বুধবার,১৬ অগাস্ট ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ভিক্ষুক এবং অতঃপর
০১/১৮/২০১৭

ভিক্ষুক এবং অতঃপর

- সালেহা চৌধুরী

সুর্য একজন জ্বলজ্বলে ছেলে। এত সব ভাবনা ওর মাথার ভেতরে কাজ করে ও রাতে ঘুমাতে পারে না। প্রথম ভাবনা - আমরা দেশটা কবে আরো সুন্দর হবে। যেমন সে দেখে পশ্চিমের দেশ। দেখে ছবিতে, টেলিভিশনে, সিনেমায়, বইতে। এখনো বিদেশে যাওয়া হয়নি। বাবা মোহসিন ছোট খাটো একটা কাজ করেন। কোন এক বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ছোট একজন কেরাণি। যিনি একটি মাত্র পুত্রকে নিয়েও টেনেটুনে সংসার চালান। স্ত্রী মরিয়ম বি এ পর্যন্ত পড়েছিল। পাশ করেনি। বি এ পাশ হলে সেও না হয় সংসারের হাল ধরতো। আরো একটা ছোটখাটো কেরাণির কাজ সংগ্রহ করতো। সেটা হয়নি। গল্পের বই পড়ে। স্বামীকে বলে লিখতে। তিনি লেখেন। কিন্তু তেমন কোন বিখ্যাত কাগজে তাঁর লেখা ছাপা হয়না। মরিয়ম বলে - যেমন তোমার মুরোদ, তেমন জায়গাতেইতো তোমার লেখা ছাপা হবে। ‘ঊষাকাশে’ একটা গল্প ছাপা হলে তবেই না জাতে উঠতে পারতে। মোহসিন সাহেব স্ত্রীর এসব মন্তব্য শোনেন কিন্তু কী করবেন ‘উষাকাশ’ নিজেদের চেনাজানা লোক ছাড়া গল্প ছাপে না। ঊষার আকাশ বলে কথা। ওর সকলের গল্প ছাপাবে কেন? কেউ কেউ বলে সাহিত্য সম্পাদকের পকেট ভারি কর, তারপর ছাপা হবে। ছোটখাটো কেরাণি মোহসিন সেটা করতে চায়নি। সুর্য তেরো বছরের ছেলে। আর একমাস পরে চৌদ্দ হবে। মাথা ভর্তি দেশ উন্নতি করবার আইডিয়া।

একদিন বন্ধু তপুকে বলে সূর্য - জানিস রে তপু বিদেশে মানে পশ্চিমে কোন ভিখারী নেই। আর দেখ আমাদের দেশে? পথে, ঘাটে, দোকানে, রাস্তায় ভিখারী। তারা আবার যেই অঙ্গ খারাপ সেটাকেই ক্যাপিটাল বানায়। খোঁড়া হলে পা আগে দেখায়, কানা হলে চোখ, একজনের পেট যদি বড় হয় সে আগেই পেট দেখায়। মাথায় যদি বড় একটা আব থাকে সেটা দেখায়। আর না হলে ভাণ করে সে আসলে ভিক্ষা ছাড়া আর কিছু করতে পারে না।

তুই কী বলতে চাসরে সূর্য! ভিক্ষা করবে না ওরা?
বিদেশে যদি ভিখারী না থাকে তাহলে আমাদের দেশে কেন থাকবে?
আমরা কী আমেরিকা না ইউরোপ রে সূর্য?
তবু আমাদের উচিত নয় ওদের এনকারেজ করা। সরকার একটা বড় বাড়ি বানিয়ে সবগুলোকে সেখানে রাখতে পারেন।
তুই সরকার হলে কী করবি?
আমি? যে ভিক্ষা করবে তাদের মেরে ফেলবো।
তাহলে দুইদিনেই তোর সরকার শেষ।
আমি দেশটাকে পরিস্কার করবো। যারা তাদের কানাচোখ আর ভাঙ্গা পায়ের ক্যাপিটাল দেখিয়ে ভিক্ষা করবে তাদের ----। এই বলে থামে সূর্য।
মেরে ফেলবি?
