শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭
হোম / স্বাস্থ্য-ফিটনেস / মাসিক নিয়ে ভাবনা
১২/২৯/২০১৬

মাসিক নিয়ে ভাবনা

-

মেয়েদের জীবনে ঋতুস্রাব বা মাসিক একটা অবধারিত ঘটনা হলেও বিষয়টিকে সবসময়ই সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার একটা প্রবণতা দেখা যায় আমাদের সমাজে। এমনকি মাসিক শুরু হওয়ার আগে পর্যন্তও কিশোরীদের কাছ থেকে এ বিষয়টি এমনভাবে লুকিয়ে রাখা হয় যেন এটা খুব খারাপ কিছু। ফলে প্রথমবার মাসিক শুরু হওয়ার ঘটনায় বেশিরভাগ কিশোরীই আতঙ্কিত হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতেও খুবই স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক এই বিষয়টি মেয়েদের কাছে একটা আতঙ্কের বিষয় হয়েই থেকে যায়। তাই একজন কিশোরীর মাসিক শুরু হওয়ার আগেই তার এ বিষয়ে জানা জরুরী।

অনেকের এটি শুরু হয়ে যায় ১০ বছর বয়সেই, যা মাসিক শুরু হওয়ার গড় বয়সের তুলনায় একটু তাড়াতাড়িই। সেক্ষেত্রে আতঙ্কিত হওয়ার মাত্রা আরো বেশি হতে পারে বলে এ বিষয়ে মেয়ে শিশুদের সঙ্গে মায়েদের কথা বলা দরকার আরো আগেই। এ বয়সি মেয়ে শিশুদের যখন-তখন মেজাজ পাল্টানো বা খিটখিটে মেজাজ দেখলেই বুঝতে হবে যে ঋতুস্রাব বিষয়ে মেয়েকে জানানোর সময় হয়েছে। তবে সামাজিকভাবে এ বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলার প্রচলন না থাকায় কিছু অস্বস্তি থাকতেই পারে মায়েদের ভেতরে। সেজন্য কিছু প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে পারেন আগে থেকেই। অথবা ইতোমধ্যেই মাসিক শুরু হয়ে যাওয়া আপনার মেয়ে শিশুটির সঙ্গেও নির্দ্বিধায় কথা বলে নিতে পারেন আরো একবার।

কথা শুরু করুন যত শিগগির সম্ভব
ঋতুস্রাব বেড়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এ-বিষয়ে সময়ের আগেই কিছু কিছু আলোচনা করায় ক্ষতি তো নেই-ই, বরং আগে থেকে জানা থাকলে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ থাকবে না। এ বিষয়ে একজন শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, 'একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মেয়েটি দেখল সে রক্তাক্ত; কিন্তু সে জানেও না রক্ত কোথা থেকে বেরুচ্ছে, একটা শিশুর জন্য বিষয়টি অবশ্যই আতঙ্কের। সে ভেবে বসতে পারে তার কোনো ভয়ঙ্কর রোগ হয়েছে, যার কারণে সে মারা যাবে। তাই বেড়ে ওঠার সাথে সাথে মেয়ের শারীরিক কিছু পরিবর্তন, যেমন, পিউবিক হেয়ার, বুক উঁচু হয়ে উঠতে শুরু করা প্রভৃতি চোখে পড়তে শুরু করলেই তার সঙ্গে মাসিকের বিষয়ে কথা বলুন। এসব শারীরিক পরিবর্তনের বিষয়ে সে নিজে থেকেও জানতে চাইতে পারে। তার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সময়ও মাসিকের ব্যাপারে তাকে বলতে পারেন।

আগে থেকে নিজেকে প্রস্তুত করুন
এ-বিষয়ে কথা বলার আগে নিজেকে প্রস্তুত করে নেয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। আপনার নিজের শুরুর দিকের অভিজ্ঞতা তাকে জানান, এবং তার যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন। এজন্য প্রয়োজনে মেয়েদের প্রজনন তন্ত্র নিয়ে কিছু পড়াশোনা করে রাখুন। বইপত্রের পাশাপাশি ইন্টারনেটের সাহায্য নিতে পারেন। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সন্তানদের সঙ্গে কথা শুরু করার আগে অভিভাবকদের নিজেদের প্রস্তুতি নেওয়াটা খুবই জরুরী। তাদের বোঝান যে, এসব খুবই স্বাভাবিক ঘটনা, এবং কথা বলুন সরাসরি তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে। এছাড়া ঋতুস্রাব হওয়া মানে যৌনজীবনেও প্রাপ্তবয়সের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তাই এ-সময় যৌনতার বিষয়েও আপনার মেয়ের সঙ্গে আলাপ করুন, এবং তাকে জানান কেন ও কীভাবে সতর্ক থাকতে হবে। ঋতুস্রাবের বিষয়েও তার অনেক প্রশ্ন থাকতে পারে, যেমন - এসময় কেমন ব্যথা হয়, কতদিন পর পর এটা হয়, এসময় সে বাইরে খেলতে পারবে কি না। আপনার মেয়ের মনে এই বিষয়ে যত দ্বন্দ্ব আছে, সেসব দূর করে ফেলুন। আলোচনার সময় নিজের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখুন, দ্বিধাহীনভাবে কথা বলুন। কোনোভাবেই মেয়ের মনে যেন এই ধারণা তৈরি না হয় যে, ঋতুস্রাব নিয়ে লজ্জিত হওয়ার কিছু আছে। অতিরিক্ত তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করবেন না।

