বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭
হোম / খাবার-দাবার / বিয়ের আসরে পুরান ঢাকার শাহী বিরিয়ানি-পোলাও
০১/১২/২০১৭

বিয়ের আসরে পুরান ঢাকার শাহী বিরিয়ানি-পোলাও

-

পুরান ঢাকার খাবার মানে ৪শ’ বছরেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে লেগে থাকা স্বাদ আর সৌরভের সঙ্গে খানদানি পরিবেশনা। কালের পরিবর্তন সত্ত্বেও এখনো এতে মিশে আছে তুর্কি আর মোঘল খাদ্যরীতির ধারাবাহিকতা। ঢাকার আদি বাবুর্চিদের রান্নার সুনাম আর সৃজনশীলতা সর্বজনবিদিত। পুরান ঢাকার জনপ্রিয় আর ঐতিহ্যবাহী খাবারের সিংহভাগ দখল করে আছে মোঘল ও নবাবী ধাঁচের শাহী খাবার। আদি থেকে পুরান ঢাকার নামি-দামি বাবুর্চিরা সেসব রান্নার কৌশল জানেন। আর তাই বিয়েশাদির খাবারের জন্য - বিশেষ করে পোলাও বিরিয়ানি- পুরান ঢাকার বাবুর্চির চাহিদা সবসময়ই অনেক বেশি।

একসময় পুরান ঢাকার মেহমানদারিতে মোরগ পোলাওয়ের জনপ্রিয়তা ছিল সর্বাধিক। সকালের নাশতায় থাকত তেহারি। ঢাকার আদি বাসিন্দারা তাদের অতিথি আপ্যায়নে বা জামাই এলে শাহী মোরগ পোলাওকে প্রাধান্য দিতেন সর্বাগ্রে। পাশাপাশি থাকত মোসাল্লাম, রেজালা, ঝাল গরুর মাংস, জালি কাবাব, নিম কালিয়া, শাহী টুকরা, পেস্তাবাদামের শরবত ইত্যাদি। পুরান ঢাকার পোলাও বিরিয়ানির মধ্যে বুন্দিয়া পোলাও, খাসির বিরিয়ানি, সাদা পোলাও দিয়ে ঝাল গরুর মাংস, ডিমের কোরমা, গরুর গ্লাসি, রোস্ট ইত্যাদি পছন্দ অনুযায়ী খাবার থাকত বিরিয়ানি-পোলাওয়ের পাশাপাশি। তখনকার সময়ে কাচ্চি বিরিয়ানির তেমন জনপ্রিয়তা ছিল না, যেমন ছিল মোরগ পোলাওয়ের। পাড়া-মহল্লাতে স্থানীয়দের পরিচালনায় পোলাও-বিরিয়ানির দোকানগুলোই ছিল জনপ্রিয়।

পুরান ঢাকায় গায়ে-হলুদ থেকে শুরু করে বিয়ে, বৌভাত ইত্যাদি, এমনকি মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠানে যে খানাপিনার আয়োজন করা হয়, তাতে মূলত স্থানীয় বাবুর্চিদের রান্নাই থাকে, বাইরের বাবুর্চিদের প্রয়োজন পড়ে না একেবারেই। কারণ রান্নায় আদি ঢাকার খাবারের স্বাদ আর সৌরভ অক্ষুন্ন রাখার ব্যাপারটা বিশেষভাবে নজর দেয়া হয়। পুরান ঢাকার মানুষের সর্বাধিক প্রিয় সকালের নাশতা হচ্ছে গরুর তেহারি। এখনো বিখ্যাত হাজীর বিরিয়ানিতে সেই শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শুকনা কাঁঠালপাতার তৈরি ঠোঙায় সকাল-বিকেল বিরিয়ানি পরিবেশন করা হয়। সে-দৃশ্য হারানো দিনের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

