শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭
হোম / বিনোদন / আরশিনগর: রোমিও-জুলিয়েটের দরকারি ভার্সন
০১/২৬/২০১৭

আরশিনগর: রোমিও-জুলিয়েটের দরকারি ভার্সন

-

ইতালিতে রোমিও-জুলিয়েটের বিয়োগান্ত প্রেমের গল্প কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। সেটি অবলম্বন করে দেশটির লেখক মাতিয়ো বান্দেলো একটি উপন্যাস রচনা করেন। ১৫৬২ খ্রিস্টাব্দে বান্দেলোর সে উপন্যাস পড়ে ব্রিটিশ লেখক আর্থার ব্রুকস লিখলেন ‘দি ট্রাজিক্যাল হিস্ট্রি অব রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’। এর ত্রিশ বছর পরে, আনুমানিক ১৫৯৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে আর্থার ব্রুকস পড়ে শেকসপিয়ার রচনা করলেন জগদ্বিখ্যাত বিয়োগান্ত নাটক রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট। শেকসপিয়ার রচিত শ্রেষ্ঠ নাটক এটি না হলেও সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুলপঠিত।

নাটকের গল্পে দেখা যায়, রোমিও আর জুলিয়েটের পরিবারের মধ্যে শত্রুতার সম্পর্ক ছিল। দু’টি ভিন্ন পরিবারের পূর্ববর্তী রেষারেষি, বংশীয় অহংকার ভেদ করে দুই তরুণ-তরুণী প্রথম দর্শনে প্রেমে পড়ে যায়। পরবর্তীকালে পরিবারের শত বাধা উপেক্ষা করে নানা নাটকীয়তার মাঝে তারা বিয়ে করে। সবশেষে, দুই পরিবারের শত্রুতার জেরে এবং ভুলবোঝাবুঝিজনিত কারণে বিষপানে আত্মহত্যা করে এই প্রেমিকযুগল। পরে তাঁদের মৃত্যু শত্রুভাবাপন্ন দুই পরিবারকে একত্রিত করে। তাই পৃথিবীতে যখনই প্রেমের জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা বলা হয়, সবার আগেই উঠে আসে এই তরুণ যুগলের নাম!

বিশ্বচলচ্চিত্রে প্রেম ও বিচ্ছেদের আর্কেটাইপ হিসেবে ব্যবহার করা হয় রোমিও এবং জুলিয়েটের প্রেমকাহিনি। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই রোমিও-জুলিয়েটের প্রেমকাহিনি অবলম্বনে এক বা একাধিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, সবচেয়ে বেশি মঞ্চায়িত এবং চিত্রায়িত নাটক হলো রোমিও এবং জুলিয়েট। একেক দেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী বিনির্মিত হয়েছে রোমিও এবং জুলিয়েটের বাস্তবতা।

হলিউডে প্রথম নাটটি চিত্রায়িত হয় নির্বাক যুগে। এরপর ১৯২৯ সালে শব্দযোগে নির্মিত হয়। তারপর হলিউডে ১৩২৬, ১৯৬৮, ১৯৯৬ সালে ফের সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি হয় ছবিটি। ১৯৯৬ সালের ভার্সনে অভিনয় করেন লিওনার্দো দি ক্যাপ্রিও ও ক্লেয়ার ডেনস। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যবসাসফল হয়েছে এটি। এ তো গেল অরিজিনাল রোমিও-জুলিয়েটের গল্প। এই অমর প্রেমগাথার ছায়া অবলম্বনেও নির্মিত হওয়া চলচ্চিত্রের সংখ্যা অসংখ্য।

বলিউডেও রোমিও এবং জুলিয়েটের প্রেমকাহিনির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব নিয়ে নির্মিত হয়েছে রাম-লীলা ও ইশাকজাদের মতো বেশ কিছু চলচ্চিত্র। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি কলকাতায় নির্মিত হয়েছে আরশিনগর ছবিটি। পরিচালক অপর্ণা সেন। একদিকে শেকসপিয়ার অন্যদিকে অপর্ণা সেন, এ-কারণেই এত আগ্রহ। অপর্ণা সেন এই মুহূর্তে দুই বাংলা মিলে তো বটেই গোটা ভারতেই প্রথম সারির নারীনির্মাতা। তার ‘৩৬ চৌরঙ্গি লেন’, ‘পরমা’, ‘মি. অ্যান্ড মিসেস আয়ার’, ‘১৫ পার্ক অ্যাভিনিউ’, ‘পারমিতার একদিন’, ‘জাপানিজ ওয়াইফ’, ‘গয়নার বাক্স’ চলচ্চিত্রগুলো ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

