শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭
হোম / জীবনযাপন / একা মায়ের জীবনে নতুন সম্পর্ক
০২/০৫/২০১৭

একা মায়ের জীবনে নতুন সম্পর্ক

-

‘সিঙ্গেল মাদার’ -- আমাদের সমাজে এই তকমাটি বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। এই আধুনিক যুগেও একা সন্তান লালন-পালন করতে গিয়ে নানান ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এবং সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় মায়েদের। তার উপর নতুন করে যদি কারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পরা কিংবা নতুন সংসার শুরু করার সিদ্ধান্ত নিতে গেলে সেই টানাপোড়েন যেন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়া, স্বামীর মৃত্যু অথবা অন্য কোনো কারণে অনেক মা-ই একা তাদের সন্তানদের বড় করার মতো সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন। পরিস্থিতিও অনেককে বাধ্য করে। আরও এক দশক আগে এমন পরিস্থিতি আমাদের সমাজে একেবারেই সহজভাবে নেওয়া না হলেও এখন অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা এমন পদক্ষেপ নিচ্ছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক মা-ই একা তাদের সন্তানদের লালন-পালনের দায়িত্ব নেন। তাছাড়া অনেক মা-ই একটি বাজে সম্পর্কের টানাপড়েন থেকে নিজেকে ও সন্তানকে নিয়ে বেরিয়ে এসে নতুন একটি জীবন শুরু করেন।

কিন্তু পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, ‘সিঙ্গেল মাদার’-দের এই সমাজে পথচলা মোটেও সহজ নয়। প্রতি পদক্ষেপে নানান পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয় তাদের। তাছাড়া নতুন করে অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানো আরও বড় ট্যাবু এই সমাজে। নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হলেও পরিবার বা সমাজ অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দেয় না। তাছাড়া একা মায়েদের যখন নানান পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয় সেক্ষেত্রে তাদের মানসিক পরিবর্তনটাও হয় অনেক বেশি।

তাই নতুন সম্পর্কে জড়ানো বা প্রেমে পড়া এই সবের আগে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।

এক্ষেত্রে সম্ভাব্য জীবনসঙ্গীর কিছু বিষয় আপনাকে যাচাই করে নিতে হবে। যেমন:

- দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কে তার বিশ্বাস কতটুকু?

- শেষ কবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সম্পর্কে সে জড়িয়েছে এবং সম্পর্কটা কতদিন টিকেছিল?

- মতবিরোধকে সে কিভাবে সমাধান করে? রাগ সামলাতে তার দক্ষতা কেমন?

- সম্পর্ক বিষয়ক সমস্যাগুলো সে কিভাবে সমাধান করে?

- জটিল কোনো রোগ আছে কিনা?

- নিজের সাংসারিক ও অর্থনৈতিক কর্তব্যগুলো সম্পর্কে তার অভিমত কী?

- সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে তার চিন্তাধারা কেমন? সন্তানের প্রতি সে কতটা ধৈর্যশীল?

- সে কি নিজের সন্তান নিতে চায়? আপনার সন্তানকে সহজভাবে মেনে নিতে এবং তাদের বেড়ে উঠতে সাহায্য করবে কি না?

অবিবাহিত অবস্থায় প্রেমের সম্পর্কে জড়ানো হতে পারে মজার। তবে আপনি যখন একজন তালাকপ্রাপ্ত কিংবা বিধবা মা, তখন বিষয়টা বেশ জটিল। এ-অবস্থায় নতুন করে সংসার বাঁধার পরিকল্পনা অবশ্যই দোষের নয়, তবে এসময় সঙ্গী পছন্দের ক্ষেত্রে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সতর্ক হওয়া ও যে কোনো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার প্রস্তুতি থাকতে হবে।

কারণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে পুরানো ভুলের পুনরাবৃত্তি মোটেও আশাপ্রদ নয়। তাছাড়া এসময় নিজের পাশাপাশি সন্তানের ভবিষ্যৎও জড়িয়ে আছে আপনার সিদ্ধান্তের সঙ্গে। তাই যে কোনো সম্পর্কে জড়ানোর আগে নিজের সঙ্গেই কিছুটা বোঝাপড়া হওয়া জরুরি। ভবিষ্যতে যার সঙ্গে নিজেকে জড়াতে চাইছেন, তার সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়ার পাশাপাশি কিছু বিশেষ প্রশ্ন করুন নিজেকেই। এজন্য সময় নিতে দ্বিধাবোধ করবেন না।

তাকে আপনার প্রয়োজন কতটুকু?

