বুধবার,১৬ অগাস্ট ২০১৭
হোম / ফিচার / আমার মা - সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
০১/২৬/২০১৭

আমার মা - সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

-

একটি মানুষের মধ্যে বহু গুণের অস্তিত্ব ও সমন্বয় আমরা দেখতে পাই। আদর্শ শিক্ষক তিনি, অসামান্য বাগ্মী, সমাজবদলের অঙ্গীকারে নিবেদিতপ্রাণ, সমাজচিন্তক, প্রাবন্ধিক, সাহিত্য সমালোচক, সম্পাদক, ক্রমভঙ্গুর পরিবেশ রক্ষার সুকঠিন আন্দোলনের অগ্রণী ব্যক্তিত্ব। মননের চর্চা করে চলেছেন অবিশ্রাম। অতি উত্তম বক্তা, তাঁর রচনা ও বাচনভঙ্গির মতো স্বাদু ও বৈশিষ্ট্যের মতোই প্রাণময়, প্রাঞ্জল এবং অননুকরণীয়। গুরুতর বিষয়কে তিনি সহজাত প্রতিভা ও নান্দনিক বৈগুণ্যে সহজ সরল করে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে পারেন। এই গুণ নিতান্তই দুর্লভ। নিরহঙ্কার, নির্লোভ, সদাহাস্য এই মানুষটি হলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

বয়স আশি পেরোলেও তিনি অসম্ভব কর্মচঞ্চল, সময়ানুবর্তী, সৃষ্টিমুখর, তারুণ্যদীপ্ত। চারিত্রিক দার্ঢ্য তাঁকে স্বাতন্ত্র্যে, মহিমায় উদ্ভাসিত করে। স্থাপন করে অন্যমাত্রিক এক উচ্চতায়। তাঁর প্রজ্ঞার আলোয় সমাজ উপকৃত হয়। তিনি আলোর দিশারী, বাতিঘর, প্রগতি আন্দোলনের অগ্রনেতা। ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্ত পত্রিকার সম্পাদক, সমাজ-রূপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ দেয়াল পত্রিকা পরিষদের সভাপতি। বিপুল তাঁর রচনাসম্ভার, প্রকাশিত গ্রন্থ একশ’রও বেশি। বাংলা ও ইংরেজিতে লিখিত বহু রচনা অবশ্য এখনো গ্রন্থিত হওয়ার অপেক্ষায়।

তাঁর জন্ম বৃহত্তর ঢাকার বিক্রমপুরের বড়ইখালী গ্রামে, ১৯৩৬ সালের ২৩ জুন। এটি পড়েছে শ্রীনগর উপজেলায়। পড়াশোনা করেছেন পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেন্ট গ্রেগরিজ হাইস্কুল, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংরেজি বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাস করেন ১৯৫৬ সালে। তারপর মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজ ও ঢাকার জগন্নাথ কলেজে (এখন বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষকতা করেন। তিনি ইংল্যান্ডের লীডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। পিএইচডি করেন যুক্তরাজ্যের লেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক পদে তিনি যোগদান করেন ১৯৫৭ সালে। বন্ধুবান্ধবরা প্রায় প্রত্যেকেই সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেও তিনি মনস্থ করেন যুক্ত থাকবেন লেখালেখির সঙ্গে। সেজন্যেই বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতার পেশা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন ২০০২ সালে। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর কাজের ওপর এম. ফিল পর্যায়ে গবেষণা হয়েছে। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে বিস্তর। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পঠিত হচ্ছে তাঁর রচনা। ইউজিসি প্রফেসর ছিলেন ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত। সমাবর্তন বক্তৃতা প্রদান করেছেন ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, গণবিশ্ববিদ্যালয়, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, গ্রীন ইউনিভার্সিটিতে।

