বুধবার,২৩ অগাস্ট ২০১৭
হোম / ফিচার / আমার মা - সাদি মহম্মদ
০৩/০২/২০১৭

আমার মা - সাদি মহম্মদ

-

রবীন্দ্র সংগীত, হারানো দিনের গান সবই তাঁর কণ্ঠে দারুণ সজীব, প্রাণময় হয়ে ওঠে। গানই তাঁর জীবন। সাধনা আরাধনা, ব্রত। যেন শ্বাস - প্রশ্বাসের মতই গান মিশে আছে জীবনে। শান্তিনিকেতনের কৃতী ছাত্র। সংগীত বিষয়ে দীর্ঘ ৩৫ বছরের শিক্ষকতা জীবন শেষ করেও মেলেনি অবসর। এখনো শিক্ষকতায় ব্যাপৃত। মিষ্টভাষী, স্বল্পবাক মানুষটি সহজেই মানুষকে আপন করে নিতে পারেন। ১৯৫৪ সালের ৪ অক্টোবর ঢাকার পলাশীতে জন্মগ্রহণ করেন বরেণ্য রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও শিক্ষক সাদি মহম্মদ। ১০ ভাইবোনের বড় সংসার। একেবারে ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তীব্র আকর্ষণ জন্মায় তাঁর। বাড়িতে ছিল একটি মারফি রেডিও। ওটা থাকতো ছোট্ট সাদির দখলে। হেমন্ত, লতা, প্রতিমা, আব্বাসউদ্দীন, সোহরাব হোসেনসহ বহু শিল্পীর গান বাজতো রেডিওতে। নজরুল, রবীন্দ্র, আধুনিক, এমনকি সিনেমার গানও শুনতেন মগ্ন হয়ে। মেধাবী ছাত্র হলেও পড়ালেখার চেয়ে গানের প্রতিই সব টান ও ভালোবাসা ছিল সাদির।

১৯৭১ সাল লণ্ডভণ্ড করে দেয় সবকিছু। ২৬ মার্চ চোখের সামনে বর্বর পাকিস্তানীদের হাতে শহীদ হলেন বাবা, যাঁর নামে মোহাম্মদপুরের শহীদ সলিমউল্লাহ সড়কটি। বাংলাদেশ সরকার শহীদ সলিমউল্লাহর ছবি সংবলিত একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। পুড়িয়ে দেয়া হয় মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের বাড়িটিতে- সেখানে এখন বরেণ্য এই শিল্পীর বাস। একাত্তরে বাবা শহীদ হওয়ার পর মা ভাই-বোনদের নিয়ে আশ্রয় নেন চাঁদপুরে গ্রামের বাড়িতে। ভয়, আতঙ্ক, নিরাপত্তাহীনতায় বাস। বড় দুই ভাই চলে গেলেন মুক্তিযুদ্ধে। তরুণ সাদির ওপর গুরুদায়িত্ব অর্পিত হলো মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রশস্ত্র আগলে রাখার।

যুদ্ধের পর ঢাকায় ফিরে ভর্তি হলেন ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে। ভালো ফল করে ভর্তি হলেন বুয়েটে। কিন্তু প্রকৌশল বিদ্যা ভালো লাগলো না তাঁর। সারাক্ষণ মন পড়ে থাকে গানের দিকে। একসময় ছেড়েই দিলেন বুয়েটের পড়াশোনা। বসে থাকলেন বছর খানেক। তারপর ভারতের আইসিসিআর বৃত্তি নিয়ে ১৯৭৫ সালে পাড়ি জমালেন শান্তিনিকেতনে। বিশ্বভারতীতে বি, মিউজ এবং এম, মিউজ। ঘনিষ্ঠ স্নেহ-সান্নিধ্য পেলেন প্রণম্য শিল্পী ও শিক্ষক শৈলজারঞ্জন মজুমদার, শান্তিদেব ঘোষ, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ও নীলিমা সেনের।

দেশে ফিরে ১৯৮১ সালে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ঢাকা সরকারি সংগীত মহাবিদ্যালয়ে। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় শিক্ষকতার পর অবসর নেন ২০১৩ সালে। প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান।

