রবিবার,২০ অগাস্ট ২০১৭
হোম / ভ্রমণ / শান্তিনিকেতনের ছায়ায়
০৩/১৬/২০১৬

শান্তিনিকেতনের ছায়ায়

- রিদোয়ান

ইট-কাঠের শহরে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে গিয়ে ক্লান্ত মানুষদের আত্মিক শান্তির জন্য প্রকৃতির সংস্পর্শের চেয়ে মোক্ষম দাওয়াই বোধহয় আর নেই। গতানুগতিক জীবনের বন্দিশালা থেকে মুক্ত হয়ে শান্তি খুঁজে পেতে রবি ঠাকুরের স্মৃতিধন্য ‘শান্তিনিকেতন’ হয়ে উঠতে পারে আপনার কাক্সিক্ষত গন্তব্য।

শান্তিনিকেতন ও রবি ঠাকুর

কোলাহোলহীন শান্ত পরিবেশ, চারপাশে দিগন্ত-বিস্তৃত সবুজ উদ্যান কিংবা গাছের নিচে পাঠশালা- এই কয়েকটি টুকরো টুকরো ছবি একসঙ্গে মানসপটে জোড়া লাগালে যে অনন্য-সুন্দর শিল্পকর্মের সন্ধান মিলবে তার নামÑ শান্তিনিকেতন। কথিত আছে রায়পুর জমিদার বাড়িতে নিমন্ত্রণে যাওয়ার সময় রবি ঠাকুরের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর দিগন্ত প্রসারিত মাঠের ছাতিম গাছের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে স্থানটির প্রতি তার অন্যরকম মায়া পড়ে যায়। ১৮৬৩ সালে তিনি রায়পুরের জমিদারের কাছ থেকে এই স্থানে ২০ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করে গড়ে তোলেন শান্তিনিকেতন। পরবর্তীকালে ১৯২১ সালে রবি ঠাকুরের চেষ্টায় এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, মুক্তসংস্কৃতি চর্চার পীঠস্থান হিসেবে যা বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত হয়েছে। এই বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েরই একটি আশ্রম হল শান্তিনিকেতন।

মাত্র ১২ বছর বয়সে শান্তিনিকেতনে প্রথম এসেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তারপর থেকে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের এই প্রবাদপ্রতিম পুরুষের পায়ের ধুলোয় ধন্য হয়েছে এই স্থানটি। রবি ঠাকুর সম্পর্কে আরো গভীরভাবে জানতে হলে এই স্থানেই তাই আপনাকে আসতেই হবে। আর সেই আহ্বান স্বয়ং রবি ঠাকুরই জানিয়েছেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে এই শান্তিনিকেতন সম্পর্কে কবিগুরু লিখেছিলানÑ “যখন রব না আমি মর্ত্যকায়ায়, তখন স্মরিতে যদি হয় মন, তবে তুমি এসো হেথা নিভৃত ছায়ায়, যেথা এই চৈত্রের শালবন।”

অনাবিল প্রশান্তির শান্তিনিকেতন

এ তো গেল শান্তি নিকেতনের ইতিবৃত্ত। এখন ভেতরটা ঘুরে দেখার পালা। শান্তিনিকেতনে ঢোকার আগে শিল্পী প্রফেসর সেলিম মুন্সীর গ্যালারি ‘নীহারিকা’ থেকে নান্দনিক ভাস্কর্য এবং নানাচিত্রকর্ম দেখে নিতে পারেন। শান্তিনিকেতনের উপর করা অনেকগুলো কাজের প্রদর্শনীও দেখা যাবে এখানে। গ্যালারির সামনের রাস্তা ধরে এগোলে বেশ কয়েকজন শিল্পীর বাসস্থান চোখে পড়বে। আরো সামনে এগোলেই চোখে পড়বে বিশাল মাঠ, প্রতিবছর এখানেই বসন্ত উৎসবের আয়োজন করা হয়। রাস্তার পাশেই খোলা জায়গায় গাছের নিচে পাঠশালার সন্ধান মিলবে।
এরপর একটু ঘুরলেই বিখ্যাত ‘ছাতিমতলা’ পৌঁছে যাবেন। ছাতিমতলা চত্বরটি বছরে শুধুমাত্র দুটো বিশেষ দিনে খোলা হয়ে থাকে। বলা হয়ে থাকে এই ছাতিমতলা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে রবি ঠাকুর জায়গাটিকে জ্ঞানের আশ্রম হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। একটু এগিয়ে যেতেই সামনে পড়বে ‘শান্তিনিকেতন ভবন’। এই ভবনটি তৈরি করার সময় পাঁচটি ধর্মের রূপক ব্যবহার করা হয়েছিল যা বহু বছর ধরে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বর্তমানে এই ভবনটি মিউজিয়ামে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এখানে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির টানে সুদূর চীন থেকে আগত রবি ঠাকুরের একজন ছাত্রের ছবি ও চিঠি সংরক্ষিত রয়েছে।