কর্মজীবনে তিনি দুবার ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন। দুবার তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট কর্তৃক উপাচার্য নিয়োগের প্যানেলে মনোনয়ন লাভ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্র তাঁর উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ নয় বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। পালন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও। ১৯৭১ সালে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ৬জন শিক্ষককে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করে দিয়েছিল, তিনি তাঁদের অন্যতম। ওসমানী উদ্যান রক্ষা আন্দোলন ও লালন ফকিরের আখড়া রক্ষার আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই আন্দোলন ছিল দীর্ঘ এবং সফল। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশে দেয়াল পত্রিকা আন্দোলন গড়ে উঠেছে। সত্তরের দশকে শিশু কিশোর নাট্য আন্দোলনেরও অকুণ্ঠ পৃষ্ঠপোষকতা এবং সস্নেহ উৎসাহ দিয়েছেন তিনি।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখা প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে: বাঙালির জয় পরাজয়, মুখোশ ও মুখশ্রী, নির্বাচিত প্রবন্ধ, কুমুর বন্ধন, নিরাশ্রয় গৃহী, নজরুল ইসলাম, আমার পিতার মুখ, শ্রেণী সময় ও সাহিত্য, স্বাধীনতার স্পৃহা ও সাম্যের ভয়, বাঙালীকে কে বাঁচাবে, বৃহত্তর ভাঙা-গড়া, প্রবন্ধ সমগ্র (সাত খণ্ড) রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি, অন্বেষণ, আপনজন, ছত্রভঙ্গের পূর্বাপর, রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের মতোই, বেকনের মৌমাছিরা, নেতা জনতা ও রাজনীতি, বঙ্কিমচন্দ্রের জমিদার ও কৃষক, শরৎচন্দ্র ও সামন্তবাদ, উপরকাঠামোর ভেতরই, উদ্যানে এবং উদ্যানের বাইরে, শেষ মীমাংসার আগে, কেউ বলে বৃক্ষ কেউ বলে নদী, স্বপ্নের আলোছায়া, টলস্টয় অনেক প্রসঙ্গের কয়েকটি, দ্বিজাতিতত্ত্বের সত্যমিথ্যা, ভরসার জায়গাজমি, রাষ্ট্রের মালিকানা, এর পথ ওর প্রাচীর, লিঙ্কনের বিষণ্ণ মুখ, তাকিয়ে দেখি, অনতিক্রান্ত বৃত্ত, দ্বিতীয় ভুবন, আরণ্যক দৃশ্যাবলী, গণতন্ত্রের সন্ধানে, ফয়েজ আহমদ স্মারকগ্রন্থ (সম্পাদনা), আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘দুই যাত্রায় এক যাত্রী’, ‘বাঙালির জাতীয়তাবাদ’, ‘সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি’, জাতীয়তাবাদ ইংরেজিতে 'Middle class and social revolution in Bengal’,`Nazrul Islam Poet and More’,`The Moral Imagination of Josef Conrad’,`The Enemy Territory' ইত্যাদি।

তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কার, স্বীকৃতি ও সম্মাননার মধ্যে রয়েছে: একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা স্বর্ণপদক, কাজী মাহবুবউল্লাহ পদক, বাঙলাদেশ লেখক শিবির পুরস্কার, লেখিকা সংঘ পদক, আবদুল রউফ চৌধুরী পুরস্কার, ঋষিজ পদক, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, আবদুর রহমান চৌধুরী পদক ইত্যাদি।

তাঁর পিতার নাম হাফিজউদ্দিন চৌধুরী, মাতার নাম আসিয়া খাতুন। অধ্যাপক চৌধুরীরা ৯ ভাই ৪ বোন। তিনি সবার বড়। স্ত্রী নাজমা জেসমিন চৌধুরীও ছিলেন শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে। তিনি অকালে প্রয়াত হন। তিনি ছিলেন প্রাবন্ধিক, গবেষক এবং নাট্যকার। শিশু-কিশোর নাট্য আন্দোলনের অন্যতম অগ্রণী ব্যক্তিত্ব। এই দম্পতির দুই কন্যা, রওনক আরা চৌধুরী ও শারমিন চৌধুরী।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের ব্যক্তিত্ব আপনার জীবনে কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করেন?