১৯৮৫ সালে সংগীত ভবন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিজের দল ‘রবিরাগ প্রতিষ্ঠা’ করেন ১৯৮৭ সালে। একই বছর বের হলো তাঁর প্রথম দু’টি ক্যাসেট- একটি রবীন্দ্রসংগীতের আর একটি হারানো দিনের গানের। ১৯৮৯ সালে আরো দু’টি। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। পরবর্তীকালে কাজ করেছেন আরেক বরেণ্য শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার সঙ্গে। কাজ করেছেন বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী কামরুল হাসান মঞ্জুর সঙ্গেও। তাঁর প্রকাশিত সিডির সংখ্যা একক, দ্বৈত মিলিয়ে ৬৫। সবক্ষেত্রেই সংগীত পরিচালনা করেছেন শিল্পী নিজে। বিশ্বভারতীর ৬৬ খণ্ডের স্বরবিতান সম্পাদনা করে ১৮ খণ্ডের প্রকাশ (২০১৬) তাঁর বড় কাজ।

সংগীতশিল্পী ও শিক্ষক হিসেবে অনন্য অবদানের জন্য পেয়েছেন সরকারি-বেসরকারি নানা পুরস্কার ও সম্মাননা। এগুলোর মধ্যে সিটিসেল-চ্যানেল আই অ্যাওয়ার্ড (২০১২), ২০১৪ সালে আজীবন সম্মাননা, বাংলা একাডেমির রবীন্দ্র পুরস্কার, রবীন্দ্রগুণী সম্মাননা ২০১৭ অন্যতম।

সংগীত শিল্পীর চেয়েও নিজেকে একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ভাবতেই পছন্দ সাদি মহম্মদের। নিজের প্রতিষ্ঠিত সংগীত শিক্ষালয় রবিরাগ, ছাত্রছাত্রী আর প্রতি মুহূর্তে সংগীতভাবনা নিয়েই নিমগ্ন এই গুণী শিল্পী। রবিরাগ প্রসঙ্গে বললেন, ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বাড়াতে চাই না। পরিমাণের চেয়ে গুণগত উৎকর্ষ অর্জনই লক্ষ্য আমাদের। জনা কুড়ি সংগীত শিক্ষার্থী আছে রবিরাগের।

সাদি মহম্মদের মায়ের নাম জেবুন্নেসা সলিমউল্লাহ। ৬ ভাই ৪ বোনের মধ্যে সাদি ভাইদের মধ্যে তৃতীয় ও ভাই- বোনদের মধ্যে চতুর্থ। সাদির ছোট ভাই শিবলী মহম্মদ বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী, নৃত্যপরিচালক। সাদি মহম্মদ এখনো অকৃতদার। তাঁর সঙ্গে অনন্যার আলাপচারিতা এখানে-

প্রশ্ন: আপনার মায়ের ব্যক্তিত্ব আপনার জীবনে কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করেন?

উত্তর: মায়ের ব্যক্তিত্বের বিশেষ যে দিকটি আমাকে আকর্ষণ করে, সেটা হলো উনার মধ্যে স্বশিক্ষার একটা চমৎকার ব্যাপার আছে। পড়াশোনা করতে পেরেছেন মাত্র ক্লাস ফোর পর্যন্ত। দশটা ছেলেমেয়ে নিয়ে মাকে সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হতো। আমার বাবা জনাব সলিমউল্লাহ (একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে শহীদ) ছিলেন অত্যন্ত ধনবান ব্যক্তি। ব্যবসা নিয়ে উনি এত ব্যতিব্যস্ত থাকতেন যে আমরা কোন ভাইবোন কোন ক্লাসে পড়ছি, সে খবর পর্যন্ত রাখার ফুরসত পেতেন না।

মনে পড়ে, আমরা কেউ এক গ্লাস পানি পর্যন্ত গড়িয়ে খেতাম না। বাড়িতে কাজের লোকের সংখ্যা ছিল প্রচুর। কিন্তু মা রান্না করতেন নিজ হাতে। বাবার বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা ছিল অনেক। নিত্যদিন তাদের আপ্যায়নের অত্যাচার, ঝুটঝামেলা সামাল দিতে হতো মাকে। চারতলা বাড়ির পুরোটা জুড়েই আমরা থাকতাম। সে এক বিশাল একান্নবর্তী পরিবার। খালারা-মামারা সবাই থাকতেন আমাদের বাড়িতে। থেকে পড়াশোনা করতেন।

