিয়ে করা বা বাইরে কাজে বের হওয়ার মতো বিষয় গুলোতে প্রতিনিয়ত বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। 


এ বৈষম্যের আওতামুক্ত নন পাকিস্তানের নারী গণমাধ্যমকর্মীরাও। বরঞ্চ নারী সাংবাদিকদের পোহাতে হচ্ছে আরো বেশি কাঠখড়।  গত আগস্টে একদল নারী সাংবাদিক দেশটির সরকার-সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যৌথ বিবৃতি দেন। তাদের অভিযোগ, পাকিস্তানে নারী সাংবাদিক ও ভাষ্যকারদের লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভয়ংকর আক্রমণ চালানো হচ্ছে, যা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন কঠিন করে তুলেছে।

 

পাকিস্তানের আইন অনুসারেও নারীদের মৌলিক অধিকার হরণ হচ্ছে।  ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৭ সালের সেই সময়টিতে একাধিক দমনমূলক আইন পাস হয়, যাতে সরকারি-বেসরকারি খাতে নারীদের প্রতি বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে ওঠে।পাকিস্তানে নারীদের বর্তমান আইনি অবস্থান রূপায়িত হয়েছিল মূলত জিয়া-উল-হকের সামরিক শাসনামলে। 


হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, পাকিস্তানে প্রতিবছর অন্তত এক হাজার অনার কিলিংয়ের ঘটনা ঘটে। তবে এই হিসেবে বাইরেও রয়েছে অনেক সংখ্যা।   বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ খবর প্রকাশ্যেই আসেনা।   ২০১৬ সালে দেশটিতে একটি বিলের মাধ্যমে অনার কিলিংয়ের সাজা যাবজ্জীবন করা হয়। কিন্তু এ আইনে খুব একটা লাভ হয় নি। 


এছাড়াও পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সাথে বৈষম্যের ঘটনা আরো বেশি গুরুতর।  মুভমেন্ট ফর সলিডারিটি অ্যান্ড পিস ইন পাকিস্তান নামে একটি সংগঠনের হিসাবে, দেশটিতে প্রতিবছর হিন্দু ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অন্তত এক হাজার মেয়েকে জোরপূর্বক মুসলিম পুরুষের সঙ্গে বিয়ে করানো হয়।

 

পাকিস্তানের নারীরা সমাজে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানাতে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে পদযাত্রায় সামিল হন তারা, কখনো আয়োজন করেন সচেতনতামূলক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। তবে লজ্জার বিষয়, প্রায় প্রতি বছরই নারীদের এই পদযাত্রায় ইট-পাথর, জুতা, লাঠিসোটা নিক্ষেপ করে পাকিস্তানের মৌলবাদীরা।


অন্যদিকে, বাংলাদেশের নারী অধিকার বিষয় নিয়ে তিনি লিখেছেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ নারীদের জীবনমান উন্নয়নে অসাধারণ উন্নতি করেছে। মাতৃ মৃত্যুহার কমছে, জন্মহার নিম্নমুখী, স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও চমৎকার লিঙ্গভিত্তিক ভারসাম্য দেখা যায়। 

 

নারীদের প্রতি সহিংসতা ও বাল্যবিয়ের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। দেশটির বৃহত্তম রফতানি কারক শিল্প তৈরি পোশাক খাতে ৩০ লক্ষাধিক নারী কাজ করছেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাতেও তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।


বাংলাদেশে নারী অধিকার বিষয়ক বিভিন্ন সংস্থা ও সমাজকর্মীরা নানা ধরনের সামাজিক কর্মসূচি আয়োজন করে এবং মৌলবাদের বিরুদ্ধে সরব হয়ে তাদের উপস্থিতির জানান দিচ্ছেন। সন্দেহাতীতভাবে, বাংলাদেশে নারীবাদী আন্দোলন কর্মীরা লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে সুবিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করেছেন। পরিবর্তনের এই দাবি বাংলাদেশের রাজনীতির চেহারাও পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।

 

পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ১৯৪৭ সাল থেকে এদেশের নারীরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একজন নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও নারীদের অংশগ্রহণ ছিল প্রশংসনীয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের যে নতুন সংবিধান হয়েছে, সেখানে সব ক্ষেত্রেই নারীদের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে।


 ২০১১ সালের জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিতে নারী-পুরুষ সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা দেয়ার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। এসব উন্নয়ন নীতি ঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা তদারকিতে ৫০ সদস্যের জাতীয় নারী ও শিশু উন্নয়ন কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 


বাংলাদেশের সমাজ আজ রাজনৈতিক ও নাগরিক কার্যক্রমগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ সমর্থন করে। নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীদের নেতা সুলভ ভূমিকাও ক্রমেই বাড়ছে। মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন কমিটিতে শত শত নারী রয়েছেন। গত এক দশক ধরে বাংলাদেশের সংসদে নারীদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।


দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নারী উদ্যোক্তাদের গুরুত্ব অনুধাবন করে বাংলাদেশ সরকার ঋণ কার্যক্রমের পরিধি বাড়িয়েছে।  বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতে উচ্চশিক্ষিত নারীদের সংখ্যা বাড়ছে। ২০১০ সালে পারিবারিক সহিংসতা আইন পাস করে বাংলাদেশ। এরপর থেকেই সেখানে নারীদের প্রতি সহিংসতার হার দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গেছে। 

 

এই ফরাসি বিশ্লেষকের তুলে ধরা প্রতিটি দিকে বিশ্লেষণে দেখা যায় বাংলাদেশ নারী অধিকারের দিক থেকে পাকিস্তানের কয়েকগুণ উপরে অবস্থান করছে। এবং দিন দিন নারীরা আরোহণ করছেন সফলতার উচ্চশিখরে।  পক্ষান্তরে পাকিস্তানের অবস্থা এক্ষেত্রে অনেকটাই করুণ।