উত্তর: যতই বয়স বাড়ছে, ততই বুঝতে পারছি যে আমার জীবনে বাবার প্রভাবের চেয়ে মায়ের প্রভাব গভীরতর। পরিমাপ করা যাবে না, সংজ্ঞায়িত করাও অসম্ভব, প্রভাবটা আছে গভীরে এবং অদৃশ্য আকারে। অন্যসব পরিবারের মতোই আমাদের পরিবারও ছিল পিতৃতান্ত্রিক। বাবাকে আমরা আপনি বলে সম্বোধন করতাম, মা’কে বলতাম তুমি। এতেই বোঝা যায় মা’র সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল নিবিড়। বাবা ছিলেন আব্বা, মা শুধুই মা। ওই ডাকের ভেতরও ব্যবধানটা ধরা পড়ে। আমি আমার পিতার কাছে বহুবিষয়ে ঋণী। অভিভাবক হিসেবে তিনি ছিলেন নিখুঁত, এবং অনেক দিক দিয়েই আদর্শস্থানীয়। কি পড়বো, কোথায় পড়বো, কোন পেশাটা ঠিক হবে, এসব ব্যাপারে তাঁর পরামর্শ ছিল অত্যন্ত উপকারী। কিন্তু মা’র কাছ থেকে পেয়েছি, আমার স্বভাবের যেগুলোকে ভালো দিক বলে মনে করি, তাদের অনেক ক’টি। সংবেদনশীলতা, ধৈর্য, বিপদে অস্থির না হওয়া- এসব মায়ের কাছ থেকে শেখা। দুঃখ এই যে যথেষ্ট পরিমাণে শিখতে পারিনি। পারলে ভালো হতো। মানুষ হিসেবে আরো ভালো হতাম। বিশেষ করে বিপদে অস্থির না-হওয়ার শিক্ষাটা রপ্ত করতে পারলে স্বস্তি বাড়তো। কত যে চ্যালেঞ্জের ভেতর দিয়ে আমার মা’ তাঁর ৯২ বছরের জীবন কাটিয়েছেন, কিন্তু কোনো ধৈর্য হারান নি। আমার মায়ের সাথে আমার এই সম্পর্ক বিষয়ে আমি যতটা না টের পেতাম, তার চেয়ে বেশি টের পেতেন অন্যরা। মনে পড়ে, আমার বিয়ের পরে আমার স্ত্রীও সেটা ধরতে পেয়েছিলেন; তিনি প্রথম দিকেই বলে দিয়েছিলেন, তুমি যতটা না তোমার বাবার ছেলে, তার বেশি তোমার মায়ের। আমারও মনে হয়, ধারণাটা সত্য।

প্রশ্ন: আপনি বর্তমানে যে অবস্থানে রয়েছে, সেক্ষেত্রে আপনার মায়ের অনুপ্রেরণা ও অবদান কতখানি? আপনার অর্জিত সাফল্যের নেপথ্যে তাঁর ভূমিকা কেমন?

উত্তর: অর্জন যা ঘটেছে, তার পেছনে মায়ের অবদানটা নিঃশব্দ। আর সে জন্যই খুব কার্যকর। আমার মা’য়ের অবস্থানটা ছিল একটা বৃত্তের ভেতর। তিনি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন, বৃত্তটাকে ভাঙতে না পারলেও অন্তত তার বিস্তারটাকে বাড়াতে। আমার মনে হয় আমি ওই কাজটিই করতে চেয়েছি। বৃত্তকে প্রসারিত করার কাজ। আমি বই পড়তে ভালোবাসতাম। আমার মা বই পড়তে দেখলে খুব খুশি হতেন। তাঁর ছেলেমেয়ের সংখ্যা ছিল তের জন। এদেরকে মানুষ করা সহজ কাজ ছিল না। আমি সবার বড়। ঘরের কাজে সাহায্য করা, এবং পরে সংসারের দায়ভার লাঘব করা, এসব ব্যাপারে আমাকে কখনো কিছু বলেননি। বিশেষ করে পরীক্ষার সময়ে দেখতাম, রাত জেগে চা বানিয়ে খাওয়াচ্ছেন, সকালে উঠে ঠিক মতো যাতে নাস্তা খাওয়া হয়, সেদিকে চোখ রাখছেন।

প্রশ্ন: মাকে আপনি কখনো মিস করেন?

