সংসার তুমি কার? 

সংসার তুমি কার? 
সংসার তুমি কার? 
ধরুন কোন কারণে একদিন সে ঘর ভেঙে গেলো। নিয়ম মতে মেয়েটিকেই সংসার ছাড়তে হল।  তবে পয়সা, শ্রম কোনটিই সংসারে দিতে এতটুকু কার্পণ্য কিন্তু ছিল না মেয়েটার । কোনটি নিজের জন্য তুলেও রাখেননি।  তাও সংসার তার নিজের হল না। তবে সংসারটা কার? 

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই মনে কেড়ে নিলো হলুদ রঙের দেয়ালটা।  কতদিন ধরে স্বপ্ন ছিল সংসারের বাকিসব জিনিসের সাথে একটা প্রিয় হলদে রঙে দেয়াল থাকবে। যেখানে  সংসারের নানা স্মৃতি আঁকা থাকবে। তবে পুরো ঘরটাই বেশ অগোছালো।  সাজাতে হবে।
নতুন ফার্নিচার, জানালার পর্দা, কয়েকটা নতুন বেড কাভার, কাঁচের আসবাব, দেয়ালের ফ্রেম বন্দী স্মৃতিগুলো সাজিয়ে রাখা, একটু একটু করে খতিয়ে সবথেকে সেরা জিনিস গুলো দিয়েই ঘরটা সেজে উঠলো,  ঘর হয়ে উঠলো সংসার। বউটাই একা হাতে সব করে নিলো। কর্তা বাবুর তো নটা-পাঁচটা অফিস আছে। তার সময় কোথায় সংসারে দেওয়ার মতন। তবে দেয়ালে দেয়ালে ভালোবাসার ছোঁয়া সেও পেয়েছে। অফিস থেকে ফিরে সাজানো ঘরটায় শরীর এলিয়ে শান্তি পেয়েছে। 

 


তবে হ্যাঁ,  এই সংসার টা সাজিয়ে তুলতে গিয়ে যা আর্থিক সাপোর্ট দরকার সবটা কর্তা বাবুরই দেওয়া। কারণ আমাদের সমাজে বেশির ভাগ নারীই এখনো গৃহিণী।  আর সব গৃহিণীদের সংসারের চিত্রগুলো অনেকটা এরকমই হয়। নিজের মন প্রাণ  সব উজাড় করে এরা সংসার গড়ে তোলে। তারপর একদিন ধরুন কর্তা বাবুর সাথে ভীষণ ঝগড়া। কিংবা কোন কারণে কর্তা বাবু ভীষণ অসন্তুষ্ট। ঝগড়ার এক পর্যায়ে কর্তা বাবু বলেই বসলো আমার সংসারে এসব চলবে না, কিংবা আমার সংসার থেকে বেরিয়ে যাও। ভাবুন তো সেই মুহূর্তটা কেমন হয় ঐ গৃহিণীর কাছে, যে কিনা নিজের সমস্ত কিছু দিয়ে সংসার টা সাজিয়ে তুললেন।  কর্তা বাবু তো প্রয়োজনীয় পয়সাটাই দিলো মাত্র।  তবে সেটা নেহাত কম কিছু নয়। কিন্তু যে মেয়েটা নিজের আবেগ, অনুভূতি, যত্ন, ভালোবাসা দিয়ে সংসারটা গড়ে তুলল, সে সংসার দিনশেষে তার নয়? অথচ এই গৃহিণী মেয়েটিও সুযোগ কিংবা ইচ্ছাশক্তিতে পারতো বাইরের দুনিয়ায় দাপিয়ে বেড়াতে। তা না করে সংসারকে আপন করে নিলো। কিন্তু সংসার তার হল না। তবে সংসারটা কার? 