জানি না।
সূর্য নিজের ঘরে পড়ছে। মা মোহসিনা বলেন - এই তোর সাদেক দুলাভাই ফোন করেছেন।
সাদেক বিরাট বড় ব্যবসা করেন। ওদের এক দূর সম্পর্কের মামাতো বোনের স্বামী। এই বাড়িতে সাদেক খানের টাকা পয়সা নিয়ে প্রচুর গল্প হয়। সাদেক খান যে ওদের আত্মীয় সে কথা বলতেও সুখ। মোহসিনা মাঝে মাঝে সাদেক বাবাজির সঙ্গে স্বামীর তুলনা করে কষ্ট পায়।
কী খবর দুলাভাই?
কী খবর? আমি কিছুদিন আগে জাপান থেকে একটা মজার জিনিস এনেছি দেখতে এসো।
কী মজার জিনিস?
এলেই দেখাব।
সাদেক খান সূর্যকে খুব পছন্দ করে। নিজের ছেলেমেয়েরা যে যার মত। বাবার ইন্টারেস্ট নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যথা নেই। কাজেই এই সূর্যের সঙ্গে সাদেক খান যা শেয়ার করতে পারেন তা আর কারো সঙ্গে পারেন না। একজন পঁয়তাল্লিশ। একজন তেরো চৌদ্দ। এখন তারিখ ডিসেম্বরের বারো। উনিশ হলেই ও চৌদ্দতে পড়বে। বেশ একটু ম্যাচিয়ুর ব্যাপার আছে সুর্যের মধ্যে। স্ত্রী বানুকে তিনি একদিন বলেছিলেন।
কী দুলাভাই। আমি সেই জিগাতলা থেকে তোমার এই রাজপ্রসাদে এলাম নানা কষ্ট করে। মা গেছেন ছবি খালার বাড়ি। বাবা বলেছেন সন্ধ্যার সময় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে তাঁর কাজের জায়গায় যেতে হবে। সেখান থেকে বাবা নাকি কোথায় যাবেন। তারপর বাড়ি। তাড়াতাড়ি যা দেখাবার দেখান।
আসো আসো আমার বুদ্ধিমান শ্যালক প্রবর। দেখ এবার কী এনেছি জাপান থেকে। ভাগ্যিস লাইসেন্স ছিল।
আপনি কী বলতে চান দুলাভাই আপনি আর একটি বন্দুক এনেছেন?
ঠিক তাই। একেবারে ম্যাজিকের পিস্তল। নাম ‘মাক্সিম ৯’। সাইলেন্সার আর হেডগান একইসঙ্গে লাগানো। বিশটা গুলি খরচ করবার পর আবার সাইলেন্সর ফিট করতে হয়।
বিশটা? দুলাভাইয়ের গোপন ঘরটা সূর্র্য জানে। একেবারে চোরা কুঠুরি। দুলাভাইএর সখ বন্দুক, পিস্তল জমানোর ঘর। কিছুদিন আগে একটা ‘ওয়েলরড’ পিস্তল কিনেছিলেন। এখন কিনে এনেছেন ‘মাক্সিম ৯’। প্রচুর টাকা খরচ হয় তাঁর এইসবে। তিনি মাঝে মাঝে শিকারে যান। এ ছাড়া এ গুলো কোন কাজে লাগে না। তবে শিকারের বন্দুক আলাদা। সেগুলো ‘ক্লোজ রেঞ্জ’ পিস্তল নয়।

দুলাাভাই দেখা হলে বলেন - জানো সূর্য এই ‘মাক্সিম ৯’ কেবল জাপানে কিনতে পাওয়া যায়। ছোট খেলনার মত জিনিসটা কিনতে পেরে মনে হলো আমার সংগ্রহে যা আছে বাংলাদেশের আর কারো সংগ্রহে তা নেই।
পপি আর বাচ্চুভাইতো এগুলো চায় না।
পপি কবি হতে চায়। বাচ্চু নাচিয়ে। ওরা এইসব কামান বন্দুক দিয়ে কী করবে বল?
