শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭
হোম / বিনোদন / তারকাদের ভাবনায় নারী দিবস
০৩/০৬/২০১৭

তারকাদের ভাবনায় নারী দিবস

-

প্রতি বছর সারা পৃথিবী জুড়ে ৮ই মার্চ উদযাপন করা হয় "আন্তর্জাতিক নারী দিবস" হিসেবে। এই দিনটিকে বিশ্বের প্রতিটি নারীর জন্য একটি বিশেষ দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে শুধু এই একটি দিনই কি নারীর জন্য? বছরের আর ৩৬৪ দিন কি নারীর জন্য নয়?

সর্বপ্রথম ১৯১৪ সালে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ই মার্চ পালিত হয় "নারী দিবস" হিসেবে। বাংলাদেশেও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পূর্ব থেকেই এই দিবসটি পালিত হতে শুরু করে। অতঃপর ১৯৭৫ সালে ৮ই মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।

দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি নারীর অধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করার অভীপ্সা নিয়ে। মূলত সমান মজুরী, কাজের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা ইত্যাদি অধিকার আদায়ই ছিলো এই দিবসের উদ্দেশ্য। তবে যুগের সঙ্গে বদলেছে নারী দিবসের উদ্দেশ্য এবং অন্যান্য দাবী। কালের বিবর্তনে সমঅধিকার এবং নারী স্বাধীনতার বিষয়গুলোও উঠে এসেছে এই দিনের আলোচ্য বিষয়ের তালিকায়।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কয়েকজন শিল্পী ও তারকাদের কাছে এই দিনটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তারা জানান তাদের মতামত।

মেহরীন মাহমুদ
বাংলাদেশে পপ তারকা হিসেবে নিজের স্থান তৈরি করে নিয়েছেন এই সংগীত শিল্পী। নারী দিবস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সমাজের কিছু অসঙ্গতির বিষয় তুলে ধরেন তিনি। তিনি জানান কর্মক্ষেত্রে কখনই মেয়ে হিসেবে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি তাকে যা অনেক মেয়ের ক্ষেত্রেই বেশ গুরুতর একটি ইস্যু, বরং কর্মক্ষেত্রে পুরুষ সহকর্মীদের সহযোগীতায়ই তিনি পেয়েছেন। কিন্তু তিনি নারীর প্রতি এই আধুনিক যুগেও সমাজের মনোভাব এবং আইনের অসহযোগীতার বিষয় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, “নারী অধিকার নিয়ে এই একটি দিনই কি আমরা চিন্তা করবো? বছরের এই একটি দিন শুধু নারীদের সম্মান জানানো হবে, আর বাকি দিনগুলো তারা কোনো ধরনের সহযোগীতা পাবে না তাহলে তো এই দিন পালনের কোনো মাহাত্ব্য আসলে নেই।”

“আমার বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের দুই বোনকে প্রতিদিনই কোর্টে যেতে হচ্ছে বাবার সম্পত্তিতে নিজেদের অধিকার টিকিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু আইন থাকার পরও আমরা তেমন কোনো সহযোগীতাই পাচ্ছি না। আমি মেয়ে বলে অনেক ক্ষেত্রেই আইনি লড়াইয়ে পিছিয়ে পরতে হচ্ছে আমাকে। আমার বাবার দুইটি মেয়ে বলে বাবার সম্পত্তির উপর অধিকার এখন আমার চাচাতো ভাইদের। তাই আমি মনে করি এখনও নারী অধিকার সেইভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি আমাদের সমাজে। আরও অনেক দূর যেতে হবে আমাদের, অনেকটা কষ্ট করা এখনও বাকি আছে।”

তবে তিনি মনে করেন অনেক ক্ষেত্রেই এখন ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। অনেকটাই এগিয়ে গেছে বর্তমানের নারীরা। তবে কিছু ক্ষেত্রে এখনও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি। তাই এই একটি দিন নয় প্রতিটি দিনই নারীদের সম্মান জানাতে হবে। তাছাড়া তিনি বলেন, "সমঅধিকারের কথাই যদি বলি তাহলে তো একটি "নর দিবস" ধার্য করাও প্রয়োজন।"

