বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭
হোম / বিবিধ / সাকরাইন: আতশবাজি আর ঘুড়িতে পৌষ বিদায়ী উৎসব
০২/০৫/২০১৭

সাকরাইন: আতশবাজি আর ঘুড়িতে পৌষ বিদায়ী উৎসব

-

ভোরের আলো ফুটতেই পুরান ঢাকার আকাশটা নানারংয়ের ঘুড়িতে একাকার হয়ে যায় প্রতিবছর চৌদ্দই জানুয়ারি। ঘুড়ির এই বর্ণিল উৎসবকে স্থানীয় ভাষায় বলে সাকরাইন। পৌষ মাসের শেষ দিন এই উৎসবমুখর দিনটি পালন করা হয় বলে একে পৌষসংক্রান্তিও বলা হয়ে থাকে।

পাড়া-মহল্লার অলি-গলি আর ছাদে এই ঘুড়ি উড়ানো আর কাটাকাটির মজার খেলায় দিনভর মেতে ওঠে পুরান ঢাকার মানুষেরা। সুতা মাঞ্জা দেবার ব্যস্ততা এই জানুয়ারিতে চোখে পড়ার মতো। রাস্তায় রাস্তায় সবার হাতে ঘুড়ি উড়ানো ও মাঞ্জা দেবার উপকরণ বিশেষ করে নাটাই, সুতা, রং, কাচের চুর আর নানাপদ, নানানামের বাহারি ঘুড়ি চোখে পড়ে।

বিশেষ প্রক্রিয়ায় সুতাকে কাচের চুর (গুঁড়া) দিয়ে ধারালো করা হয়। এই প্রক্রিয়াটি মাঞ্জা নামে পরিচিত। সুতোয় ভালো মাঞ্জা থাকলে অন্যের ঘুড়িকে কেটে দিতে সহজ হয়, যাকে বলে কাটাকাটির খেলা। কাটা পড়া ঘুড়িগুলো ভাসতে ভাসতে এসে পড়ে বিভিন্ন ছাদে, আর সবার নজর থাকে সেইদিকে, তা সংগ্রহের জন্য। যে-যতটা ঘুড়ি কাটতে পারে তার উপরই ঘুড়ি উড়ানোর আসল মজা। তবে কয়েক বছর ধরে ‘রক’ নামের কৃত্রিম সুতা মাঞ্জার সেই আনন্দ মাটি করে দিচ্ছে।

আদি ঢাকাইয়ারা ঘুড়িকে বলে ঘুড্ডি বা গুড্ডি। ঘুড়ির আবার নানা চমৎকার মজার সব নাম আছে। স্থানীয়ভাবে ডাকা হয় যেমন চোখদার, মালদার, দাবা, চশমাদার, গগনদার, মাছ, পেটকাটা ইত্যাদি অনেক ধরনের বাহারি ঘুড়ি কিনতে পাওয়া যায়। চৌদ্দই জানুয়ারি ঐতিহ্যবাহী এই ঘুড়ি উৎসবের
উন্মাদনায় ছোট-বড় সবাই খুব ভোরে ওঠে। পরিবার আর বন্ধুদের নিয়ে ছাদে ওঠে কাঙ্খিত এই দিনটির আনন্দ উপভোগের জন্যে।

ঈদ মিছিল, বৈশাখী মেলা আর সাকরাইন পুরান ঢাকাবাসীর প্রিয় উৎসব। একসময় ঘটা করে পৌষের শেষে শশুরবাড়িতে জামাই আসতেন আর দেয়া হতো মাঞ্জা দেয়া নাটাই আর ঘুড়ি। কেউ জামাই বাড়িতে পাঠাতেন পিঠার ডালা ও নাটাই-ঘুড়ি। পুরান ঢাকাবাসীদের এই চমৎকার আচারগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে বললেই হয়। তখন প্রতি ছাদে গান বাজানোর জন্য মাইক ছিল প্রধান, তাই দেখা যেত ছাদে ছাদে মাইক ভাড়া করে এনে বাজানো হতো গান। কোনো ছাদের ঘুড়ি কাটা পড়লেই মাইক্রোফোনে ‘বাকাট্টা লোট’ বলে চিৎকার শোনা যেতো গানের আওয়াজ ছাপিয়ে।