সুর্য তাকিয়ে দেখে দুলাভাই সেই ঘরের চাবি তাঁর নিজের ঘরে বেডসাইড টেবিলের নিচের ড্রয়ারে একটা পুরণো সিগারেটের টিনে রাখেন। দুলাভাই বলেন - খাও দাও। থাকো। আমি এখন সিলেটে যাব। নতুন গার্মেন্ট কারখানা খুলছি সেখানে। তুমি থাকো। মিঠাই তোমাকে কত খাওয়ায় দেখ। মিঠু নামের আপুকে দুলাভাই ডাকেন মিঠাই।
তোর বাপটা কাজেকর্মে উন্নতি করতে পারছে না কেন বলতো?
বাবা সময় পেলেই গল্প লেখেন। বই করবেন। একশোটা গল্প শেষ হলেই বই। মা বলেন ‘উষাকাশে’ তোমার গল্প ছাপেনা তোমার কোন জাত নেই।
বাবা বলেন - ছাপাবেন একদিন। মায়ের কথা শুনে বাবার মুখটা কেমন কালো হয়ে যায়।
ওই শালা সম্পাদক সবাইর লেখা ছাপায় না। মোটা গোঁফ আর পেশি সর্বস্ব একটা আকাট। নতুন একটা অফিস করেছে বারিধারায়। ভাবখানা এই বারিধারায় অফিস বানিয়ে তিনি মহাজাতে উঠে গেছেন। যাকগে যে যেমন। ওসব নিয়ে ভাবিস না। স্ত্রীকে ডাক দেন - মিঠাই ওকে পেট পুরে খাইয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেবে।
দুলাভাই তোমারতো মোটা গোঁফ আছে?
আমি কী ওই শালার মত। দুলাভাইএর কথা শুনে মনে হলো তিনিও গল্প পাঠিয়েছিলেন, ছাপা হয়নি। মিঠুআপু বলেছিলেন এমন কোন কথা। তিনিও পাঠিয়েছিলেন মিঠুআপুকে ইমপ্রেস করতে। কিন্তু গল্পটা ছাপা না হলেও তাদের বিয়ে হয়ে গেছে।
দুলাভাই চলে গেলেন। সূর্য এবার চুপচাপ দুলাভাইয়ের চোরা কুঠরিতে আসে।

প্রথম ফকিরটা বসে ছিল ব্রিজের নিচে। একটা ঠেলা গাড়ি ওকে এখানে ওখানে নিয়ে যায়। ও সারাক্ষণ শুয়ে থাকে। মুখ দিয়ে অদ্ভুত আওয়াজ করে। ওকে নিয়ে ব্যবসা করে মানুষ। সুর্যের হাতে একটা শক্ত বাজার করা ছালার ব্যাগ। সেখানে পালংশাক। মিঠুআপুর রান্নাঘর থেকে নিয়েছিল সূর্য। দুলাভাই ফেরার আগেই ‘ম্যাক্সিম ৯’ তাঁকে ফেরত দেওয়া যাবে। নিঃশব্দে একটা গুলি খরচ করে সেই ঠেলাগাড়ির ফকিরের যন্ত্রনার অবসান করলো সূর্য। কিছু মানুষের ‘বিজনেস ক্যাপিটাল শেষ’। কেউ জানলো না। যখন জানবে তখন সুর্য় আশেপাশে থাকবে না। পরের জন নারী। একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার মোটা গদার মত