উত্তর: এই যে জিজ্ঞেস করলে, তাতেই মনে পড়লো যে মা’কে আমি খুবই মিস করি। যখনই সচেতন হই যে, তিনি নেই, তখনই অভাববোধটা জেগে ওঠে। আমার মা ছিলেন আলোবাতাসের মতো। ছিলেন যে, সেটা টেরই পেতাম না। আমার বাবা মারা যান ১৯৬৫ সালে, মা গেলেন এই সেদিন, ২০১১ সালে। এই ছেচল্লিশ বছর তিনি কোনো ছেলে বা মেয়ের বাড়িতে থাকেন নি, একটানা দু’দিনের বেশি কখনো নয়। আমার বাবা ঢাকার লালবাগে ছোট একটা বাড়ি করেছিলেন, সেখানেই থাকতেন। ছেলেমেয়েরা তাঁর কাছে যেত, কেউ কেউ সঙ্গে থাকতো, তিনি কোনো একজনের ওপর নির্ভরশীল হওয়াটা পছন্দ করতেন না। অন্ততপক্ষে দুই ঈদে আমরা সবাই একত্র হতাম। তখন দেখতাম, আমাদের প্রত্যেকের জীবনে মা কিভাবে উপস্থিত রয়েছেন। অনেককাল ধরে আমি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মায়ের লালবাগের বাড়িতে গিয়েছি। যাওয়াটা ছিল নিয়মিত। না-যেতে পারলে ভীষণ খারাপ লাগতো। দু’বার আমি বিদেশে গিয়েছি, উচ্চশিক্ষার জন্য। দু’বারই দেশের যাঁদের কথা খুব করে মনে পড়েছে, অনুপস্থিতি টের পেয়েছি, তাঁদের মধ্যে এক নম্বরে থাকতেন আমার মা। মা শায়িত আছেন আজিমপুর গোরস্থানে, কিন্তু মনে হয় সঙ্গেই আছেন আমার।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের রান্নার কথা বলুন। তাঁর করা কোন্ কোন্ রান্না আপনার বিশেষ পছন্দের, অনুগ্রহ করে বলবেন কি?

উত্তর: আমাদের কালে মা’দের প্রথম ও প্রধান কাজই ছিল রান্নাবান্না করা। দিনের বড় একটা সময় তাঁদের কাটতো রান্না ঘরেই। আমার মায়ের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কাজের জন্য সহকারী একজন মহিলা ছিলেন; স্থায়ীভাবেই থাকতেন আমার মায়ের সঙ্গে, কিন্তু মূল কাজটা মা’কেই করতে হতো।
আমার মা পদ্মাপাড়ের মানুষ। তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও দক্ষতা ছিল ইলিশ মাছ রান্নাতে। কতভাবে যে রাঁধতেন। আলাদা করে ভাজতেন কখনো, কখনো থাকতো পোলাও-এর সঙ্গে। ঝাল কখনো, কখনো মিষ্টি। নারকেল দিয়ে রান্না করতেন। বিশেষভাবে মনে পড়ে, ইলিশ মাছ বসানো চিতোই পিঠা। ইলিশ মাছের পরেই ছিল ডিম। নানা রকমের। আস্ত, ভেঙে, ভেজে। তরকারির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে। পুডিঙের ভেতর। ভাঙা ডিমের কোরমা করে। শাকের সঙ্গে। দক্ষতা ছিল পিঠে বানানোতে। বিশেষ করে পাটিসাপটা। অমন নরম আর সুস্বাদু পাটিসাপটা আমি অন্য কোথাও খেয়েছি বলে মনে পড়ে না। আমরা শীতকালের জন্য অপেক্ষা করতাম পিঠার কাল আসবে বলে। মনে পড়ে, কিশোর বয়সে মা যখন বিশেষ কিছু রান্না করতেন আমাকে দিয়ে চাখিয়ে নিতেন। তার প্রধান কারণ আমাকেই কাছে পেতেন। দ্বিতীয় কারণ হতে পারে আমার পরীক্ষার ওপর আস্থা রাখতেন। ছেলেবেলায় জ্বর হলে, ছেড়ে যাবার পর, পথ্য দিতেন খলসে মাছের ঝোল। তার স্বাদ এখনো আমি ভুলিনি।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের কোন্ কোন্ গুণ আপনাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে?