আজকাল মাইকের স্থান পুরোটাই দখল করে নিয়েছে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেমের বিশাল স্পিকার। হালে যোগ হয়েছে সন্ধ্যার পরে ফায়ার ওয়ার্ক বা আতশবাজি। রাতে কেউ কেউ ওড়ায় ফানুস। আগে সাকরাইনে ছাদে ছাদে মুখে কেরোসিন নিয়ে তা আগুনের মশালে ফুঁ দিয়ে মশাল-আগুনের খেলা শেষ হয়ে যেত; কিন্তু এখন ডিজে পার্টি ও কাবাবের আয়োজন করা হচ্ছে অধিকাংশ ছাদেই। সারাদিনের এই ঘুড়ি উড়ানোর উৎসবে আদি থেকেই ঢাকাইয়ারা নানাধরনের পিঠা, মোয়া, পোলাও-বিরিয়ানির আয়োজন রাখেন তাদের খাবারের তালিকায়।

মূলত নাটাই-ঘুড়ির মূল জোগান আসে শাঁখারিবাজার থেকে, তার পরে সূত্রাপুরসহ নানা জায়গা থেকে। আতশবাজিও শাঁখারিবাজার ও তাঁতিবাজার থেকেই কিনে থাকেন পুরান ঢাকার মানুষ। আতশবাজি বিক্রিতে আইনগত কড়াকড়ি আর বিধিনিষেধ থাকায় বিক্রি অনেকটা আড়ালে করা হয়। সাকরাইন পুরান ঢাকার সব জায়গাতে কম-বেশি হলেও কিছু অংশে বড় পরিসরে উদযাপন করা হয়; এর মাঝে গেন্ডারিয়া, সূত্রাপুর, দয়াগঞ্জ, শাঁখারিবাজার, রোকনপুর, কলতাবাজার, লক্ষ্মীবাজার, ধোলাইখাল, নয়াবাজার, নারিন্দা, মৌশুন্ডি, শ্যামবাজার ইত্যাদি স্থান উলে­খ্য।

পুরান ঢাকায় নানারকমের ও বিভিন্ন দামের ঘুড়ি পাওয়া যায়। তবে উৎসবের সময়টাতে স্বাভাবিকভাবে চাহিদা থাকে বেশি। ৫ টাকা থেকে শুরু করে বড় ঘুড়ি ১০ টাকা বা বিশেষ ডিজাইনের ঘুড়ি আরও বেশি দামে বিক্রি হয়ে। বড়দের নাটাইয়ের পাশাপাশি ছোটদের জন্যও তাদের উপযোগী ছোট নাটাই পাওয়া যায়, যা উৎসবের আনন্দকে বাড়িয়ে দেয় নিঃসন্দেহে।

বর্তমান প্রজন্ম সাকরাইনকে করেছে আরোও উপভোগ্য, তাদের মতো করে যুগের অনেক আধুনিকতার সমন্বয়ে। তবে এমন ঐতিহ্যগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করেন অনেক বয়ঃজ্যেষ্ঠরাই। নতুন প্রজন্মকে তারা শোনান সেই সুন্দর দিনগুলোর কথা। প্রতিবছর চৌদ্দই জানুয়ারি পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবে নীল আকাশে বাতাসের ছন্দে ছন্দে ওড়ে নানারংয়ের ঘুড়িগুলো, যা শুধু উৎসবই নয় একটি সুন্দর ও অর্থবহ আনন্দের নাম - সাকরাইন।

- মোহাম্মদ ওয়াসিম

ছবিঃ মোহাম্মদ ওয়াসিম/সংগ্রহ