পা ঠেলে সে আবার গিয়ে বসবে বাংলা এ্যাকাডেমির সামনে। কাছে বসে তাকে একটা গুলি উপহার দিল সূর্য। শব্দ নেই। কেউ জানলো না। কষ্ট? না সূর্যের কোন কষ্ট হয়নি। মনে হয়েছে সে নরক থেকে ওদের উদ্ধার করলো। কারণ মহিলাটি শেষ ঘুমের আগে বলে উঠেছিল কিনা - জীবনটা বাঁচাইলা কে তুমি বাপজান? এরপরের জন বালক। কারা যেন তার অন্ডকোষকে বিশেষ ভাবে একটা অন্য অঙ্গে পরিনত করেছে। ভয়াবহ সে দৃশ্য। আর ছেলেটি লুঙ্গি তুলে সেটাই বার বার দেখায়। একসময় গাছের নিচে বসে একটু ছেঁড়া রুটি খেতে শুরু করেছে। সূর্য ওর অন্ডকোষে নিঃশব্দে একটি গুলি রেখে চলে এলো। তারপর জায়গা বদল। এবার সূর্য এলো অন্য এলাকায়। পৃথিবীর কারো মনে কোন প্রকার সন্দেহ নাই সূর্য নামের তেরো বছর এগারো মাসের ছেলে এসব করছে। সে ঢাকাকে ভিখারী মুক্ত করবে। এবং পারলে সারা দেশ। এরপর দুইজনকে গুলি করলো একসঙ্গে। একজন অন্ধবুড়ি ভিক্ষার ফাঁকে একটু জিরিয়ে নিয়ে দুটো শুকনো রুটি বের করেছে খাবে বলে। একজন আট নয় বছরের ভিখারী ছেলে খপ করে রুটি দুটো ওর থালা থেকে তুলে নিল। সুর্য চুপচাপ দুজনকে গুলি করে সরে পড়লো। চোর ভিখারী আর অন্ধ ভিখারী পাশাপাশি শুয়ে রইলো।
এরপর গেল আর একদিকে। ছালার ব্যাগ। পালংশাক মুখ বের করে আছে। তলায় আছে দুলাভাইয়ের জাপান থেকে আনা - ‘ম্যাক্সিম ৯’। সাইলেন্সর লাগানো। বিশটা গুলির পর আর সাইলেন্সর কাজ করে না।
আরো কয়েকজন মরনঘুমে ঢলে পড়লো। ও দেখলো গোনাগুনিতিতে দশজন আজকের অভিযান শেষ। ঢাকা শহর তখনো জানে না সূর্য নামের এই ছেলে কী করছে। দুলাভাই আসবেন আগামীকাল সন্ধ্যায়। দরকার হলে অভিযানে আবার সে বেরিয়ে পড়তে পারে। সন্ধ্যার আগেই ও চুপচাপ পিস্তল টাকে তাঁর গোপন ঘরে রেখে আসতে পারবে। বাঁকি যাদের সে মেরেছে তারাও হাত পা ভাঙ্গা, অন্ধকানা বোবা ভিখারী। যাদের একদল লোক ব্যবসা করায়। না হলে তারা নিজেরা বাঁচবার জন্য করে। সুর্য ঠিক বুঝতে পারে না এদের কয়জনকে ব্যবসা করানো হয় আর কয়জন নিজেরা বাঁচবে বলে এ পথে এসেছে। এবং তারা কোনদিনই এ চাকরি ছাড়বে না।

বাবা বললেন - এত দেরী যে সূর্য?
