রবিবার,২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
হোম / সম্পাদকীয় / বসন্তের আনন্দ হিল্লোল ছড়িয়ে পড়ুক ঘরে ঘরে
০২/০২/২০১৭

বসন্তের আনন্দ হিল্লোল ছড়িয়ে পড়ুক ঘরে ঘরে

অভিনন্দন সুনামগঞ্জ মডেল

-

‘ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে’, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি গানে আছে এই কথা। এবারের অল্প শীতের ঋতু শেষ হয়ে বসন্ত এসে গেল। গাছের নবীন পাতায় পাতায় সেই আনন্দ হিল্লোল। এসে গেল বিশ্ব ভালোবাসা দিবসও। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনী ক্ষণে, বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে আমাদের একান্ত প্রত্যাশা-সমাজ থেকে হিংসা-কলুষ, অজ্ঞানতা, বৈষম্য, অনাচার-অবিচার, নারী নির্যাতনের অবসান ঘটুক। ক্ষুদ্র স্বার্থ ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে আমরা যেন প্রিয় দেশকে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি, সেই অঙ্গীকার হোক সবার। এবারের অনন্যা সাজানো হয়েছে পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসকে সামনে রেখে। সবাইকে বাসন্তী শুভেচ্ছা।

বাল্যবিবাহকে লাখো কণ্ঠে ‘না’ বলা হয়েছে। সুনামগঞ্জ জেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে গত ২৩ জানুয়ারি ২০১৭। শিক্ষার্থীসহ লাখো মানুষ অংশ নেন এই অনন্য আনুষ্ঠানিকতায়। জেলার ২৯৯টি জায়গায় একযোগে একলাখ ১৪ হাজার ৩২৩টি লালকার্ড দেখানো হয়েছে এই সামাজিক ব্যাধিকে। বাল্যবিবাহকে ‘না’ বলার এই বতিক্রমী উদ্যোগ যাতে গিনেস বুকে ঠাঁই পেতে পারে, সেজন্য সংশ্লিষ্টরা অনুষ্ঠানটি পর্যবেক্ষণ করেছেন। নারী অধিকার আদায়ের এই শুভ, মহতী উদ্যোগকে আমরা স্বাগত ও অভিনন্দন জানাই।

সুনামগঞ্জে ওই দিনটি ছিল উৎসবমুখর। ভোর থেকে ঘরে ঘরে উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে বালিকারা, তাদের বাবা-মায়েরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন অনুষ্ঠানটিতে যোগ দেয়ার জন্যে। কন্যা শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকরাও উজ্জীবিত হন। বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে কোমলমতি শিশুরা যাতে সচেতন হতে পারে, এই সামাজিক ব্যাধি প্রতিরোধে তারা যেন দৃঢ়চেতা হয়ে উঠতে পারে, তা-ই ছিল লক্ষ্য। মেয়েরা যেন নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারে, রুখে দিতে পারে এই অভিসম্পাতকে, সেই বোধ ও চেতনা তাদের মধ্যে সঞ্চার করা ছিল এই আয়োজনের মুখ্য উদ্দেশ্য। ওই দিন সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলায় একই সময়ে মেয়ে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ জামালউদ্দিনের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বাল্যবিবাহকে ‘না’ বলেছেন। দুপুর বারোটা পঁচিশ মিনিটে সবাই লাল কার্ড দেখিয়েছেন অভিশপ্ত এই কুপ্রথাকে। ওই সময়ে সুনামগঞ্জকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করেছেন বিভাগীয় কমিশনার। গত বছরের জানুয়ারিতে ছাতকে এই আন্দোলন সূচিত হয়েছিল। পরে তা জেলাব্যাপী বিস্তৃত হয়।

এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কোনো বিশেষ অঞ্চলকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করা সহজ, কিন্তু বাস্তবায়ন করার যে চ্যালেঞ্জ, সেটা মোকাবেলা করা অবশ্যই সুকঠিন। আমরা ব্যাপারটাকে অবশ্যই সর্বাংশে ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই। কিন্তু সংশয় থেকে একেবারে মুক্ত হতেও পারছিনা। যে অভিভাবকরা এই ঘোষণার সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন, সোচ্চার হয়েছেন, তারা এবং অন্যরা না আবার এই অঙ্গীকারের বিপরীত কাজ করে বসেন। সেই ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে হবে। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে সার্বিক সামাজিক আন্দোলন। সমাজের নানা পেশার গণ্যমান্য দায়িত্ববান মানুষকে নিয়ে গড়ে তুলতে হবে সত্যিকারের কার্যকর ও সক্রিয় প্রতিরোধ। আইনের সঠিক, নিরপেক্ষ, দ্রুত বাস্তবায়নও কাম্য। শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের দিয়ে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে বলে মনে হয়না। সুনামগঞ্জ মডেল সারাদেশে বিস্তৃত হোক, দেশের সব জেলাই যত দ্রুত সম্ভব বাল্যবিবাহের লজ্জাজনক গ্লানি এবং অভিশাপ থেকে মুক্ত হোক-আমাদের একান্ত কামনা ও প্রত্যাশা তাই। আমরা দেখতে চাই, দেশের কোথাও যেন বাল্য বিবাহের মতো আত্মধ্বংসী, ক্ষতিকর, অনভিপ্রেত ঘটনা একটিও না ঘটে।

- তাসমিমা হোসেন