ভবনটির ঠিক সামনে মা ও শিশুর আদলে বানানো ভাস্কর্যটিও দেখার মতো। ভবনটির পিছন দিক দিয়ে এগোলে চোখে পড়বে ‘মেডিটেশন হল’। এই ধ্যানগৃহে সপ্তাহে একদিন সাদা পোশাক পরিধান করে শিক্ষার্থীরা ধ্যান করেন। ইচ্ছে করলে আপনিও ধ্যান করে নিতে পারেন। এখানে রয়েছে একটি বিদ্যালয় ভবন যার সামনে দেখতে পাবেন বিশাল আকৃতির একটি ঘণ্টা। আরো সামনে এগিয়ে গেলে চোখে পড়বে লাইব্রেরি ও খোলা অডিটরিয়াম। অডিটরিয়ামের দেয়ালে শিল্পীদের তৈরি ম্যুরাল বেশ আকর্ষণীয়। এছাড়া ছাত্র-হোস্টেল লাগোয়া ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের বিশাল ভাস্কর্য, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মুখায়ব ও আদিবাসীদের উপর করা ভাস্কর্য এবং দেয়ালে শিল্পের মাধ্যমে চিত্রায়িত প্রাচীন ইতিহাস আপনাকে অন্য এক দুনিয়ায় নিয়ে যাবে তা বলাই বাহুল্য।

এছাড়া রবি ঠাকুরের জন্য তৈরি করা বাসস্থানগুলো ঘুরে তাঁর বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন দেখে নিতে পারেন। জীবদ্দশায় রবি ঠাকুর পুনশ্চ, কোনার্ক, উদীচী, শ্যামলী এবং উদয়ন-এই পাঁচটি বাড়ি ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে শ্যামলী সম্পূর্ণ মাটির ঘরের আদলে বানানো। কোনার্ক নামের বাড়িটির ডিজাইন কবিগুরু নিজে করেছিলেন। তবে বাড়িগুলোর মধ্যে উদয়ন সবচেয়ে বড়। এর আসবাবপত্রে প্রাচীন বৌদ্ধস্থাপত্যের ছাপ খুঁজে পাবেন।
বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি বা রবি ঠাকুরের জীবন নিয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য শান্তিনিকেতন অনেকটা তীর্থস্থানের মতো বলা চলে। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটানোর জন্যও শান্তিনিকেতন আদর্শ এক জায়গা। শান্তিনিকেতনে একবার ঘুরে আসার পরও আরেকটু দেখার ইচ্ছে তাই থেকেই যায়। এ যেন রবি ঠাকুরের ছোটগল্প-“শেষ হইয়াও হইলো না শেষ”।

কিভাবে যাবেন?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের বীরভূম জেলার অন্তর্গত বোলপুর শহরে এই আশ্রম ও শিক্ষাকেন্দ্রের অবস্থান। কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনের দূরত্ব ১৫৯ কিলোমিটার। পথের দুপাশে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে ৩ ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন প্রকৃতির আপন রঙে রাঙানো শান্তি নিকেতনে। যাওয়ার জন্য অধিকাংশ দর্শনার্থীই ট্রেনকেই বেছে নেন। প্রতিদিন হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশন থেকে অনেকগুলো ট্রেন শান্তিনিকেতনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। এদের মধ্যে ‘শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস’ সবচেয়ে বিখ্যাত। শান্তিনিকেতন স্টেশনে নেমে রিকশায় ২০ মিনিটের পথ পাড়ি দিলেই পৌঁছে যাবেন আপনার কাক্সিক্ষত গন্তব্য শান্তিনিকেতনে।

কখন যাবেন?

বছরের যেকোনো সময়েই শান্তিনিকেতনে যাওয়া যাবে। তবে পুরো জায়গাটা ঘুরে দেখতে চাইলে প্রচ- গরমে না যাওয়াই ভালো। এছাড়া শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসব দেখতে বসন্তের শুরুতে আসাটাই ভালো।

কোথায় থাকবেন

দর্শনার্থীদের থাকার ভালো ব্যবস্থা রয়েছে এই এলাকায়। থাকতে পারেনÑ পার্ক গেস্টহাউস, কৃষ্ণচুড়া হোমস্টে, শান্তিনিকেতন টুরিস্টলজসহ আরও বিভিন্ন হোটেল, মোটেল ও বাংলোয়।