চল কোথায় যেতে হবে। কেমন একটু অন্যরকম স্বরে সূর্য বলে। - কোথায় আবার? উষাকাশে। সম্পাদক আ সা আ ম খাদেমুল খাদেমর সঙ্গে দেখা করতে যাব। একজন সময়টা ঠিক করেছেন। তোর মা ‘উষাকাশে’ লেখা ছাপা হয় না বলে আমাকে মানুষ বলেই মনে করে না। ইজ্জত নিয়ে টানাটানি।
বাবা বললেন - তুই এই চেয়ারটায় বসে থাক। আমি আ সা আ ম খাদেমুল খাদেমের সঙ্গে দেখা করি।
বেশ খানিক সময় বসে আছে সূর্য। ওই ঘর থেকে কয়েকজন চলে গেলেন। বোধকরি বাবা এখন একা। সূর্য চুপ করে দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। দেখতে পায় - বাবা হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছেন। যেমন করে ভিখারিরি অনেকসময় ভিক্ষা চায়। - স্যার গল্পটা না ছাপা হলে আমার ইজ্জতই থাকবে না।
হুঁ। খাদেমুল খাদেম বাবার দিকে একবার তাকান। তারপর বলেন - আপনি নাকি আমার সাহিত্য সম্পাদককে ফোন করে বিরক্ত করেন।
স্যার! এটা একটা ইজ্জতের ব্যাপার। আমার স্ত্রী এটা ছাপা না হলে আমাকে তালাক দিতে পারেন। বাবার গলা প্রায় কান্না কান্না। তিনি ভিখারীর মত হাত জোর করে দাঁড়িয়ে আছেন। আর অনুনয়ে নুয়ে পড়ে কাতর গলায় কথা বলছেন। আজ যতগুলো ভিখারী মেরেছে তাদের মধ্যে বাবাকে সবচেয়ে বড় ভিখারী মনে হয়। কারণ বাবার হাত আছে, পা আছে, চোখ আছে, ট্রাউজারের নিচে সুস্থসবল অন্ডকোষও আছে। তবু তিনি এমন করে কথা বলছেন মনে হয় ওই লাইনে গেলে বাবা সাইন করতেন। খাদেমুল খাদেম - গোঁফ পাকান। তার পেশিবহুল হাতদুটো টাক মাথার পেছনে তোলেন। বলেন - আপনার বাড়ি বগুড়া না? বগুড়ার দৈ খাওয়ালেন না একদিন।
এটা কোন কথা হলো? কালকেই আনবো।
তিনি বলেন - এবার আসুন। খবর এসছে কে যেন দশজন ভিখারীকে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলে খুন করেছে। কে রে বাবা এমন ‘এথনিক ক্লিনসিংএ’ লেগেছো।
স্যার? আবার ভিখারীবাবা হাত জোর করেন। এই খবরে তার কিছু এসে যায় না। দশ জন ভিখারী গেছে। তাতে কী? তাঁর গল্প ‘পারুলের প্রেম’ কবে ছাপা হবে সেটা জানা অনেক বেশি জরুরি। জোর হাতে বাবা। কাতর ভাবে খাদেমুল খাদেমের দিকে তাকিয়ে আছেন।
আসুন। আসুন। খাদেমুল খাদেম ফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলতে শুরু করেন। কান্নাকাঁপা গলায় বাবা বলেন - সালামআলেকুম স্যার।
সারা পথ সূর্য বাবার সঙ্গে কোন কথা বলে না।
বাবা অফিসে ফিরে এসেছেন। বস তাঁকে তলব করেছেন।