উত্তর: আমার মা’য়ের অনেকগুলো গুণ ছিল। কোনোটাই অতিনাটকীয় নয়, কিন্তু সবগুলোই স্বাভাবিকভাবে প্রবহমান। সবচেয়ে বড় গুণ ছিল প্রচ্ছন্নতা। সংসারের সব কাজ করছেন, কিন্তু কখনো আত্মপ্রকাশ করছেন না, কাজকে ছাড়িয়ে বড় হয়ে উঠছেন এমনটা কখনো হয় নি। একেবারে শেষ বয়সে এসে, মাঝে মাঝে অসুখ হতো। মারা গেছেন ক্যান্সারে। শেষ বয়সটা ছাড়া রোগের কথা কখনো শুনিনি। সকলকে খাওয়াচ্ছেন, কিন্তু নিজে কখন খাচ্ছেন, সেটা দেখা যেতো না। আমাদের চোখে পড়তো না। তাঁর ছিল কর্তব্যপরায়ণতা। যে কাজ করার, ভালোভাবে করতেন। আমাদেরকে বেশ কয়েকবার বাসস্থান বদল করতে হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মা কিছুদিন গ্রামে ছিলেন; তারপর সংসার নিয়ে চলে গেলেন রাজশাহীতে, সেখান থেকে কলকাতায়, সাতচল্লিশে এসেছেন ঢাকায়। ঢাকায় এসে উঠতে হলো আত্মীয়ের বাড়িতে, সেখান থেকে ভাড়া বাসায়, তারপরে আজিমপুর কলোনীতে। শেষমেশ লালবাগে। এসবের ভেতর বাইরের এবং বড় কাজগুলো বাবাই করতেন, কিন্তু মা’র কাজটা ছিল বেশি কঠিন। তিনি ঘর সংসার গোছাচ্ছেন, নতুন পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন নিজেকে ও তাঁর সংসার যাত্রাকে, পরিচয় গড়ছেন নতুন মানুষদের সঙ্গে। এখন বুঝি, কাজগুলো মোটেই সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি সেগুলো করেছেন, এবং কখনো অভিযোগ করেননি। কেবল আজিমপুরে যখন এলেন, তখন বলতেন, মনে হয় জাহাজে চেপেছি। আমাদের আবাস ছিল তিনতলাতে। বিরক্তির সঙ্গে যতটা নয়, তারচেয়ে বেশি কৌতুকের সঙ্গে। আমার মায়ের একটা সুন্দর কৌতুকবোধ ছিল। যেটা প্রচ্ছন্ন থাকতো, শোরগোল করতো না। কার্যকর থাকতো কথাবার্তায়, কাজকর্মে। মনে পড়ে তাঁর সংবেদনশীলতার কথা। নিজের কথা বলতেন না, সকলের কথা শুনতেন। সকলেই তাঁকে নির্ভরযোগ্য মনে করতেন। আত্মীয়স্বজন, কাজের লোক, অতিথি-অভ্যাগত, সব রকমের মানুষ দেখা করতে আসতো, কথা বলতে ভালোবাসতো তাঁর সঙ্গে। একজনের কথা আরেকজনকে বলতেন না। বুঝতেন, প্রত্যেকটি ঘটনার পেছনে নির্দিষ্ট কারণ আছে। শ্রেণিবিভাজন মানতেন না। ছিলেন পুরোমাত্রায় গণতান্ত্রিক। তাঁর বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল গোয়ালিনীর মা’র সঙ্গে। আমাদের গ্রামের মানুষ, হিন্দু সম্প্রদায়ের। বিধবা মহিলা; ভাই-এর বাড়িতে থাকতেন। আদিতে গোয়ালার পেশায় তাঁরা যুক্ত ছিলেন, বোঝা যায় নাম থেকে। ভাইয়ের ছেলে কাজ করতো কাঠমিস্ত্রির, সংসার সেই চালাতো। আমার মা গ্রামের বাড়িতে গেছেন, খবর পেলে সবার আগে যিনি ছুটে আসতেন তিনি ওই গোয়ালিনীর মা। একবার তিনি আমাদের আজিমপুরের বাসাতেও এসেছিলেন, বেড়াতে। টিনভর্তি মুড়ি নাড়– সঙ্গে নিয়ে। মা’কে চুপি চুপি সাবধান করে দিয়েছিলেন, তাঁর ভাইয়ের ছেলেটি যেন টের না-পায় যে আমাদের রান্না তিনি খেয়েছেন।
আমি ঈর্ষা করি আমার মায়ের অতিথিপরায়ণতার। অতিথি পেলে খুশি হতেন, আপ্যায়ন করতেন সপ্রতিভভাবে। কখনোই অপ্রস্তুত হতে দেখিনি। ঘরে কিছু না-থাকলে হাতে তৈরি রুটি আর চিনি ধরেছেন সামনে, এমনও ঘটনা ঘটেছে। আমি ভাবি, আর অবাক হই। দুঃখ হয়, আতিথেয়তার গুণটা একেবারেই পেলাম না দেখে। ওই অতিথিপরায়ণতার গুণটা আসলে বড় একটা গুণের অংশ ছিল। সেটা হলো নেতৃত্বদানের ক্ষমতা। ওটা ছিল তাঁর স্বভাবজাত। ঘোষণা দিয়ে নয়, স্বাভাবিকভাবেই নেতৃত্ব দিতেন তিনি। আগবাড়িয়ে নয়, নিজের অবস্থানেই দাঁড়িয়ে থেকে। আমার পিতার মৃত্যুর পর থেকে তো অবশ্যই, তার আগেও টের পেতাম সংসারের হাল আসলে থাকতো মায়ের হাতেই। পিতার দায়িত্ব ছিল আয় ও আয়োজন করা। বাকিটা মাকেই সামলাতে হতো।
একাত্তরে মহাবিপদ ঘটেছিল। বাবা জীবিত নেই। ছেলেমেয়েদের মধ্যে যারা ঘর-সংসার ও চাকরি-বাকরি করছে, তারা থাকে এখানে ওখানে। ছোট কয়েকজন তাঁর সাথে। লালবাগে আমাদের বাড়িটা ছিল পীলখানার কাছে। রাতে প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়েছে, সকালে মানুষের আর্তনাদ ও ভীত সন্ত্রস্ত পলায়ন। মা একাকী। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নিয়ে দরজায় তালা দিয়ে ছেলেমেয়েসহ নদীপার হয়ে চলে গেছেন গ্রামের বাড়িতে। স্রোতের সাথে মিশে। সেখানে ঘরসংসার গুছিয়েছেন। এবং ঢাকা থেকে পরে যাঁরা গেছেন, তাঁদেরকে আশ্রয় পর্যন্ত দিয়েছেন।

