বুধবার,২৩ অগাস্ট ২০১৭
হোম / বিজ্ঞান-প্রযুক্তি / অনলাইন জগতে আপনার সন্তান কতখানি সুরক্ষিত?
১২/২৯/২০১৬

অনলাইন জগতে আপনার সন্তান কতখানি সুরক্ষিত?

-

একটা সময় ছিল যখন শৈশব মানে ছিল খেলার মাঠে দুরন্ত বিকেল কিংবা পাঠ্য বইয়ের আড়ালে লুকিয়ে কমিক বা গোয়েন্দা গল্প পড়া। সময়ের বিবর্তনে একবিংশ শতাব্দীতে এসে শিশু-কিশোরদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নানা গ্যাজেট এবং ইন্টারনেটের সমন্বয়ে তৈরি ভার্চুয়াল জগত। আপাতদৃষ্টিতে জিনিসটা স্বাভাবিক মনে হলেও সন্তানের অনলাইন-কার্যক্রম কোনভাবেই হেলাফেলা করার মতো ব্যাপার নয়। বর্তমানের অনলাইন জগত এবং শিশু-কিশোরদের জীবনে এর প্রভাবকে উপজীব্য করেই আজকের লেখা সাজানো হয়েছে।

গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে ২২ শতাংশ কিশোর-কিশোরী দিনে অন্তত ১০ বার করে নিজেদের পছন্দ এর সোশাল মিডিয়া সাইটে লগ-ইন করে। এদের মধ্যে শতকরা ৭৫ ভাগেরই নিজস্ব সেলফোন রয়েছে। এই তথ্যগুলো একদিকে যেমন প্রযুক্তির ক্রমবিকাশের স্মারক ঠিক তেমনি অন্যদিক থেকে বিবেচনা করলে দৃশ্যপট কিছুটা হলেও ভিন্ন। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার দরুণ জন্মের পর থেকে একটি শিশু ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের পাশাপাশি ‘অনলাইন’ জগতের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকে। কোনো কোনো সময় এই অনলাইন দুনিয়া ব্যক্তির কাছে এতটাই প্রিয় হয়ে উঠে যে বাস্তব জগত থেকে সে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হতে পারে। এর ফলে নিত্যনতুন মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এই যেমন বর্তমানে ‘ফেইসবুক ডিপ্রেশন’ নামের নতুন একটি উপসর্গ নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। এর পাশাপাশি অনলাইনে অন্যান্য ব্যক্তির স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁস, অশ্লীল ছবি বা ভিডিওর কারণে ব্যক্তির নৈতিক অবক্ষয় ঘটা অস্বাভাবিক কিছুনা। বলাই বাহুল্য, অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অনলাইন দুনিয়ার অন্ধকার দিকগুলোতে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশ প্রবল। এ অবস্থায় নিজের সন্তানের অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে সকল অভিভাবকেরই সচেতন হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো বেশ উপকারি হতে পারে।

নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত সন্তানকে ফেইসবুক থেকে দূরে রাখুন
সাধারণত ১৩ বছর বয়সের কমে ফেইসবুকে অ্যাকাউন্ট খোলা উচিত নয় বলা হলেও বয়স লুকিয়ে খুব সহজেই অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। তাই সন্তান অল্প বয়সেই ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে ভার্চুয়াল জগতে সময় পার করছে কিনা তার উপর নজর রাখতে হবে। এত কম বয়সে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হলে তা সন্তানের স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথে বাধা সৃষ্টি করবে।

ফিল্টারিং সফটওয়্যার ব্যবহার করুন
বিশেষ কিছু সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে সন্তানের ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর নজর রাখা যাবে। এমনকি সন্তান ঠিক কতক্ষণ অনলাইনে রয়েছে বা কী টাইপ করছে তা সম্পর্কেও জানা যাবে। এছাড়া ‘পিউরসাইট পিসি’র মতো সফটওয়্যার ব্যবহার করে সন্তানের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে এমন সাইট বা কনটেন্ট ব্লক করে রাখা যায়।

নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন তৈরি করুন
সন্তান বড় হয়ে গেলে ইন্টারনেট ব্যবহারের আগে কিছু নিয়ম-কানুন তৈরি করুন। তারপর আপনার ছেলে বা মেয়েকে এসব নিয়ম মেনে চলার ব্যাপারে সচেতন করুন। একই সঙ্গে ঠিক কী কারণে এমন নিয়ম করা হয়েছে তা নিয়েও সন্তানের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করুন।

