শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭
হোম / ফিচার / মেরিনা তাবাসসুম - দেশিয় স্থাপত্যশিল্পের এক ‘প্রথমা’
০১/১২/২০১৭

মেরিনা তাবাসসুম - দেশিয় স্থাপত্যশিল্পের এক ‘প্রথমা’

-

বিশ্বব্যাপী স্থাপত্যশিল্পের অন্যতম স্বীকৃত সম্মাননা হিসেবে পরিচিত ‘আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার’ এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি পেয়েছেন; তাও আবার একই সঙ্গে দুইজন। তাদের একজন গাইবান্ধার ফ্রেন্ডশিপ সেন্টারের ডিজাইনার কাশেফ মাহবুব চৌধুরী। অন্যজন হলেন স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম, যিনি এই শিল্পেরই এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

মেরিনা বিশ্বখ্যাত আগা খান পুরস্কার পেয়েছেন ঢাকার দক্ষিণখানের ফায়েদাবাদ এলাকায় ‘বায়তুর রউফ’ মসজিদের নকশা তৈরি করে। যেখানে বাংলাদেশে এখনো অধিকাংশ মসজিদে নারীদের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা নেই, সেখানে মসজিদ নির্মাণের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন একজন নারী। এই ঘটনাকে বিরল এবং ঐতিহাসিক বললে বোধহয় খুব একটা বাড়াবাড়ি হবে না। মেরিনা এই বিষয়টি নিয়ে প্রথমে চিন্তিত থাকলেও কাজ শুরু করার পর ধীরে ধীরে সকল চিন্তার অবসান ঘটে। কেননা মসজিদে মানুষের কমতি নেই এবং স্থানীয়দের কাছ থেকে সহযোগিতারও অভাব ছিল না। এরই ফলশ্রুতিতে নির্মিত সেই মসজিদ আজ বিশ্বের কাছে পরিচিত এবং বাংলাদেশের নির্মাণকৌশলের নতুন যুগের অহংকার।

এবার মেরিনার ডিজাইন করা ‘বায়তুর রউফ’ মসজিদের ব্যাপারে জানা যাক। ইতোমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষজ্ঞদের নজরে আসা এই মসজিদের লাল ইটগুলো বসানো হয়েছে একটি কৌণিক বিন্যাসে, যার ফলে ইটের মাঝখান দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে বাতাস আসা-যাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রায় ৫,৬০০ বর্গফুটের এই মসজিদে কোনোরকম এয়ার কন্ডিশনারের প্রয়োজন হয় না। ছাদ থেকে প্রাকৃতিক আলো অনায়াসে অদ্ভুত সুন্দর নকশা তৈরি করে মেঝেতে এসে ছড়িয়ে পড়ে বলে দিনের বেলা মসজিদে কোনোরকম কৃত্রিম আলো লাগে না। বিশ্বজুড়ে যখন পরিবেশবান্ধবতার জন্য চলছে আন্দোলন, তখন মেরিনার এই মসজিদ যেন তারই এক অনন্য উদাহরণ।

মসজিদের উপরে কোনো মিনার বা গম্বুজ নেই। মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে মেরিনার নানির দান করা জমিতে। মেরিনা তাবাসসুমের মতে, এর নকশা করা হয়েছে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, যা প্রচলিত মসজিদ থেকে আলাদা। পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের দিকটি মাথায় রেখে এর নকশা করা হয়েছে। ইতিহাস, সংস্কৃতিকেও মাথায় রাখা হয়েছে। সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলীর কিছুটা প্রভাব রয়েছে নকশায়। সে সঙ্গে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে স্থানীয় ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ ও অর্থায়নে। সব নির্মাণ সামগ্রীও স্থানীয়।

এই অভূতপূর্ব অর্জনের রূপকার মেরিনা তাবাসসুম বাংলাদেশের নারীদের ক্ষমতায়ন নিয়ে বেশ আশাবাদী। তাইতো ২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরে মেলবোর্নভিত্তিক স্থাপত্যশিল্পী রয়ে না হকিন-এর প্রশ্নের জবাবে মেরিনা বলেছিলেন, বাংলার সমাজ সেই আদিকাল থেকেই নারীবান্ধব ছিল এবং বর্তমানেও আছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ নারী কোনো না কোন কাজের সঙ্গে জড়িত, অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল এবং সমাজের মূলধারার অংশ। মেরিনা তাবাসসুম মনে করেন, বাংলাদেশে মসজিদ নির্মাণের উজ্জ্বল গৌরব আজ প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে। তাঁর মতে, মসজিদ সুন্দর হওয়ার পাশাপাশি দৃষ্টিনন্দন হওয়া উচিত, তা হলেই তা প্রার্থনার স্থানের পাশাপাশি দেশের উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যকর্মের মর্যাদা পাবে।

বায়তুর রউফ মসজিদের পাশাপাশি আরও অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন এই অভিজ্ঞ স্থপতি। তিনি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভেরও অন্যতম নকশাকার। জ্ঞান, বুদ্ধি এবং সৃজনশীলতার সঙ্গে স্রোতের বিপরীতে দুর্গম গতিতে চলেছেন মেরিনা তাবাসসুম। এর আগেও ২০০৪ সালে আগা খান পুরস্কারের জন্য তিনি মনোনীত হয়েছিলেন একটি আবাসিক প্রকল্পের জন্য। তবে ২০১৬ সালে, আগা খান পুরস্কারের আবুধাবির আল জাহিলি কেল্লার আসরে তিনি পৌঁছেছেন এক নতুন উচ্চতায় এবং সেই সাথে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে করেছেন উজ্জ্বল।

- কাজী মাহদী আমিন