প্রশ্ন: মাকে নিয়ে কোনো মর্মস্পর্শী বা অত্যন্ত আনন্দময় কোনো ঘটনা থাকলে বলুন।

উত্তর: আমার মায়ের এবং আমার নিজের জীবনেও প্রথম মর্মস্পর্শী ঘটনা আমার পিতার মৃত্যু। সে-সময়ে আমি দেশের বাইরে ছিলাম। কিভাবে সামলে উঠেছেন, দেখিনি। কিন্তু কল্পনা করি যে, ভেঙে পড়েননি। ভেঙে পড়বার অভ্যাস ছিল না, ভেঙে পড়ার সুযোগও ছিল না; অনেককিছুই তাঁকে সামাল দিতে হয়েছে।
কিন্তু তাঁর জীবনের মর্মস্পর্শী অন্য ঘটনাগুলোর আমি সাক্ষী। আমি দেখেছি একে একে তাঁর পিতা, মাতা, একমাত্র বোন, বড় দুই ভাই এবং সবশেষে সবচেয়ে ছোটভাইটি চলে গেলেন; চলে গেল তাঁর নিজের সন্তানদের একজন। প্রতিবারই দেখেছি তাঁর সহ্য করবার ক্ষমতা। ছোটখাটো মানুষটি আমার মা, বড় বড় বোঝা ছিল তাঁর কাঁধে, ঘটেছে ওইসব মৃত্যুর দুঃসহ যন্ত্রণা, কিন্তু সবক্ষেত্রেই মনে হয়েছে যেন দৃঢ় হয়ে উঠছেন, ভেতর দিয়ে।
আনন্দের? হ্যাঁ, আনন্দের অনেক ঘটনা আছে। তবে বড় নয়, সবগুলোই ছোটখাটো। দু’টি ঘটনার কথা বলি। আমি এম এ পরীক্ষা দিয়েই চাকরি পেয়েছিলাম মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে; শনিবার বিকেলে ঢাকা চলে এসে সোমবার সকালে ফেরত যেতাম। আমার এক আত্মীয় বললো, মুন্সীগঞ্জে যাতায়াত করো, মায়ের জন্য হাতে করে কিছু নিয়ে যেতে পারো না? মুন্সীগঞ্জে তো কলা বিখ্যাত, মিষ্টিও নামকরা। আমার খেয়াল ছিল না। পরের সপ্তাহে এক হাঁড়ি মিষ্টি (মিষ্টি তখন হাঁড়িতেই দিতো) এবং কিছু কলা নিয়ে গিয়েছিলাম। তাতে মায়ের হাসিটা এখনো মনে পড়ে। মা’র মনে হয় গর্ব হয়েছিল। তাঁর ছেলে উপার্জন করে উপহার নিয়ে এসেছে দেখে। আমার বয়স তখন অল্প, একুশ বছর। দ্বিতীয় ঘটনাটা একটু অন্যরকমের। পাস করার তিন বছরের মাথায় আমি ইংল্যান্ডে গিয়েছিলাম, পড়াশোনার জন্য। ফিরবো কখন আব্বা-আম্মা জানতেন। কিন্তু নির্দিষ্ট করে দিনক্ষণ জানাইনি, পাছে তাঁদের বিড়ম্বনা ঘটে বিমান বন্দরে হাজির হবার। এক সকালে একেবারে বিনা নোটিশে আমি বাসায় এসে হাজির। সেটা আমার জন্য আনন্দের বিষয় ছিল, আব্বা-আম্মার জন্যও। তাঁরা চমকে উঠেছেন। আব্বা অফিসে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, তিনি চলে গেলেন। মা ব্যস্ত হলেন আমাকে কি খাওয়ানো যায় তা নিয়ে। তাঁর সেই আনন্দটা আমি ভুলিনি।

প্রশ্ন: মায়ের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখবার ব্যাপারে আপনার কোনো ধরনের উদ্যোগ আছে কি? যদি থেকে থাকে, তাহলে পাঠকবৃন্দের সঙ্গে সেটা শেয়ার করার জন্য অনুরোধ জানাই।

উত্তর: না, তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। আমার মা বেঁচে থাকবেন তাঁর সন্তান, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদের স্মৃতির ভেতর। সেটা তাঁরও কাম্য ছিল।

প্রশ্ন: আপনার এবং ভাই-বোনদের জন্যে মায়ের ত্যাগ-তিতিক্ষার কোনো স্মরণীয় ঘটনা আছে কি?

