রং নয় নারীর পরিচয় আত্মবিশ্বাসে

রং নয় নারীর পরিচয় আত্মবিশ্বাসে
রং নয় নারীর পরিচয় আত্মবিশ্বাসে
বিয়ের বাজারে পাত্রের প্রথম ডিমান্ড থাকে মেয়ে ফর্সা হতে হবে। থাকতে হবে অর্থবিত্ত। অথচ, বহু ফর্সা মেয়ে অত শিক্ষিত না হয়েও বিয়ের বাজারে ফার্স্টচয়েজ। কিন্তু কখনো না কখনো শ্বশুরবাড়িতে লাঞ্ছনার শিকার ঠিকই হতে হয়। তারা আস্থা অবলম্বন করে চলতে পারেন না। অপরদিকে, গুণে গুণান্বিতা শ্যাম বর্ণের মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ কাজ করে কম, বাবার টাকাপয়সা থাকলে অবশ্য ব্যতিক্রম ঘটে! এর হেরফের হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অর্বাচীন থাকে পাত্রের কাছে। আধুনিক যুগে যদিও কমেছে এসব বিভেদ, তারপরেও একেবারেই উপড়ে ফেলা যায়নি সমাজ থেকে।

: তোমাকে খুব সুন্দরী দেখাচ্ছে। 
-মোটেই না। আমি সুন্দর নই। 
: সুন্দর বলতে কি খালি ফর্সা বোঝায়?
-হ্যাঁ। সুন্দর বলতে আমরা তাই বুঝি। আমাকে আর কক্ষনো সুন্দরী বলবা না!
জনৈক প্রেমিক-প্রেমিকার কথোপকথনের কিয়দংশ তুলে ধরলাম। একদম কাল্পনিক তা নয়। আমার আপনার প্রাণেশ্বরী দুধে-আলতা গায়ের বলে এসবের সম্মুখীন হতে হচ্ছে না। কিন্তু যার প্রেমিকা কালো, তাকে রোজ এসবের মুখোমুখি হতে হয়। অসম্ভব রকমের সুন্দর লাগলেও বলতে পারে না মুখ ফুটে। এতে মেয়ের দোষ দেওয়া অমূলক। কেননা জন্ম থেকেই কালো মেয়েরা দেখে আসছে, সুন্দর মানে ফর্সা। আমাদের সমাজও ওভাবেই বিভাজন করে আসছে যুগ যুগ ধরে। সুন্দরীদের রূপবতী, কালোদের মায়াবতী বলে কালজয়ী লেখক হুমায়ুন আহমেদও তাঁর বইগুলিতে উল্লেখ করেছেন। লেখকেরা সমাজের কথা তুলে ধরেন। তিনিও সেটি করেছেন। আসলেই গায়ের রং সবকিছু? এয়ারটেলের শুরুর দিককার একটা বাংলা নাটকের কথা মনে পড়ল। ‘ওল্ড ভার্সেস নিউ’! পুরান ঢাকা আর নতুন ঢাকার দুটো পরিবার একই বাড়িতে থাকে। নায়ক নাঈম নায়িকা ভাবনার প্রেমে পড়ে। বলা ভালো, ভাবনার সৌন্দর্যের প্রেমে মশগুল হয়। যেমন ফর্সা, তেমন চেহারা, দেখলে যে কেউ ক্রাশ খাবে। তো নায়ক বাবাজি এক বিকেলে ছাদে হাওয়া খেতে খেতে নায়িকাকে বলেন, ‘আপনাকে কিছু বলতে চাই।’ কিছুক্ষণ নাঈমের দিকে তাকিয়ে ভাবনা যখনÑ ‘কি কইবেন কন। কন না। কইয়ালান’ বলে, তখন নায়ক অজ্ঞান হয়ে পড়ে! ভাবনার চেহারা যতখানি চমৎকার ছিল, তার কথা বলার ভঙ্গি ততখানিই ভয়ানক ঠেকেছে নাঈমের কাছে!