পুরান ঢাকার সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিয়ে-শাদির উৎসবে খাবারের আয়োজন। শুধু সচ্ছল অথবা ধনী পরিবারে নয়, একজন সাধারণ আয়ের মানুষের বিয়ের অনুষ্ঠানেও চেষ্টা করা হয় ভালো রান্নাবান্নার। এই উৎসব চলে বিয়ের এক সপ্তাহ বা তারও আগে থেকে। উৎসবমুখর পরিবেশে এলাকাবাসীর মিলনমেলা চলতে থাকে। বংশানুক্রমে বসবাসের ফলে পুরানো ঢাকায় প্রায় সবাই সবাইকে চেনেন। তাই বিয়েতে সাধারণত শুধু আত্মীয়-স্বজন নয়, এলাকাবাসীর সমান অংশগ্রহণ উৎসবের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দেয়। গায়ে হলুদ থেকে শুরু করে বৌ-ভাত প্রতিটি অনুষ্ঠানেই খাবার-দাবারের আয়োজন থাকে চোখে পড়ার মতো। অবস্থাপন্ন তো বটেই, সাধারণ আয়ের যারা তাদেরও যেন ফুর্তির শেষ নেই। সাধারণত হলুদের রাতে জামাইয়ের খাবার অত্যন্ত যতেœ আর সুন্দরভাবে সাজিয়ে দেয়া হয়, যা দেখার জন্য আশপাশের সবাই ভিড় জমান। বিয়ের অনুষ্ঠানে সাধারণত মোরগ পোলাওই বেশি গুরুত্ব পায়। এছাড়া বুন্দিয়া পোলাও, সাদা পোলাও, রোস্ট, গরুর ঝালমাংস, জালি কাবাব, খাসির রেজালা, বোরহানি, শাহী ফিরনি অথবা জরদা থাকে। ইদানীং কাচ্চি বিরিয়ানি, শাহী টুকরা, শাসলিক, চিকেন ফ্রাই, স্পেশাল নান, কালা ভূনা আরও অনেক কিছু যোগ হয়েছে, যা ঐতিহ্যবাহী ঢাকায় আদিতে ছিল না। বরের সামনে ধরা হয় ডেকোরেট করা আস্ত খাসি আর আস্ত মুরগি। অনুষ্ঠানের মধ্যমণি বর খাবার টেবিলে তার সামনে রাখা আস্ত খাসির মাথা নিজের হাতে ভেঙে সবাইকে নিয়ে খাওয়া শুরু করেন। এছাড়া সামর্থ অনুসারে টেবিলে বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয় বর ও তার সাথীদের জন্যে। যার মধ্যে থাকে গলদা চিংড়ি, মুরগি ও আস্ত মাছের কাবাব, নিম কালিয়া, শামি কাবাব, রেশমি কাবাব, কোপ্তা-মালাইকারীসহ নানা পদ।

শাহী-খানাপিনার প্রতি পুরান ঢাকার মানুষের রয়েছে প্রচন্ড আকর্ষণ। পরিবর্তনের হাওয়ায় ফাস্ট ফুডসহ নানাধরনের খাবারে এই সময়ের সবার জীবন পরিপূর্ণ হলেও ঐতিহ্যের ঢাকায় উৎসবে আর আচার-অনুষ্ঠানে চিরাচরিত লোভনীয় খাবারের স্থানটি হালের কোনো জনপ্রিয় খাবারই দখল করতে পারেনি। যুগ যুগ ধরে তাই বংশ-পরম্পরায় কাজী আলাউদ্দিন রোডের হাজী বিরিয়ানি, নাসিরুদ্দিন সরদার লেইনের মাখন পোলাও, বেচারাম দেউড়ির নান্না বিরিয়ানি, ফরিদাবাদের বুদ্ধু বিরিয়ানি, নারিন্দার ঝুনু পোলাও ইত্যাদি বিখ্যাত দোকানগুলো এখনো সমানভাবে জনপ্রিয় তবে বর্তমান সময়ে জনপ্রিয়তা আর চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুরাতনদের সঙ্গে দিনে দিনে বাড়ছে আরও এমন অনেক মোঘল আর নবাবী খাবারের নতুন ঠিকানা, যেখানে ভোজনপ্রেমীরা ছুটে যান প্রিয় খাবারের স্বাদ নিতে।

- মোহাম্মদ ওয়াসিম
ক্রিয়েটর ফেইসবুক পেজ: Puran Dhakar Khabar
এডমিন: আপনার রান্নাঘর