উত্তর: আমার মা’র কাজ-কর্ম, উদ্বেগ-চিন্তা সবই ছিল তাঁর সন্তানদের কেন্দ্র করে। প্রত্যেকের কথা ভাবতেন। আশ্চর্য গুণ ছিল তাঁর যে, তিনি সকল সন্তানকে সমান ভাবে দেখতেন। সকলের কথা শুনতেন, নিতান্ত প্রয়োজনীয় মনে না করলে একজনের কথা আরেকজনকে বলতেন না। কারো অসুখবিসুখ হলে যত্নের অবধি থাকতো না। অথচ জীবনে অনেকবার শেষ প্রান্তে পৌঁছার আগে তাঁকে কখনো অসুস্থ হতে দেখিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমরা যখন গ্রামে ছিলাম, তখন অনেক ক’টি পরিবার গ্রামে এসেছিল। আমার ফুপাতো ভাই ছিল মুজিব, আমার সমবয়সী। ওই সময়ে তারাও থাকতো গ্রামে। সে একটা দৃশ্যের কথা প্রায়ই বলতো। শীতের সকালে উঠানের সাথে মেলানো রান্নাঘরে মা চিতোই পিঠা তুলে তুলে দিচ্ছেন, আমরা ভাইবোনেরা শীতের কাপড় গায়ে তাঁকে ঘিরে বসে আছি, যেন মুরগির ছানা কয়েকটি। মুজিব তাদের ঘরের জানালা দিয়ে দেখতো। বলতো, ভারি মজা লাগতো ওর। আমার মায়ের সন্তান-পালনের ওটিই ছিল স্থায়ী ছবি।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের দেওয়া কোনো বিশেষ পরামর্শ বা টিপসের কথা কী মনে পড়ে? তাঁর কোনো উল্লেখযোগ্য উক্তি কী আপনাকে তাড়িয়ে ফেরে?

উত্তর: পরামর্শ? না, পরামর্শের কথা মনে পড়ে না। সেভাবে দেনওনি। তবে দৃষ্টান্ত ছিল। সেটা হলো, যে কাজ করবে ভালোভাবে করবে। কোনো কাজ ফেলে রাখবে না। এবং কানকথা শুনবে না। আর ছিল তাঁর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবনটাই মনে হয় একটা পরামর্শ ছিল, আমার জন্য।
তিনি গল্প বলতেন। চমৎকার সব উক্তি করতেন। তাতে বৈদগ্ধ্য থাকতো। থাকতো অভিজ্ঞতা। একটা উক্তি খুব মনে পড়ে। সেটা হলো ‘রথ টানে না।’ অর্থাৎ চলতে আলস্য। অথচ সারাক্ষণ তিনি চলাচল করতেন। ঘরের ভেতরেই, এঘর থেকে ওঘরে অসংখ্যবার তাঁর হাঁটাচলা ঘটতো। আমি নিজে যে হাঁটতে খুব পছন্দ করি, সেটা মনে হয় মায়ের কাছ থেকেই পাওয়া।

প্রশ্ন: সন্তানের জন্যে মায়ের যে সামগ্রিক শ্রম, সাধনা এবং ত্যাগ, সেসবের স্বীকৃতি ও কৃতজ্ঞতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা আজকাল দেখি না। এ-ব্যাপারে আপনার পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ কী, দয়া করে বলবেন?

উত্তর: মায়ের স্বীকৃতি সমাজে অল্প হওয়াটা একটা সমাজবাস্তবতা। গোটা ব্যবস্থাটাই পিতৃতান্ত্রিক। পিতৃতান্ত্রিকতা ও পুঁজিবাদ একসঙ্গে যায়। বস্তুত, পুঁজিবাদ নিজেই পিতৃতান্ত্রিক। মা’এর যথোপযুক্ত স্বীকৃতির জন্য ব্যবস্থাটাকে বদলানো দরকার। চেষ্টাটা এখন পৃথিবীব্যাপী চলছে; আমাদের তার সঙ্গে যুক্ত হওয়াটা কর্তব্য।

সাক্ষাৎকার: হাসান হাফিজ