পড়াশোনায় বেশ ভালো ছিলাম আমি। ক্লাস এইটে আমার বৃত্তি পরীক্ষায় সিট পড়েছিল পুরনো ঢাকার কলেজিয়েট স্কুল। বাবাকে মা আপনি করে বলতেন। সেই কালে এমনই চল ছিল। পরীক্ষা চলাকালে মা একদিন বাবাকে বললেন, ছেলেটাকে তো একদিন অন্তত স্কুলে নিয়ে যেতে পারেন। দুই বেলা পরীক্ষা দেয়। মাঝখানে কী না কী খায়, কে জানে। শুনে বাবার মনটা বোধহয় নরম হলো একটু। বললেন, আচ্ছা ওকে আমি আজ দিয়ে আসব। তবে বসে থাকতে পারব না। তাতে ব্যবসার ক্ষতি হয়ে যাবে। তো, বাবা আমাকে নিয়ে গেলেন গাড়িতে করে। বললেন, মাথা ঠাণ্ডা করে পরীক্ষা দিয়ো (ছোটবেলায় আমি খুব ডানপিটে ধরনের ছিলাম) দুপুরবেলা বাবা গেলেন। আমার জন্যে শুকনো খাবার নিয়ে। বিকেলবেলা আবার আমাকে নিয়ে এলেন বাসায়। ব্যস, ওই একদিনই।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের রান্নার কথা বলুন। তাঁর করা কোন্ কোন্ রান্না আপনার বিশেষ পছন্দের, অনুগ্রহ করে বলবেন কি?

উত্তর: সবাই বলে যে তার মা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ রাঁধুনী। আমিও বলব সে কথা। আমার মায়ের রান্নার কোনো তুলনা নেই। আমি যে এক-আধটু রান্না করি (রাঁধুনী না, রাঁধুনে হয়েছি) সেটাও বোধকরি মায়ের প্রত্যক্ষ প্রভাবের কারণেই সম্ভব হয়েছে। হয়তো এই পরম্পরা প্রবেশ করেছে আমার ভেতরে। শান্তিনিকেতন থেকে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ফিরলাম দেশে। যোগ দিলাম সরকারি মিউজিক কলেজে, শিক্ষকতা পেশায়। সেই সময়ে রান্না করার দিকে আমার ঝোঁকটা বাড়লো। তখন তো এত টিভি চ্যানেল ছিল না। রান্নাবান্নার ভিডিও দেখার সুযোগ সুবিধা ছিল না। ফলে দেখে দেখে রান্না শেখার ব্যবস্থা ছিলই না বলতে গেলে।

প্রথম দিকে কন্টিনেন্টাল ফুড রান্না করার দিকে আমার আগ্রহটা ছিল বেশি। পালংশাকের স্যুপ বানালাম একদিন। বাসায় সবাই খেয়ে বলল, অসাধারণ হয়েছে। বৃদ্ধা মা একদিন আমাকে বললেন, বাবা রে আমি কাঁচকলার ঘ্যাঁট খাবো। কাঁচকলার সঙ্গে সর্ষে, কারিপাতার ফোড়ন দিয়ে বানালাম কাঁচকলার প্রিপারেশন। খেয়ে মা বললেন, এটা রেখে দে। আজ রাতেও আমি এটা দিয়েই খাবো। রাঁধুনে (রাঁধুনী নয়) হিসেবে স্বীকৃতি অবশ্য আমি তার আগেই পেয়ে গিয়েছিলাম বাড়ির সবার কাছে। সপ্তাহে ২/১ দিন নানান কিছু রাঁধি। নিয়মিত বাজার করি। ডাকাতের মতো সব কিনি। জানেন, তরতাজা শাকসবজি দেখলে মনে হয় কাঁচাই খেয়ে ফেলি।

আমার মায়ের রান্নায় হাত অসাধারণ- উনি সর্ষেবাটা দিয়ে চালকুমড়ার একটা ‘পুর’ বানান- একেবারে বাঙালি রান্না। আরো একটা প্রিপারেশনের কথা বলি। সেটা হলো করমচার সঙ্গে তিলবাটা দিয়ে। ভীষণ সুস্বাদু। জলপাই দিয়ে ঝোলমতো আরেকটা রান্না উনি করেন। ঠিক চাটনি না। খেতে খুবই ভালো। আমি যে রান্নাবান্নায় ঝুঁকলাম, সেই প্রেরণাটা পেয়েছি মায়ের কাছে। আমি ভাই তার সৌভাগ্যবান পুত্র, নিঃসন্দেহে।

প্রশ্ন: মাকে আপনি কখনো মিস করেন?