এরই ধারাবাহিকতায় অপর্ণা নির্মাণ করলেন রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েটের বাংলা ভার্সন ‘আরশিনগর’। মুক্তি পেল গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর। মোটামুটিভাবে শেকসপিয়ারের ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’ নাটকের আর্কিটাইপ বিষয়গুলোতে তিনি এই ছবিতে নিয়ে এসেছেন। মোটা দাগে, দুই পরিবারের শত্রুতা, পরিবার দুটোর তরুণ-তরুণীর প্রেম। প্রেমের ক্ষেত্রে ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’, লুকিয়ে বারান্দা টপকে দেখা করতে যাওয়া, দুই পরিবারের মেনে না নেয়া। অবশেষে প্রেমিক-প্রেমিকার মৃত্যুর পর দুই পরিবারের একত্রিত হওয়া-এসবই আরশিনগরে আছে, যেমনটি আছে রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েটেও। এখন প্রশ্ন হলো, অপর্ণা তাহলে আলাদা হলেন কোথায়? সেই আলাদা বিষয়টিই এখন চিহ্নিত করার বিষয়।

‘বাড়ীর পাশে আরশিনগর, সেথায় একখান পড়শি বসত করে।’ লালনের এই গানটি দিয়ে ছবিটির শুরু। একজন নারী মূলত এই ছবির গল্পের ন্যারেটর। তিনি পুতুল নাচ দেখাচ্ছেন আর এক একটা পুতুল চরিত্রের গল্প বলছেন। সেই চরিত্রগুলোই এই ছবির পাত্র-পাত্রী। শেকসপিয়ার এই জগৎকে একটি নাট্যমঞ্চের সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, আমরা প্রত্যেকে এই নাট্যমঞ্চের কুশীলব। মোটামুটি শেকসপিয়ারের সেই অমোঘ বাণী ধরেই এগিয়েছেন অপর্ণা। মানুষের আড়ালে যে পুতুল, সেটিকে তিনি সামনে এনেছেন, তারপর আবার আড়ালে চলে গেছেন।

শেকসপিয়ারের রোমিও-জুলিয়েট অপর্ণার হাতে হয়েছে রণজিৎ মিত্র-জুলেখা খান। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তারা অন্য এক বাস্তবতার শিকার। হিন্দু-মুসলিম প্রেমের সম্পর্ক কোনোদিনই ভারতীয় সমাজ মেনে নেয়নি। ভারতীয় ইতিহাসে শুরু থেকে আজ অবধি একই চিত্র। অপর্ণা সেটা বুঝিয়েছেন তার গল্পের ভেতর দিয়ে। রণজিতের মা আর জুলেখার বাবা প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। গভীর সে প্রেম শেষপর্যন্ত দুই পরিবারের বাধার মুখে পরিণতি পায়নি। তাদের পরের প্রজন্ম এসে একই ‘ভুল’ করে। এবং এক্ষেত্রেও এক সময় হিন্দু নারীর সঙ্গে প্রেম করে সংসার-সমাজ ত্যাগে প্রস্তুত হওয়া জুলেখার বাবা বেঁকে বসলেন। তিনি আর তখন ব্যক্তি হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না। সমষ্টির প্রতিনিধি হয়ে উঠলেন।

অপর্ণা শুধুমাত্র দু’জন নর-নারীর গভীর ভালোবাসা তুলে ধরতে শেকসপিয়ারে হাত দেননি। তার উদ্দেশ্য আরো মহৎ। তিনি ভারতে যে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সেটির দিকে আঙুল তুলেছেন। এবং এক্ষেত্রে প্রেমই যে হতে পারে একমাত্র সমাধান, তাই তিনি বলতে চেয়েছেন। এজন্যে ত্যাগও প্রয়োজন, সেই ত্যাগটি করেছে আরশিনগরের রণজিৎ মিত্র-জুলেখা খান।

ভারতসহ বাংলাদেশেও আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো বস্তি উচ্ছেদ। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লোভী নজরে পড়ে অনেক বস্তি রাতারাতি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সেখানে বিশাল বিশাল ভবন উঠেছে। বস্তির বাসিন্দারা কোথায় গেছে, কীভাবে আছে তার ইতিহাস কেউ জানতে পারেনি। এই ছবিতে আরশিনগর একটি কাল্পনিক বস্তির নাম। বস্তিতে হিন্দু-মুসলিম দুই ধর্মের মানুষই বাস করে। বস্তির পাশে দুটি সম্ভ্রান্ত পরিবার হলো মিত্র আর খান। সাপে নেউলে সম্পর্ক এই দুই পরিবারের ভেতর। তারা বস্তির লোকজনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। আর গোপনে বস্তি দখল করে প্লট বিক্রির পাঁয়তারা করে। রণজিৎ মিত্র আর জুলেখা খানের ‘লাভ এ্যাট ফার্স্ট সাইট’-এর চেয়ে খুব সিরিয়াস বিষয় এটি। কিন্তু সেটি সরাসরি বলার চেয়ে অপর্ণা শেকসপিয়ারের এই জনপ্রিয় নাটকটিকে মোড়ক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