সুন্দর মানেই আমড়া কাঠের ঢেঁকি আর কালো মানে ঢেঁকিছাটা চাউল, তেমনটাও নয়। তবে প্রচলিত আছে, কালোরা জগতের আলো। সৌন্দর্য জিনিসটা ঐশ্বরিক। বিধাতা নিজের আপন খেয়ালেই আমাদের সৃষ্টি করেছেন। সেটি খ-ানোর কোনো ক্ষমতা কারোর নেই। তবু কিছু কিছু মেয়েরা নিজেদের কৃষ্ণবর্ণে খুশি নয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক হিসেবে দেখা গেছে, আফ্রিকাতে প্রতি ১০জন নারীর চারজন রং ফর্সাকারী পণ্য ব্যবহার করে থাকেন। নাইজেরিয়াতে এই পণ্যের ব্যবহার সব থেকে বেশি। সেখানে ৭৭% নারী ত্বকের রং উজ্জ্বল করার জন্যে নানাধরনের প্রসাধনী ব্যবহার করেন। এরপরেই রয়েছে টোগো, ৫৯% এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ৩৫%। এশিয়ায় ৬১% ভারতীয় নারী এবং চীনে ৪০% নারী এসব ব্যবহার করেন। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই রং ফর্সা করার পণ্যের বিজ্ঞাপন ভালোভাবেই চোখে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব জিনিসের প্রতি নারীদের চাহিদাও বেড়েছে। এই সকল পণ্য কেনাকাটা বন্ধ করা বেশ কঠিন। রং ফর্সা কারি ট্যাবলেটে পাওয়া গেছে এন্টিঅক্সিডেন্ট গ্লুটাথিওন। যা গর্ভবতী নারীদের সেবন করা উচিত নয়। অথচ গর্ভবতী নারীরা মনে করেন তারা যদি এই ট্যাবলেট খান তাহলে তাদের গর্ভে থাকা সন্তানের গায়ের রং ফর্সা হবে। ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল।


বিয়ের বাজারে পাত্রের প্রথম ডিমান্ড থাকে মেয়ে ফর্সা হতে হবে। থাকতে হবে অর্থবিত্ত। অথচ, বহু ফর্সা মেয়ে অত শিক্ষিত না হয়েও বিয়ের বাজারে ফার্স্টচয়েজ। কিন্তু কখনো না কখনো শ্বশুরবাড়িতে লাঞ্ছনার শিকার ঠিকই হতে হয়। তারা আস্থা অবলম্বন করে চলতে পারেন না। অপরদিকে, গুণে গুণান্বিতা শ্যাম বর্ণের মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ কাজ করে কম, বাবার টাকাপয়সা থাকলে অবশ্য ব্যতিক্রম ঘটে! এর হেরফের হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অর্বাচীন থাকে পাত্রের কাছে। আধুনিক যুগে যদিও কমেছে এসব বিভেদ, তারপরেও একেবারেই উপড়ে ফেলা যায়নি সমাজ থেকে।


সুন্দরীরা কিছুই পারেন না, তা নয়, লেখায় সেসবও বলা হয়নি। বলা হচ্ছে, শ্যামসুন্দরীরা কী পারেন, তা নিয়ে। আমার চেনা একজন আছেন, গায়ের রং তথৈবচ। ¯্রষ্টাপ্রদত্ত রং নিয়ে ন্যূনতম আফসোস নেই। থাকবে কেন? সুন্দর নয় বলে কেউ যদি তাকে এড়িয়ে চলে তবে তিনি চমৎকার একজন মেয়ের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হারাবেন। সে নাচ, গান, আবৃত্তিতে সমান পারঙ্গম। স্কাউট করে, ফ্রিল্যান্সিং, ফার্ম হাউজে জব করে। সে সাবলম্বী, আত্মবিশ্বাসী। কারো উপর নির্ভরশীল নয়। ছেলেপক্ষ দেখতে এসে রিজেক্ট করে দেবে সেই ভয় তার নেই। বিয়েশাদি নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তার রেখা তার কপালে ফুটে ওঠে না। তার কথা হলো, ফর্সাদের পেতে একদল যেমন উন্মুখ, তেমনি রূপ দেখে নয় বরঞ্চ গুণ দেখে জীবনসঙ্গিনী বেছে নেওয়া একদলও আছে সমাজে। তাদেরই কেউ একদিন খুঁজে নেবে তাকে! 


 ¯্রফে সে নয়, এমন ভাবনায় দিন কাটছে অসংখ্যা কালো মেয়ের। হূমায়ুন আহমেদের ভাষায় মায়াবতী, তবে আমি তাদের কালোবতী বলব। তারা কালো, তারা কৃষ্ণকলি। এটাই তাদের সবচাইতে বড় গুণ, হাতিয়ার। ‘কালো আর ধলো বাহিরে কেবল, ভেতরে সবারই সমান রাঙা’। আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে এই সমাজ কালো মেয়েদের আপন আলোয় আলোকিত হবে, ঘুচে যাবে বিভেদের অন্ধকার। একবিংশ শতাব্দীর বাংলায় দাঁড়িয়ে কৃষ্ণকলিদের আত্মবিশ্বাস নিজেদের মধ্যে সঞ্চারিত করে এগিয়ে যাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।