 


এরপর আসুন কর্মজীবী নারীদের হিসেবে। যারা সমান তালে পুরুষের সাথে কাজ করছেন বাইরেও। অফিস শেষে বাসায় ফিরে সাংসারিক কাজগুলোও আপন ভেবেই করেছেন রোজ। ঘরে বাইরে দু জায়গাতেই সমান কন্ট্রিবিউশান। অর্থাৎ এরা কর্তা বাবুদের সাথে সাথে অর্থের যোগান দিচ্ছে আবার সংসার সাজাতে শ্রম, আবেগ, ভালোবাসা সবটাই দিচ্ছে।  তারপরও ধরুন কোন কারণে একদিন সে ঘর ভেঙে গেলো। নিয়ম মতে মেয়েটিকেই সংসার ছাড়তে হল।  তবে পয়সা, শ্রম কোনটিই সংসারে দিতে এতটুকু কার্পণ্য কিন্তু ছিল না মেয়েটার । কোনটি নিজের জন্য তুলেও রাখেননি।  তাও সংসার তার নিজের হল না। তবে সংসারটা কার? 

 


তারপর নিজেদের ঘরের দিকেই না হয় তাকাই। আমাদের ৪০/৫০ বছর বয়সী মায়েদের ক্ষেত্রে এই চিত্রটা কেমন? যারা সংসার ছাড়েননি, বা ছেড়ে যেতে হয়নি। ছাড়তে হয়নি মানে কি এই,  যে তাদের জন্য সংসারটা তাদের বলেই স্বীকৃত? মোটেই না। বরং তাদের ডিকশনারি ঘাটলে মেনে নেওয়া, মানিয়ে নেওয়া, মায়ায় পড়ে থেকে যাওয়া এসব শব্দই পাওয়া যাবে। মনে করে দেখুন তো আপনার নিজের ঘরেই প্রায় বৃদ্ধ মাকে বছরের পর বছর কতবার বাবার কাছে শুনতে হয়েছে, আমার সংসারে এসব চলবে না, আমার সংসারে থাকতে হলে এটা মানতে হবে ওটা মানতে হবে। কি হিসেব শেষ হচ্ছে না? 

 


রক্ষণশীল এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে রোজই কোন না কোন নারীকে এমন ধারার কথা হজম করতেই হয়। কেউ সংসার, সন্তানের মায়ায় হজম করে নেয়, কেউ অসহায়ত্ব ঢাকতে হজম করে নেয়, কেউ চলে গেলে সংসার ভেসে যাবে এমন চিন্তা থেকে তথাকথিত পরের সংসারটাকে আপন করে নিতে হজম করে নেয়। আর যারা এসব পিছুটান ছেড়ে দেওয়ার সাহসিকতা দেখায় তারা সমাজে নানান মন্তব্যে ক্ষত বিক্ষত হলেও নিজের সম্মান রক্ষা করতে চলেই যায়। হ্যাঁ, আসল কথা হল সম্মান।  

 


এসব নারীরা কিন্তু কাগজে দলিলে সংসারের সমান মালিকানা চায় না, সমান অধিকার চায় না। বরং এরা সম্মানটাই সমান চায়। মাস শেষে হিসেবের আলাদা খাতার বদলে এরা একটা হিসেবের খাতা চায়। যেখানে আমার, তোমার বলে কিছু নয়, সবটা একসাথে আমাদের হবে। আমি বলছি না সব ঘরের চিত্র একই, প্রতিটা ঘরেই নারী অসম্মানিত।  তবে আমি বেশিরভাগ ঘরের কথা বলছি।  আর এই বেশিরভাগ নারীই আহাজারি করতে থাকে মনে মনে এই সংসারটা আমার কিংবা তোমার না হয়ে আমাদের হোক। যেখানে সম্মানটা এতটাই নিখুঁত আর সমান হোক যে, কেউ একজন আমার সংসার, তোমার সংসার বলে ভাগ না করতে পারে। তাই এই প্রগতিশীল সমাজের এতটা পথ পেরিয়ে এসে এবার অন্তত সংসারটা  আমাদের হোক। আমাদের হওয়ার মানসিকতা তৈরি হোক।  আর হিসেবের খাতায় কতটা কার না হয়ে সবটাই আমাদেরই হোক।