সন্তানের অভ্যাস সম্পর্কে জানুন
সন্তানের উপর নজর রাখতে আপনাকে গোয়েন্দাগিরি করতে হবেনা। বরং সন্তানের অভ্যাস সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন। সে কি ধরনের মুভি পছন্দ করে বা তার কাছের বন্ধু কারা তা খুঁজে বের করুন। এক্ষেত্রে সন্তানকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনুপ্রবেশের অনুমতি দেওয়ার আগে তার ফ্রেন্ড-লিস্ট আপনার কাছে কখনোই গোপন থাকবেনা এমন প্রতিশ্রুতি নিন।

ঘরের কেন্দ্রস্থলে কম্পিউটার রাখুন
কম্পিউটারসহ অন্যান্য ডিভাইস ঘরের এক কোণে না রেখে এমন জায়গায় রাখুন যেখানে সবার আনাগোনা রয়েছে। এর ফলে সন্তান ইন্টারনেট কী করছে তা অজানা থাকবেনা।

সন্তানের ফেইসবুক পোস্ট সম্পর্কে জানুন
আপনার ছেলে বা মেয়ে ফেইসবুকসহ অন্যান্য সোশাল প্ল্যাটফর্মে কী ধরনের পোস্ট শেয়ার করছে তা সম্পর্কে জানুন। বিশেষ করে সন্তান যদি হয় মেয়ে তবে সে ফেইসবুকে নিজের কী ধরনের ছবি বা ভিডিও শেয়ার করছে তা সম্পর্কে সচেতন হন। এখনকার সমাজে মেয়েদের ছবি বা ভিডিও এডিট হয়রানি করার উদাহরণ কম নয়।

নিজেই উদাহরণ তৈরি করুন
আপনি নিজেই যদি মিনিট দশেক পরপর ফেইসবুক বা টুইটারে লগ-ইন করে সময় নষ্ট করেন তবে আপনাকে দেখে সন্তানের মধ্যেও এই বদঅভ্যাস দেখা দিবে। তাই আগে নিজেকে ঠিক করুন এবং সন্তানের কাছে নিজেকে আদর্শ হিসেবে গড়ে তুলুন।

ডিভাইস-নির্ভরতা কমিয়ে দিন
সেলফোন, কম্পিউটার কিংবা টেলিভিশনের মতো ডিভাইসের উপর অতিরিক্ত আসক্তি কমিয়ে দিন। এর চেয়ে সন্তানের সঙ্গে একান্তে সময় কাটান অথবা বাইরে থেকে ঘুরে আসুন। এর ফলে সন্তানের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক হবে বন্ধুসুলভ এবং তার অনলাইন কার্যক্রম অ আপনার অজানা থাকবেনা।

সন্তানকে সচেতন করুন
অনলাইন জগতের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে সন্তানের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করুন। সন্তান অনলাইনে পর্নোগ্রাফির মতো বিষয়ে আসক্ত হয়ে পড়লে তা তার ভবিষ্যত জীবনে কেমন প্রভাব ফেলবে তা সম্পর্কে আগে থেকেই জানিয়ে রাখুন।

প্রযুক্তি সম্পর্কে জানুন
ছেলে বা মেয়ে অনলাইনে কী করছে তা জানতে অভিভাবকদের পর্যাপ্ত প্রযুক্তি জ্ঞান থাকতে হবে। তাই নতুন নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানুন। তারপর এর ভাল এবং খারাপ দিকগুলো শনাক্ত করে আপনার সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করুন।

সন্তানকে ব্যাক্তিত্ববান হিসেবে গড়ে তুলুন
ছোটবেলা থেকে সন্তানের মধ্যে সুকুমারবৃত্তির বিকাশ ঘটাতে সচেতন হন। সন্তানকে সামাজিক মূল্যবোধ এবং নৈতিকতার শিক্ষা দিন। তাকে বোঝান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সে যেভাবে নিজেকে উপস্থাপন করছে তা তার ব্যাক্তিত্বের পরিচায়ক। তাই অনলাইন জগতেও তাকে নৈতিকতা বজায় রেখে নিজের পরিচ্ছন্ন ইমেজ তৈরি করতে হবে।

আপনার সন্তানের অনলাইন জীবন নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করতে গিয়ে আবার তার বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক কার্যকলাপ সম্পর্কে ভুলে যাবেন না। মোদ্দাকথা হল অনলাইন হোক বা অফলাইন, সন্তানের সঠিক পরিচর্যায় সঠিক এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।

- নাইব মুহাম্মদ রিদোয়ান