রবিবার,২০ অগাস্ট ২০১৭
হোম / বিবিধ / ফুটপাতের বই নাকি বইয়ের ফুটপাত?
০৩/০২/২০১৭

ফুটপাতের বই নাকি বইয়ের ফুটপাত?

-

ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ফুটপাতে পুরনো বইয়ের ছোটোখাটো দোকানের চল বহু বছর ধরে আমাদের নগর সভ্যতার অংশ হিসেবে চলে এসেছে। কিন্তু কোথা থেকে এল এসব দোকান? কীভাবে এই বিপুল সংখ্যক বই সংগ্রহ করা হয় অথবা কারাইবা টিকিয়ে রেখেছে এই ব্যবসা?

ফুটপাতে বইয়ের দোকান

ঢাকা মহানগরীতে বই কেনার জন্য সবচেয়ে বড়ো ও জমজমাট বাজার হলো নীলক্ষেত এলাকা। দুর্লভ ও পুরানো বই কেনার জন্য নীলক্ষেতের বিকল্প নেই। আশপাশে বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ এবং ইডেন কলেজসহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকায় শহরের বৃহত্তম বইয়ের বাজারের মুকুট বহু বছর ধরে নীলক্ষেতেরই দখলে। ইতিহাসে চোখ বুলালে জানা যায় মূলত ১৯৬৬ সালেই প্রথম নীলক্ষেতে বই বিক্রি শুরু হয়। প্রথমে শুধুমাত্র পাঠ্যবই দিয়ে বিক্রি শুরু হলেও ধীরে ধীরে বড়ো পরিসরে অন্যান্য বই বিক্রিও শুরু হয়।

১৯৭৪ সালের দিকে এই এলাকায় সব বস্তি ভেঙে গড়ে ওঠে বাকুশাহ ও গাউছুল আযম মার্কেট আর এর পুরোটা জুড়েই লেখাপড়ার সামগ্রী, বই, খাতা-কলমের দোকান দেয়া হয়। সময়ের পরিক্রমায় এই এলাকা বইয়ের বাজার হিসেবে এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, একটা সময় মার্কেটের জায়গা ছাড়িয়ে ফুটপাতেও বইয়ের দোকানের চল শুরু হয়। এখন কিছুটা নিয়ন্ত্রিতভাবে হলেও নীলক্ষেতের ফুটপাতের অনেকাংশ জুড়েই রয়েছে পুরানো বইয়ের দোকান। নতুন বইয়ের অর্ধেক বা তার চেয়ে কম দামে এখান থেকে ক্রেতা যেমন বই কিনতে পারেন তেমনি পুরানো বইও এখানে বিক্রি করতে পারেন।

বই কেনার জন্য বছরজুড়েই ব্যস্ত আরেকটি স্থান হলো বাংলাবাজার। সারাবছরই ঢাকা শহরের দক্ষিণের বইপ্রেমীদের আড্ডাখানা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে এই এলাকা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সোজা ডানের গলিতে পুরানো বইয়ের আস্তানা যেমন রয়েছে তেমনি বাংলাবাজারের সকল ফুটপাত ও মূল পয়েন্টের ওভারব্রিজের নিচে পুরানো বইয়ের বিশাল সংগ্রহ সবসময়ই লক্ষ্য করা আয়।

ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে বাংলা একাডেমির সামনে বা বইমেলার ফটকের বাইরে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বই-বিক্রেতাদের দেখা মেলে। অস্থায়ী হলেও এ-সময়টায় শাহবাগ থেকে শুরু করে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদসংলগ্ন ফুটপাত বইপোকাদের তীর্থস্থানে রূপ নেয়। এসব স্থান ছাড়াও বাবুবাজার, মিরপুর-১০, পল্টন মোড়সহ ঢাকা শহরের অসংখ্য ফুটপাতে অস্থায়ী বইয়ের দোকান দেখা যায়, যা চরম ব্যস্ত নগর জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ বলা চলে।

বই বাজারের সাম্প্রতিক অবস্থা

এবার জানা যাক, ঠিক কীভাবে এই বইগুলো বিভিন্ন হাত হয়ে ফুটপাতে আসে। সাধারণত কেজি দরে পুরনো বই সংগ্রহকারী ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে পিস হিসেবে বইগুলো কিনে নেয় ভাঙারি ব্যবসায়ীরা। এই বইগুলোই আবার মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছ থেকে কিনে নেন ফুটপাতের বই ব্যবসায়ীরা। অনেক সময় আবার পাঠক নিজেই পুরানো বই বিক্রি করতে সরাসরি ফুটপাতের পুরানো বই বিক্রেতাদের কাছে যান।

অনলাইন দুনিয়ায় ই-বুক এবং পিডিএফ ভার্সনের কারণে বই কিনে পড়ার অভ্যাস আগের চেয়ে অনেকাংশেই কমে আসছে। এর সঙ্গে পাইরেসি ও ফটোকপির দৌরাত্তে একবিংশ শতাব্দীতে এসে ফুটপাত কিংবা বই বাজারের ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে। তবে সত্যিকারের বইপ্রেমী মানুষদের কাছে এসব স্থানের আবেদন এখনো আগের মতোই রয়েছে। এই ব্যবসায় জড়িতদের অনেকেই পূর্বপুরুষদের ব্যবসাই টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে কয়েকজন বই ব্যবসায়ী মিলে গুদাম ভাড়া নিয়ে বই সংগ্রহে রাখতেও দেখা যায়।

প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে তরুণদের মধ্যে এখন কিনে বই পড়ার চেয়ে অনলাইনে পড়ার প্রবণতাই বেশি। তাই ফুটপাত কিংবা বই বাজারের মূল পাঠকদের মধ্যে বয়স্ক মানুষের সংখ্যাই বেশি, আর এভাবেই টিকে আছে ঢাকা শহরের বই বাজার।

- নাইব রিদোয়ান