উত্তর: মা আমার সঙ্গেই আছেন। সবসময় তারপরও তাকে মিস করি। যেমন, এই মুহূর্তেও মিস করছি। এই যে আমি এখন ক্লাসে (৩ ফেব্রুয়ারি ’১৭ শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টা) বসে আছি, ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভ্যালেন্টাইনস ডে’র বিশেষ অনুষ্ঠানের গানের রিহার্সাল করছি- সে সময়েও মনে হচ্ছে মায়ের শরীরটা কাল রাতে ভালো ছিল না। ঠিকমতো ওষুধ খেলেন কিনা, রক্তচাপটা ঠিক আছে কিনা, সেই চিন্তা করছি।

মাকে ভীষণ মিস করতাম কোন সময় জানেন? শান্তিনিকেতনে পড়ার সময়। সবার অমতে আমি বুয়েটে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ছেড়েছুড়ে চলে গেলাম শান্তিনিকেতনে। সংগীত নিয়ে পড়াশোনা করবার জন্যে। বুয়েটে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তাম। সেই পড়া ছেড়ে দিয়ে বসে থাকলাম এক বছর। ভালো ছাত্র ছিলাম বটে, তবে পড়াশোনা ভালো লাগতো না মোটেই। প্রচণ্ড ঘাড় ত্যাড়া ছিলাম। মনে পড়ে, এয়ারপোর্টে মা আমাকে সি অফ করতে যাননি। মনটা ভীষণ খারাপ হয়েছিল তাতে।

শান্তিনিকেতনে তো গেলাম। ভিন্ন দেশ হলেও ভাষা এক। আচার, সংস্কৃতিও প্রায় একই রকম। শিক্ষকরা আমাকে প্রচণ্ড আদর স্নেহ করেন। কিন্তু তারপরও হাঁপিয়ে উঠতাম। বিশেষ করে রাতের বেলা মাকে খুব মনে পড়ত। ডায়নিং হলে করুণদশা হতো। জঘন্য ছিল নিরামিষ খাবার-দাবার। দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর ছিলাম শান্তিনিকেতনে। মাকে মিস করি, যখন তিনি সামনে আছেন, তখনও।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের কোন্ কোন্ গুণ আপনাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে?

উত্তর: মাকে কোনোদিনই প্রচণ্ড রাগতে দেখিনি। যত কষ্টই হোক, কারো সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন না কখনোই। এত চাপ, এত সঙ্কট, এত উৎকণ্ঠা- সবকিছু সামলেছেন শান্ত স্থৈর্যে, কখনোই বিরক্ত হননি। ভীষণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ উনি। ধীর স্থির। অসম্ভব আত্মসম্মানবোধ তাঁর। মিথ্যে কথা বলা পছন্দ করেন না একদমই। ছোটবেলায় এমনও দেখেছি যে, কেউ মিথ্যে বললে তার গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করেননি। পরচর্চাও মায়ের ভীষণ অপছন্দের ব্যাপার। ধরুন লুডু খেলতে বসে পরচর্চা করছি। সেটা করলে মা সবাইকে উঠিয়ে দেবেন। লুডুর ঘর ‘সিজ’ করে নেবেন। মায়ের সততা অসাধারণ।

প্রশ্ন: মাকে নিয়ে কোনো মর্মস্পর্শী বা অত্যন্ত আনন্দঘন কোনো ঘটনা থাকলে বলুন।

উত্তর: ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ পাকিস্তানিরা আমার বাবাকে হত্যা করল। তাজমহল রোডে আমাদের বাড়িটাতে আগুন ধরিয়ে দিল তারা। দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে দুই পা ভেঙে গেল মায়ের। তিনি পা দুটো তুলতে পারছেন না। আমি ওপর থেকে অসহায়ের মতো দেখছি, কিন্তু কোনো সাহায্য করতে পারছি না। সে এক মর্মান্তিক ঘটনা। একাত্তরে প্রাণ বাঁচানোর জন্য আমরা ঢাকা থেকে পালিয়ে গেলাম। মা তখন হাঁটতে পারেন না। কাঠের একটা পাটাতনে তাঁকে বসিয়ে আমরা কয়েকজন কাঁধে করে উনাকে বয়ে নিয়ে গেছি। আমাদের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়। আমরা সম্পূর্ণ উলটা পথে অনেক ঘুরে, অনেক সময় লাগিয়ে গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছুলাম শেষ অব্দি। সৈয়দপুর, বিক্রমপুর, তালতলা, ষাটনল, মতলব হয়ে আমরা কচুয়া গিয়ে পৌঁছাই। একাত্তরে মাকে যে আমরা বহন করে নিয়ে গিয়েছিলাম, মনশ্চক্ষে সেই দৃশ্যটা এখনো মাঝে মধ্যে ভেসে ওঠে।