বর্তমান সময়ে অনেক নারী একাই ভালো আছেন, তেমনটাই থাকতে চান। আর একবার তালাকপ্রাপ্ত হলে অনুভূতি আরও কঠিন হয়ে যায়। তবে নতুন করে সংসার জীবন শুরু করার অনুভূতি মন থেকে হারিয়ে যাবে এমনটা নয়। এক্ষেত্রে নিজেকে সময় দিতে হবে, নিজের প্রয়োজনগুলো বুঝতে হবে। নিজেকে যদি একাকী জীবন যাপনের জন্য সমর্থ বলে মনে হয়, তবে নতুন সম্পর্ক থেকে দূরে থাকতে কোনো দোষ নেই। তাই নতুন সম্পর্কে জড়ানোর আগে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করুন যে আপনার এবং আপনার সন্তানের জীবনে তৃতীয় ব্যক্তির অস্তিত্ব কতখানি জরুরি!

নিজের চাওয়া সম্পর্কে স্পষ্টভাষী হওয়া

সঙ্গী বেছে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে সঙ্গীর কাছ আপনি কী আশা করেন, সে বিষয়ে স্পষ্টভাষী হওয়া জরুরি। সংসারের দায়িত্ব বহন করা কিংবা শুধুই আপনাকে সঙ্গ দেওয়া, কারণ যেটাই হোক, নতুন সঙ্গীকে আপনার ইচ্ছা জানাতে হবে। এতে উভয়েই ভবিষ্যতে কষ্ট পাওয়া ও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়া থেকে রক্ষা পাবেন। তাই সম্পর্কের সূচনার আগেই এই সব বিষয়ে খোলাখুলি আলাপ করে নিন।

সঙ্গী কেমন হওয়া উচিত

জীবনসঙ্গী বা প্রেমিকের মধ্যে কি ধরনের গুণাগুণ পছন্দ -- এক্ষেত্রে একেকজনের চাহিদা ভিন্ন। তাছাড়া একা থাকা অবস্থায় অনেকের মিষ্টি কথায় গলে যাওয়া খুব সহজ অনেক ক্ষেত্রে। কিন্তু ডিভোর্সের পরে আর আপনি যদি একজন মা হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে আপনার নিজের আত্মসম্মান ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। অন্যের কথায় প্ররোচিত না হয়ে সবদিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

জীবনের এমন পর্যায়ে আপনাকে আর্থিক এবং মানসিক উভয় দিক থেকে স্থিতিশীল একজন সঙ্গী বেছে নিতে হবে। এমন একজন যে আপনাকে সম্মান করবে এবং আপনার পরিস্থিতি বুঝে পাশে থাকবে। যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কে বিশ্বাসী। কারণ দ্বিতীয় এই অধ্যায়ে এসে সম্পর্কের স্থায়িত্ব বেশ জরুরি। আর্থিক নিশ্চয়তার পাশাপাশি আপনার সঙ্গে মানসিকতার মিল আছে কিনা, সেই দিকটি বিচার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব বুঝে শুনে তবেই সামনে এগোতে হবে।

সন্তানকে মানিয়ে নেওয়ার সময় দিন

আপনার জীবনে নতুন সঙ্গী আপনার সন্তানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আর শিশুদের ক্ষেত্রে এ-ধরনের পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে বেশ কিছু সময় প্রয়োজন। কারণ বড়রা যেমন নতুন মানুষের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নিতে পারে, শিশুরা অনেক ক্ষেত্রেই তাতে সময় নেয় কিছুটা বেশি। অনেক সময় মেনেও নিতে পারে না যে তাদের মায়ের জীবনে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাছাড়া যদি আগে ডিভোর্স হয়ে থাকে, আর ওই বিষয়গুলো বোঝার মতো মানসিক অবস্থা ও বয়স সন্তানের হয়ে থাকে, তাহলে এর গভীর প্রভাব পড়ে তাদের মনে। তাই পরবর্তীসময় মায়ের নতুন সম্পর্ক মেনে নিতে তার কিছু সমস্যা হতেই পারে।

এ-বিষয়গুলো আগেই মাথায় রাখা উচিত। তাই সন্তান যদি বড় হয়ে থাকে, তার সঙ্গে আলাপ করুন। বা বোঝার চেষ্টা করুন সন্তান নতুন ব্যক্তিকে তার জীবনে সহজভাবে স্থান দিতে পারছে কিনা।

সমাজ, সন্তান এবং পারিবারিক সবদিক বিবেচনা করে তবেই তো নতুন সম্পর্ক। তবে লোকে কি বলবে চিন্তা করে নিজেকে বঞ্চিত করা মোটেও উচিত নয়। শুধু খেয়াল রাখবেন নতুন পদক্ষেপ নিতে গিয়ে তাড়াহুড়া হয়ে না যায়। সব দিক ভেবে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নতুন জীবনে প্রবেশের আগে নিজের সঙ্গে এ নিয়ে বোঝাপড়া তাই একান্ত প্রয়োজন।

- বেলা দত্ত