রবিবার,২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
হোম / সম্পাদকীয় / নারী ভাষাসংগ্রামীরা ন্যায্য স্বীকৃতি কবে পাবেন
০২/১৬/২০১৭

নারী ভাষাসংগ্রামীরা ন্যায্য স্বীকৃতি কবে পাবেন

-

ফাল্গুন মাস মহান ভাষাসংগ্রামীদের রক্তভেজা স্মৃতিময় মাস। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ববাংলার রাজধানী ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল বাঙালি তরুণদের রক্তে। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাপক গণআন্দোলন সৃষ্টি হয়েছিল সে-সময়। এত বিদ্রোহ কখনো দেখেনি কেউ। সে-আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, সর্বপ্লাবী। সমাজের সব স্তরের মানুষের সক্রিয় সমর্থন ও অংশগ্রহণ ছিল তাতে। মায়ের ভাষা বাংলার বিরুদ্ধে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের চক্রান্ত রুখে দিতে নারীসমাজের অংশগ্রহণ ছিল বলিষ্ঠ, অকুতোভয় ও ব্যাপক। মিছিল, প্রতিবাদ, বিদ্রোহে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে অনেক লড়াকু নারীকে মাশুল দিতে হয়েছিল। ঢাকাসহ সারা দেশে তাদের অনেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন। কেউ কেউ বহিষ্কৃত পর্যন্ত হয়েছিলেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী নেত্রী নারায়ণগঞ্জের শিক্ষিকা মমতাজ বেগমকে তার স্বামী তালাক পর্যন্ত দিয়েছিলেন। একমাত্র তাঁকেই মরণোত্তর একুশে পদক দেয়া হয়েছে। ১৯৭৬ সালে প্রবর্তনের পর থেকে আজ পর্যন্ত অন্য কারো ভাগ্যে এই সম্মাননা জোটেনি। এই লজ্জা আমরা কেমন করে ঘোচাই? আর কতকাল এই মর্মান্তিক ও অনভিপ্রেত গ্লানি আমাদের বহন করে চলতে হবে?

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত সেই কবিতা পঙ্ক্তির কথা আমরা সবাই জানি। কবি লিখেছিলেন, ‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ আমরা নারী অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে অনেক গালভরা কথা বলি। এসব প্রসঙ্গ এলে আবেগের আতিশয্যে আমাদের মুখে ফেনা উঠে যায় রীতিমতো। কিন্তু কার্যত আমরা কী দেখি? অবচেতনে পুরষতন্ত্রেরই পক্ষে কাজ করে যাই। এ অবস্থা কিছুতেই কাম্য, গ্রহণযোগ্য নয়। স্বাস্থ্যকরও নয়। জনগোষ্ঠীর অর্ধাংশ নারীকে পেছনে ফেলে প্রকৃত উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, প্রগতি অর্জন কখনোই সম্ভবপর নয়। যতদিন না আমরা কাজে নারীবান্ধবতার প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন ঘটাতে পারবো, ততদিন সমাজ, দেশ পিছিয়েই থাকবে। সত্যিকারের সমৃদ্ধি থেকে যাবে অধরাই। সুতরাং সময় থাকতেই কাজে-কথায় সমন্বয় ঘটাতে হবে। নাহলে তা আত্মপ্রবঞ্চনাই হয়ে থাকবে।

একুশে আজ শুধু বীর বাঙালিরই গর্বের বিষয় নয়, গোটা বিশ্ববাসীর অহঙ্কৃত সম্পদ ও ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বিশ্বের প্রায় সব দেশে যথোচিত মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে মহান এই দিনটি পালিত হয়। পবিত্র এই দিনটি স্মরণে আমরা সকল ভাষা শহীদ, ভাষা আন্দোলনে যাঁরা শরিক হয়েছিলেন, অবদান রেখেছিলেন, তাঁদের প্রত্যেককে বিনম্র কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানাই। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন ঘটানোর কঠিন প্রয়াসে যেন আমরা আরো আন্তরিক, আরো সচেষ্ট হই- সেটাই হোক এবারের একুশের প্রত্যয় ও অঙ্গীকার।

- তাসমিমা হোসেন