অপর্ণা শেষ পর্যন্ত আশাবাদের ভেতর দিয়ে ছবিটি শেষ করেছেন। নিজেদের তৈরি দাঙ্গায় মিত্র আর খান পরিবার তাদের সন্তানদের হারায়। প্রেমের জন্য জীবন দেয় রণজিৎ মিত্র ও জুলেখা খান। এরপর তাদের মৃত্যুতে এক হয় দু'টি পরিবার। পাশাপাশি দু’দল শববাহী জনতা হেঁটে যায়। একদল শ্মশানে, অন্যদল কবরস্থানে। মাথায় তাদের জুলেখা-রণজিতের লাশ।

অপর্ণা বরাবরই বক্তব্যপ্রধান গল্প নিয়ে সিনেমা করেন। এক্ষেত্রে তিনি যেটি করলেন, তার জন্যে আলাদাভাবে ধন্যবাদ পাবেন এই কারণে যে, সম্প্রতি নতুন করে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক ভারত এবং বাংলাদেশে নতুন সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলাপ দরকার। সবগুলো শিল্পমাধ্যম ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পথ বাতলে দেয়া প্রয়োজন। সেই কাজটিই তিনি করার চেষ্টা করেছেন।

অপর্ণা সবাইকে অবাক করে নায়ক হিসেবে বেছে নিয়েছেন কলকাতার জনপ্রিয় বাণিজ্যিক হিরো দেবকে। নায়িকা হিসেবে নির্বাচন করেছেন ‘বরবাদ’ ছবির অল্পবয়সি নায়িকা ‘ঋতিকা সেন’কে। নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করেছেন ‘যীশু সেনগুপ্ত’। বাবা চরিত্রে অভিনয় করেছেন শঙ্কর চক্রবর্তী ও কৌশিক সেনগুপ্ত। মায়েদের চরিত্রে অভিনয় করেছেন অপরাজিতা, রূপা গাঙ্গুলি ও জয়া সিল ঘোষ। আর দাদি চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিখ্যাত অভিনেত্রী ওয়াহিদা রহমান। অপর্ণা নিজের মতো করে তৈরি করে নিয়েছেন চরিত্রগুলোকে। কেউ ব্যর্থ হয়েছেন, সেটা মোটা দাগে বলা যাবে না।

মুভির সিনেমাটোগ্রাফি মোটামুটি ভালো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মুভির সেট, ডিজাইন ও ক্যামেরার কাজে মঞ্চের ছোঁয়া আছে। অপর্ণা হয়ত ইচ্ছে করে সেটা করেছেন। ‘আরশিনগর’ মূলত মিউজিক্যাল ড্রামা। ২০১২ সালে টম হুপার ভিক্টোর হুগোর ‘লা মিজারেবল’-এর মিউজিক্যাল ভার্সন যেভাবে তৈরি করেছিলেন, অনেকটা সেইভাবে। যে কারণে আরশীনগরে ডায়ালগের অন্ত্যমিল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রেমের দৃশ্য, রাগের দৃশ্য, কথা কাটাকাটির দৃশ্য, সবখানেই ডায়ালগে ছন্দ আছে। ফাইট দৃশ্যে প্রতীকী নাচ-গান জুড়ে দেয়া হয়েছে। ছবিতে ক্লাসিক-মডার্ন ফিউশনে ১২টি গান আছে। ব্যবহার করা হয়েছে কাওয়ালি ও বাউলসংগীত। সংগীত পরিচালনা করেছেন দেবজ্যোতি মিশ্র।

মুভিটি সবার কাছে ভালো নাও লাগতে পারে। বিশেষ করে অপর্ণার আগের মুভিগুলো যাদের ভালো লেগেছে, তাদের ‘আরশিনগর’ ভালো লাগবেই, এমনটি বলা যাচ্ছে না। অপর্ণা এখানে অনেককিছু নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। মুভিটি ডার্ক টোনে বানানো হয়েছে, ডায়ালগে ভিন্নতা, সেটে মঞ্চের প্রভাব, এগুলো ভারতীয় ট্র্যাডিশনাল সিনেমার অভ্যস্ত দর্শক ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। তার প্রমাণ ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে খুব একটা সফল হয়নি। আবার খুব যে ব্যর্থ হয়েছে, সেটিও বলা যাচ্ছে না। ২.৫ কোটি বাজেটের সিনেমাটি প্রথম দশদিনে আয় করেছে ১.৯৫ কোটি রুপি।