সূর্য আবার চুপচাপ বাবাকে দেখে। বাবা তেমনি হাত জোর করে দাঁড়িয়ে আছেন বসের সামনে। নানা সব সত্য মিথ্যা বলছেন। বলছেন - ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। এই চাকরি গেলে তাঁকে ভিক্ষা করতে হবে। তার ভাষা যে কোন ভিখারীর চাইতেও করুণ। সূর্য বাবাকে দেখে। এমন বাবাকে ও আগে দেখেনি। বস বলেন - আমি কাল বলবো। কী হবে আপনার। বাবা এগিয়ে যান টেবিলের নিচে বসের পা ধরতে। বস বলেন - এখন যান কাল কথা হবে। তিনি ঠিক চান না মোহসিন সাহেব এমন কিছু করুক। তিনি লোক খারাপ নন। তবে অফিসের নিয়ম বলে তো কথা। হঠাৎ অফিস ফেলে কাউকে কিছু না বলে বাবা চলে যাবেন আর সেটা তিনি মেনে নেবেন তা কি করে হয়। এ অফিস শেষ হয় সাতটায়। বস প্রায় রাত দশটা পর্যন্ত কাজ করেন। তিনি আশা করেন অফিসের বাঁকি লোকজনও তাই করবে।
আরো কিছুক্ষণ স্টাচুর মত হাতজোড় বাবা দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর দরজা দিয়ে বের হবেন ঠিক করেন।
বাড়িতে আসতেই সূর্য দেখে গ্রাম থেকে বাবার বুড়ো চাচা এসেছেন। গরীব মানুষ। মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। বাবার কাছে সাহায্য চান। বাবা তাঁকে মাঝে মাঝে টাকা পাঠান। তিনি মাঝে মাঝে আসেন। বলেন হাত জোর করে - ভিক্ষা দিক্ষা করে কিছু টাকা নিয়ে যেতে আসছি রে বাপজান। তুমি কিছু দাও। আল্লাহ তোমার ভালা করবো বাবা মোহসিন। বাবা কিছু বলেন না। কেবল চেয়ে দেখেন। তার দাড়ি ওয়ালা বুড়ো চাচা কেমন হাত জোর করে ভিখারীর মত তার কাছে সাহায্য চাইছে। আগামী কাল তার নিজের কী হবে তিনি জানেন না। সূর্য ও দেখে। দেখে তাঁর ভিখারী দাদাকে। সূর্য ঠিক এইভাবে এতদিন মানুষ দেখেনি। সে দেখে যাদের সে শেষ করেছে তাদের চাইতেও কত করুণ এদেন ভিক্ষা করা। সূর্য তাকিয়ে দেখে। আর দেখে।

রাতে বাবা ভিক্ষা চান মায়ের কাছে। মা যেন তাঁকে ছেড়ে চলে না যায়। খুব তাড়াতাড়ি তাঁর গল্প ‘উষাকাশে’ ছাপাবে এমন কথা বলেন। বলেন - তুমি আর একটু অপেক্ষা কর আমার গল্পটা ঠিকই ‘উষাকাশে’ ছাপা হবে। বাথরুমে যেতে যেতে সে কথা শোনে সূর্য।
মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে একটা নোট লেখে সূর্য। তার আগে তাকিয়ে দেখে খাটের নিচে সেই বাজার করবার ব্যাগ, পালংশাক আর শাকের নিচে ‘ম্যাক্সিম ৯’। ও লেখে ‘আমি সূর্য। দশজন ভিখারীকে আমিই মেরেছি। আর যাদের মেরেছি তারা সকলেই প্রায় বলেছে - মাইরা প্রাণটা বাঁচাইলা। নরক থেকে উদ্ধার বোধকরি একেই বলে। কিন্তু ঘটনা এই আমাদের দেশে ও সমাজে এত সব ভিখারী সেটা ঠিক আমার জানা ছিল না। দেখলাম এই সমাজে একজন মানুষ বাঁচার জন্য, সামান্য কারণে, দিনে দিনে কেমন করে ভিখারী হয়ে যায়। এবং সে নিজেও জানে না সে ভিখারী হয়ে গেছে। সবাইকে মেরে ফেলা সহজ নয় আর ঠিকও হবে না। কাজেই একটি গুলি আমার নিজের জন্য খরচ করলাম। ভয় হয়তো সময়ে আমিও একদিন একজন অনেক বড় ভিখারী হয়ে উঠবো।’
সূর্যের গুলি করা দশ জন ভিখারীর ভেতর কেবল একজন বেঁচেছিল। সেই ছেলেটা। অস্বাভাবিক বড় অন্ডকোষ দেখিয়ে যে ভিক্ষা করে। গুলিটা সেখানে আটকে ছিল। গুলি বের করা হলো। ও বেঁচে গেল। এখন এই গুলির দাগ দেখতে সকলে আসে। ওর পসার বেড়ে গেছে।