বুধবার,১৬ অগাস্ট ২০১৭
হোম / ফিচার / আমার মা - কনকচাঁপা চাকমা
১২/২৯/২০১৬

আমার মা - কনকচাঁপা চাকমা

-

নিসর্গ,অরণ্যানী, পাহাড়ি জীবনের ছন্দদোলাকে ক্যানভাসে মূর্ত করে তোলেন এই শিল্পী। বুনো প্রকৃতি, লোকজীবন, আদিবাসী জীবনের নানা বৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতিকে নান্দনিক মাধুর্যে ফুটিয়ে তুলতে নিপুণ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়ে চলেছেন শিল্পী কনকচাঁপা চাকমা। আদিবাসী জীবন, পাহাড়ি সংস্কৃতি, লোকাচারের অসামান্য রূপকার তিনি। নিজস্ব চিত্রভাষা নির্মাণে সক্ষম হয়েছেন এই চারুশিল্পী। ছবি দেখলে সহজেই চেনা যায় যে এটা কনকচাঁপা চাকমারই শিল্পকর্ম, অন্য কারো নয়। বাংলাদেশে আদিবাসী সমাজের পথিকৃৎ চারুশিল্পী ছিলেন দু’জন। প্রথম চারুশিল্পীর নাম গৌতম মনি চাকমা, তিনি এখন বেঁচে নেই। ছাত্রজীবনেই যোগ দিয়েছিলেন শান্তিবাহিনীতে। তারপর জয়া চাকমা। থার্ড ইয়ারে পড়াকালীন মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার পরের আদিবাসী শিল্পী হলেন এই কনকচাঁপা চাকমা। সারা পৃথিবীতে আদৃত হয়েছে এবং হচ্ছে তাঁর শিল্পকর্ম। তাঁর কাজ সংরক্ষিত রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নরওয়ে, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ভুটান, জার্মানি, জাপান, কোরিয়া, চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়াসহ আরো আরো দেশে। এমন বিরল, ব্যাপক সম্মান ও সৌভাগ্য বাংলাদেশের খুব কম শিল্পীরই হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৯টি একক চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে তাঁর, মাতৃভূমি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে। দলীয় প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন প্রচুর। সংখ্যা ২১০।

কনকচাঁপা চাকমার জন্ম রাঙামাটি পার্বত্য জেলায়, ১৯৬৩ সালের ৬ মে। চারুকলায় মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন তৎকালীন চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) থেকে। ১৯৯৩-৯৪ সালে ফেলোশিপ নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করেন আমেরিকার পেন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। ২০০৬ সালে চীনের ইয়ো গাঙ ফেঙলিয়াং ইন্টারন্যাশনাল আর্ট ইনস্টিটিউটে ভিজিটিং টিচার হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের চারুকলা শিক্ষা দেন। ২০০৮ সালে পেয়েছেন চীনের পেইচিংয়ে অলিম্পিক ফাইন আর্টস গোল্ড মেডেল। কনকচাঁপা আমেরিকা থেকে পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার, স্বীকৃতি ও সম্মাননা। তিনি যখন স্কুলের ছাত্রী, তখন পেয়েছিলেন ইউনিসেফের প্রথম পুরস্কার। ক্ষুদে এই শিল্পীর কৃতিত্বে আনন্দিত উল্লসিত তাঁর স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী নীলিমা চৌধুরী আধাবেলা স্কুল ছুটি দিয়ে দেন। পাক্ষিক অনন্যা ১৯৯৪ সালে শিল্পী কনকচাঁপা চাকমাকে শীর্ষ দশ নারীর একজন হিসেবে সম্মানিত করে। তিনিই প্রথম নারী চারুশিল্পী, যিনি পেয়েছিলেন এই সম্মাননা ও স্বীকৃতি।

কনকচাঁপা চাকমার মায়ের নাম শরৎমালা চাকমা। বাবার নাম বিজয়চন্দ্র চাকমা। তিনি মারা গেছেন নয় বছর আগে। শরৎমালা চাকমার বয়স এখন ৮৪। এই বয়সেও তিনি সচল, সজীব, কর্মচঞ্চল। তিনি একজন কৃতী বয়নশিল্পী। ১৯৯৮ সালে তিনি পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার, শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী হিসেবে। তিনিই আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যিনি অর্জন করতে পেরেছেন জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তির গৌরব। মাস্টার উইভার বলা হয় তাঁকে। এবছর আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল উইভিং ফেস্টিভ্যালে তাঁকে দেয়া হয়েছে লাইফটাইম এ্যাচিভমেন্ট সম্মাননা। ২০১৬ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সমাজ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে। কনকচাঁপা চাকমারা তিন বোন, এক ভাই। তিনি তিন নম্বর। কনকের স্বামী খালিদ মাহমুদ মিঠু ছিলেন বিশিষ্ট চারুশিল্পী ও চলচ্চিত্র পরিচালক। ২০১৬ সালের ৭ মার্চ ধানমণ্ডিতে মিঠু রিকশা করে যাচ্ছিলেন। একটি গাছ ভেঙে মাথায় পড়লে মিঠুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এই দম্পতির এক পুত্র, নাম আর্যশ্রেষ্ঠ - এক কন্যা, নাম শিরোপা পূর্ণা। তারা দু’জনও চলচ্চিত্র পরিচালনা, চারুকলা চর্চার সঙ্গে যুক্ত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারাও ইতোমধ্যে পরিচিত,খ্যাতিমান।

