শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭
হোম / ফিচার / আজি এ বসন্তে
০২/১১/২০১৭

আজি এ বসন্তে

-

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে প্রকৃতিগত বৈচিত্র্য আগের তুলনায় যতই কমে যাক না কেন, তাকে ঘিরে উৎসব উদযাপনে এদেশের লোকজন বরাবরই সপ্রতিভ। আর উপলক্ষ যখন ঋতুরাজ বসন্তের আগমন, তখন উৎসবে বাড়তি রঙের ছটা থাকবে না, তা হতে পারে না। তাই প্রকৃতির বুকে নতুন ফুলের সমারোহ থাকুক বা না থাকুক, উৎসব-আয়োজনে পহেলা ফাল্গুনের আবেদন সার্বজনীন।

বসন্ত বরণের ইতিহাস
মোঘল সম্রাট আকবরের আমলে ১৫৮৫ সালে প্রথম বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু হয়। নতুন বছরকে কেন্দ্র করে প্রজাদের জন্য ১৪টি উৎসব উদযাপনের ঘোষণা দেন তিনি। এই উৎসবগুলোর একটি ছিল পহেলা ফাল্গুন অর্থাৎ বসন্ত উৎসব। মোঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস নিয়ে রচিত গ্রন্থগুলো ছাড়াও হিন্দুদের পৌরাণিক উপাখ্যান এবং লোকগাঁথাতেও ফাল্গুনের প্রথম দিনে এই উৎসব সম্পর্কে বলা হয়েছে। নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস থেকেই বহু বছর ধরে বেশ ঘটা করে এই দিনটিতে উৎসব পালন করে আসছে হিন্দু বৈষ্ণবরা।

পহেলা ফাল্গুনকে ঘিরে উৎসব-আনন্দ করার চল বহু বছর ধরে আবহমান বাংলার ঐতিহ্য-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে একেবারে আনুষ্ঠানিকভাবে বসন্ত উৎসব আয়োজনের রীতি শুরু হয় বেশ পরে, ১৪০১ বঙ্গাব্দ থেকে। তারপর থেকে প্রতিবছর এদেশে নানা বৈচিত্র্য এবং উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে বসন্ত উৎসব পালন করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিগত কয়েক বছর ধরে এই দিনটিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, পত্র-পত্রিকা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ভিন্নধর্মী আয়োজন লক্ষ্য করা যায়। তবে সবকিছু ছাপিয়ে, এদেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে এ দিনটিতে যে উদ্দীপনা দেখা যায়, তা নেহাত পশ্চিমাভক্ত মানুষকেও একদিনের জন্য হলেও ষোলআনা বাঙালিয়ানার স্বাদ এনে দেবে, তা বলাই যায়।

পহেলা ফাল্গুনের যত আয়োজন
বাংলাদেশে বসন্তবরণে প্রতিবারেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠানসমুহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এদিনের প্রথম প্রহরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তির মাধ্যমে বসন্তবরণ উৎসব শুরু হয়। দলীয় পরিবেশনায় ছায়ানট, সুরের ধারা এবং সুরসপ্তকের মতো সংগঠনগুলো উপস্থিত দর্শকদের মোহিত করে রাখে। স্পন্দন, নৃত্যম, নটরাজ ইত্যাদি সংগঠনের শিল্পীদের দলীয় নৃত্যের সঙ্গে দেশবরেণ্য আবৃত্তিকারদের কবিতা যুক্ত হয়ে যে অনাবিল মূর্ছনার সৃষ্টি হয়, তা নেহাত যান্ত্রিক মানবমনকেও আবেগের বানে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

চারুকলা অনুষদ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকা এবং অপরাজেয় বাংলা প্রাঙ্গণেও একই ধরনের মনোমুগ্ধকর আয়োজন লক্ষ্য করা যায়। রাজধানীর রবীন্দ্র সরোবরে এই দিনটিকে ঘিরে বিশেষ আয়োজন বেশ ক’বছর ধরে চলে আসছে। টিএসসি কিংবা রবীন্দ্র সরোবরের মঞ্চে আয়োজিত সংগীতানুষ্ঠানে জনসাধারণের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক স্মৃতিস্তম্ভ ও উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টর পার্ক, শাহবাগ, পাবলিক লাইব্রেরি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বলধা গার্ডেন এমনকি ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এদিনটিকে ঘিরে একই ধরনের আয়োজন থাকে। এদিনটিকে ঘিরে বিভিন্ন সংগঠন ছাড়াও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও গতানুগতিক ধারার বাইরের অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোও বাজারে আনে পোশাক-আশাকের নতুন সম্ভার।

উৎসব-আনন্দ বিলাসী বাঙালির জীবনে বসন্তবরণ বেশ একটি ঐতিহ্যবাহী উপলক্ষ। তাই আসছে বসন্তের প্রথম দিনটি পরিবার-পরিজন নিয়ে মেতে উঠুন ঋতুরাজ বরণ উৎসবে।

- নাইব রিদোয়ান