তমালিকা কর্মকার
টিভির পর্দা থেকে দূরে সরে গেলেও এখনও থিয়েটার বা মঞ্চে কাজ করে যাচ্ছেন এই অভিনেত্রী। তিনি বলেন, “যেকোনো দিবস নিয়ে আমার মতামত কিছুটা ভিন্ন। এই যে আলাদা করে মা দিবস, বাবা দিবস, ভালোবাসা দিবস রয়েছে আমি এই দিনগুলো আলাদাভাবে দেখি না। যাকে ভালোবাসবো তাকে আমি সারা বছরই ভালোবাসবো। তেমনি একজন নারী হিসেবে আলাদাভাবে এই দিন আমার কাছে অতটা মূল্যবান নয়। তবে সারা বিশ্ব এই দিনটিতে নারীদের অধিকার ও স্বাধীনতা বিষয়গুলো তুলে ধরে এই ধারণাটি আমার বেশ ভালো লাগে।”

তিনি মনে করেন নারী স্বাধীনতা এখন আগের থেকে অনেকটাই বেশি। এখন নারীরা অনেক ধরনের কাজ করছে এবং অনেক এগিয়ে গিয়েছেন। তবে এখনও অনেক কিছুই নারীদের জন্য তেমন নিরাপদ নয়। যেমন মা-বাবা এখনও রাতে বাড়ির বাইরে থাকার ব্যাপারে কঠিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, যদিও তা ছেলেদের ক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। তাই তার মতে কিছু ক্ষেত্রে কখনওই ছেলেমেয়ে সমান হতে পারে না।

তমালিকা বলেন, “আমি কাউকেই ছোট করে দেখি না। ছেলেরা কিছু কাজ পারে যেটা কখনওই মেয়েদের করার কথা নয়। কিছু বিষয় মেয়েদের জন্য নিরাপদও নয়। তেমনি মেয়েদের কিছু ক্ষমতা আছে যা ছেলেরা করতে পারবেন না। যেমন আমরা মেয়েরা একটি নতুন প্রাণকে পৃথিবীতে নিয়ে আসতে পারি যা ছেলেরা কখনওই পারবে না। তাই ছেলে মেয়ে সবাই নিজ নিজ স্থানে "স্পেশাল"।

মেহজাবিন চৌধুরী
২০০৯ সালে "লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার" খেতাব জয়ী এই অভিনেত্রী মিডিয়াতে পা রাখেন। সেই থেকে এই সময়ের মাঝে নিজের জন্য স্থান তৈরি করে নিয়েছেন এই অভিনেত্রী। নারী দিবস সম্পর্কে তিনি মনে করেন এই দিনটিতে পৃথিবীর সকলেরই উচিত তাদের জীবনে থাকা নারীদের ত্যাগ এবং অবদানের কথা মনে করা।

মেহজাবিন বলেন, “প্রতিটি মানুষের জীবনের এক বা একাধিক নারী থাকেন। তা তার মা হতে পারে, তার স্ত্রী হতে পারে অথবা বোন। আর প্রতিটি নারী তার সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষগুলোর জন্য কোনো না কোনো দিক দিয়ে কিছু না কিছু ত্যাগ স্বীকার করেন নেন। প্রতিটি মানুষের জীবনে একজন নারীর বিশেষ অবদান থাকে। আর এই একটি দিনে সবাই সেই বিষয়গুলো মনে করতে পারে। আর এর পর আসে নারী স্বাধীনতা এবং সমঅধিকারের বিষয়। কারণ এই আধুনিক যুগে নারীরাও পুরুষদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করে যাচ্ছে। তবে আমি মনে করি একদিন নয় প্রতিদিনই আমাদের উচিত নারী এবং পুরুষ সবার প্রতি সম্মান ধরে রাখা।”

টিভি এবং চলচ্চিত্রেও নারীদের অবদান তুলে ধরেন এই অভিনেত্রী। একটা সময় ছিলো যখন সব গল্পই হতো নায়ক কেন্দ্রিক। এই ধারায়ও পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করেন তিনি। মেহজাবিন বলেন, “একটা সময় ছিলো যখন প্রতিটি নাটক বা সিনেমার গল্প আবর্তিত হতো নায়ককে কেন্দ্র করে। কিন্তু এখন নারী চরিত্রকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেও সিনেমা এবং নাটক নির্মিত হচ্ছে। আমি নিজেও এমন কিছু কাজ করেছি। অর্থাৎ এখন পুরুষ কেন্দ্রিক মনোভাব থেকে কিছুটা হলেও সরে আসতে পারছি আমরা।”

শুরুতে "নারী দিবস" এই দিনটির মূল লক্ষ্য ছিলো সমমজুরী এবং কার্যপরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু যুগের পরিবর্তনে এই দাবীতেও এসেছে পরিবর্তন। তবে দিনটির উদ্দেশ্য যাই হোক, তারকা অভিনেত্রী সকলের বক্তব্যেই উঠে এসেছে যে তারা এক দিন নয় বরং পুরো বছর জুরেই নারীর প্রতি সম্মান প্রত্যাশা করেন।

- আফরিন