একবারে দীর্ঘক্ষণ ধরে কথা না বলে একটু একটু করে জানান যেন আপনার মেয়ে তা গ্রহণ করতে পারে। টেলিভিশনে কোনো স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিজ্ঞাপন শুরু হলে এ-বিষয়ে কথা শুরু করার আদর্শ সময় ধরা যায়। আপনার মেয়েকে বলুন যে, তার শরীরের যে পরিবর্তনগুলো আসছে তা প্রতিটি মেয়ের ক্ষেত্রেই ঘটে। এভাবেই সে মেয়ে থেকে নারী হয়ে উঠছে তা তাকে জানান। মেয়ের স্কুলে প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে কোনো পাঠ দেওয়া হচ্ছে, অথবা হবে কিনা তা শিক্ষকদের কাছ থেকে জেনে নিন। স্কুলে পড়ার মাধ্যমে বিষয়গুলো জেনে এলে মায়েদের জন্য বুঝিয়ে বলা সহজ হয়। মেয়ের বয়স অনুযায়ী তাকে তথ্যগুলো জানাতে থাকুন।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মৌলিক বিষয়গুলো মেয়েকে জানান
মাসিকের সময় স্যানিটারি প্যাড কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, এবং কতক্ষন পর পর তা বদলাতে হবে, এসব সাধারণ বিষয়গুলো তাকে শিখিয়ে দিন। এছাড়া যেন কোনোভাবে সংক্রমণ না ঘটে তা নিশ্চিত করতে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নেওয়া, এবং নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো পরিষ্কার রাখার বিষয়ে সন্তানদের শেখানো উচিত অভিভাবকদের। ব্যবহৃত স্যানিটারে প্যাড ও অন্যান্য উপকরণ ফেলে দেওয়ার সঠিক নিয়মও শেখাতে হবে তাকে।

যেসব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারেন আপনি:
* শুধু মেয়েদেরই কেন মাসিক হয়?
* রক্তক্ষরণের কারণে ব্যথা হয় কিনা?
* কতদিন থাকে?
* এসময় বাইরে খেলতে পারবে কিনা?

পিএমএস সামলাবেন কীভাবে
পোস্টমেন্সট্রুয়াল সিনড্রোম বা পিএমএস বিষয়ে আমাদের দেশের বেশিরভাগ নারীদেরই ধারণা নেই। মাসিক শুরুর কিছুদিন আগে (মোটামুটি সপ্তাহখানেক আগে থেকে) এবং মাসিক চলার সময় কিছু শারীরিক অসুবিধা দেখা দেয়, যার প্রভাব পড়ে মানসিক অবস্থার উপরেও। প্রত্যেক নারীই কমবেশি পিএমএসর শিকার হয়। কিশোরীদের ক্ষেত্রে পিএমএসর প্রভাব বেশ প্রকটও হতে পারে। তবে স্বাস্থ্যকর খাবার এবং পর্যাপ্ত শারীরিক চর্চার মাধ্যমে পিএমএস পাশ কাটানো যায়।

* মাসিকের সময় তিনবেলার প্রধান খাবারে বেশি করে ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার, যেমন - লোফ্যাট দুধ, পনির, দই, কমলালেবুর জুস, সয়াদুধ প্রভৃতি খেতে হবে।
* বাইরে খেলাধুলা, শরীরচর্চা ও অন্যান্য শারীরিক কাজ থেকে মেয়েকে বিরত রাখবেন না, কারণ এগুলো স্বাস্থ্যসম্মত শারীরিক ওজন ধরে রাখতে সাহায্য করে।
* প্রসেসড খাদ্যদ্রব্য বেশি খেতে দিবেন না।
* স্বাভাবিক সময়ের চাইতে একটু বেশি পানি খাওয়া নিশ্চিত করুন। অন্য সময়ও দৈনিক আট গ্লাস পানি খাওয়া নিশ্চিত করুন।
* মাসিকের সময় সবধরনের জাংক ফুড পরিহার করতে হবে।

- কাজী শাহরিন হক