আনন্দঘন ঘটনা অত বড় মাপের কিছু নেই। আমি ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে গায়ক হবো, এটা কোনোদিনই মা মানতে পারেননি। আজও না। তবে কোনো কোনোদিন সকালবেলা টিভি চ্যানেলে আমার গানের অনুষ্ঠান থাকলে মা’র সেটা দেখা চাই-ই চাই। ঘুম থেকে উনাকে উঠিয়ে দেওয়ার কড়া স্ট্যান্ডিং অর্ডার দেয়া আছে। গান গেয়ে বাড়িতে ফিরে আসা মাত্র আমার হাতটা ধরে বলবেন, গান ভালো হয়েছে বাবা। মায়ের ঘরে একটি সিডি প্লেয়ারে দিন রাত আমার গাওয়া গান বাজে। এতে উনার মনে হয় যে, হ্যাঁ ছেলে আমার পাশেই আছে।

কিছুতেই মায়ের কোনো অযত্ন হোক, কখনো সেটা চাইনি। বিয়ে শাদি যে করলাম না- তার অন্যতম প্রধান কারণ হয়তো এটিও। অনেক তো দেখছি।

প্রশ্ন: মায়ের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখবার ব্যাপারে আপনার কোনো ধরনের উদ্যোগ আছে কি? যদি থেকে থাকে, তাহলে পাঠকবৃন্দের সঙ্গে সেটা শেয়ার করার জন্যে অনুরোধ জানাই।

উত্তর: অসম্ভব ভালো রকমের সেলাই ফোঁড়াইয়ে দক্ষ ছিলেন আমার মা। একাত্তরের পর আমরা পথের ভিখিরি বনে গেলাম। এক বেলা খাবার জোটে তো, অন্য বেলা উপোস। মা আমাদের সবারই কাপড়-চোপড় বানিয়ে দিতেন। জামা-প্যান্ট, ফ্রক সালোয়ার-কামিজ, জ্যাকেট সবকিছু। পাকিস্তান আমলে গুলিস্তানের জিন্নাহ এভিনিউয়ে (বর্তমানের বঙ্গবন্ধু এভিনিউ) সিঙ্গারের শোরুম, ট্রেনিং সেন্টার ছিল। মা সেখানে রীতিমতো প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, অর্জন করেছেন ডিপ্লোমা ডিগ্রী। সেলাইকে সারা জীবন ধরে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। একসময় আড়ং-এর লোকজন এসে নিয়ে যেত আম্মার প্রডাক্ট। উনার স্মৃতি ধরে রাখাটা দরকার। চাচ্ছি যে, বোনেরা সেটা ধরে রাখুক। আমাদের বাড়ির নিচতলায় একটা বুটিক শপ ছিল বড় বোনের। সেটা এখন বন্ধ আছে। আমি নিজেও ডিজাইন করতাম বড় বোনের সঙ্গে। সেই বুটিক শপটা যেন আবার খোলা হয়- বড় বোনকে উদ্বুদ্ধ করবো সে ব্যাপারে।

মাত্র ৪৫ বছর বয়সে দশটা ছেলে-মেয়ে নিয়ে বিধবা হলেন আমার মা। তার সারাটা জীবন তো আমাদের জন্যই উৎসর্গ করলেন। এই ঋণ কী শোধ করার মতো? কখনোই না।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের দেওয়া কোনো বিশেষ পরামর্শ বা টিপসের কথা কী মনে পড়ে? কোনো উল্লেখযোগ্য উক্তি কী আপনাকে তাড়িয়ে ফেরে?

উত্তর: মায়ের জীবন দর্শন- আমার, ভাইবোনদের জন্য অনুসরণীয়। মিথ্যে বলা যাবে না। পরচর্চা বারণ। ধীরস্থিরতা। এগুলো মায়ের বিশেষ গুণ। এগুলো অনুকরণের চেষ্টা করে চলেছি।

প্রশ্ন: সন্তানের জন্যে মায়ের যে সামগ্রিক শ্রম, সাধনা এবং ত্যাগ, সেসবের স্বীকৃতি ও কৃতজ্ঞতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা আজকাল দেখি না। এ ব্যাপারে আপনার পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ কী, দয়া করে বলবেন?

উত্তর: যাদের মা আছেন, বাবা আছেন, তারা যেন বৃদ্ধাশ্রমের কথা কখনো না ভাবেন। যত কষ্টই হোক না- কেন বৃদ্ধ অসহায় বাবা-মাকে যেন নিজেদের কাছেই রাখেন। মেয়েরাই বাবা-মাকে দেখে বেশি। ছেলেরা সেই তুলনায় পিছিয়ে, তারা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর।

- সাক্ষাৎকার: হাসান হাফিজ