কনকচাঁপা চাকমা বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ (ইউডা)-এর ভিজিটিং টিচার,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দি মিউজিয়াম অব আমেরিকাস-এর বোর্ড মেম্বার, ঢাকার জন উইলসন স্কুলের ট্রাস্টি,অলিম্পিক ফাইন আর্ট এসোসিয়েশনের সদস্য, নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী সদস্য, উইমেন আর্টিস্ট এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য,মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দাতা সদস্য।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের ব্যক্তিত্ব আপনার জীবনে কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করেন?
উত্তর: আমার মায়ের ব্যক্তিত্ব আমার জীবনে শত ভাগ প্রতিফলিত। ছোট থেকে এ পর্যন্ত মায়ের দেয়া শিক্ষা আমার জীবনকে করে তুলেছে বাস্তবমুখী, পরিশ্রমী, পরোপকারী। তার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি তিলে তিলে আমাদের সৎ সন্তান হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

প্রশ্ন: আপনি বর্তমানে যে অবস্থানে রয়েছেন, সেক্ষেত্রে আপনার মায়ের অনুপ্রেরণা ও অবদান কতখানি? আপনার অর্জিত সাফল্যের নেপথ্যে তাঁর ভূমিকা কেমন?
উত্তর: আমার এই অবস্থানের জন্য মায়ের অবদান অপরিশোধ্য- ছোট থেকে ছবি আঁকতাম বলে মা-বাবা দু’জনেই আমাকে চারুকলায় পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। যদি উনারা আমাকে এভাবে উৎসাহ না দিতেন, তাহলে আমার এতদূর উঠে আসা সম্ভব ছিল না। কারণ চারুকলায় পড়াশোনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ব্যাপার। তারপর এই প্রফেশন থেকে পাস করে আমি আদৌ দাঁড়াতে পারব কিনা এসব কিছুকে উপেক্ষা করে আমার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করেছেন উনারা।

প্রশ্ন: মাকে আপনি কখনো মিস করেন?
উত্তর: মাকে আমি সবসময় মিস করি। বিশেষ করে যখন কোনো বিজয় অর্জন করি, তখন মায়ের কথাই বেশি মনে পড়ে।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের রান্নার কথা বলুন। তাঁর করা কোন্ কোন্ রান্না আপনার বিশেষ পছন্দের, অনুগ্রহ করে বলবেন কি?
উত্তর: আমার মা অসাধারণ রান্না করেন। পৃথিবীর সব খাবারের চাইতে আমার মায়ের রান্নাই শ্রেষ্ঠ মনে হয় আমার কাছে। মায়ের হাতে ‘বদা কেবাং’ আর ‘বাঁশের মধ্যে মুরগির মাংস রান্না’ অতুলনীয়।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের কোন্ কোন্ গুণ আপনাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে?
উত্তর: আমার মা খুব বাস্তববাদী, অপ্রয়োজনীয় আবেগকে তিনি কখনো প্রশ্রয় দেন না। তার সংযম এবং সততা আমাকে মুগ্ধ করে।

প্রশ্ন: মাকে নিয়ে কোনো মর্মস্পর্শী বা অত্যন্ত আনন্দঘন কোনো ঘটনা থাকলে বলুন।
উত্তর: মাকে নিয়ে মর্মস্পশী ঘটনার একটি স্মৃতি হলো- আমার ছোটভাই যখন মারা গেল মা তখন কীভাবে আমাদের বাকি সন্তানদের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সামলে নিয়েছিলেন সেই স্মৃতি এখনও মনে পড়ে। আমাদের সামনে চোখের জলকে সরিয়ে রাখা যে কি কঠিন কাজ ছিল সেদিন। আর আনন্দপূর্ণ স্মৃতি হলো- চারুকলায় ভর্তির পর কয়েক মাস পরে মার সারপ্রাইজ ভিজিট ছিল আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের। কারণ ঢাকায় আসার পূর্বে আমি কখনো বাবা-মাকে ছেড়ে কোথাও যাইনি।

প্রশ্ন: মায়ের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখবার ব্যাপারে আপনার কোনো ধরনের উদ্যোগ আছে কি? যদি থেকে থাকে, তাহলে পাঠকবৃন্দের সঙ্গে সেটা শেয়ার করার জন্যে অনুরোধ জানাই।
উত্তর: মায়ের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার কাজটি তো করতেই হবে। তার মতো কাপড় বুনন শিল্পী বাংলাদেশের তথা পাবর্ত্য অঞ্চলে বিরল। তার বুনন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে যদি তিনি তার শিক্ষাটা পরবর্তী প্রজন্মকে দিয়ে যেতে পারেন। এখন মেয়েরা পড়ালেখার দিকে ঝুঁকে গেছে বলে বুননি পাওয়া যায় না তেমন। এটার যথাযথ মূল্যায়ন যদি করা যায় তবেই এই শিল্পচর্চা অব্যাহত থাকবে। আমি চেষ্টা করব বুনন শিল্পীদের উৎসাহিত করতে। তবেই মায়ের এই বিশেষ গুণটিকে আমরা জাগিয়ে রাখতে পারব।

প্রশ্ন: আপনার এবং ভাইবোনদের জন্যে মায়ের ত্যাগ-তিতিক্ষার কোনো স্মরণীয় ঘটনা আছে কি?
উত্তর: আমার এবং আমার ভাইবোনদের জন্য তো মার অনেক ত্যাগ রয়েছে। তিনি নিজের বিশ্রামের সময়টিতে কাপড় বুনতেন। ছেলেমেয়ের পরার কাপড়ও তিনি তৈরি করেছেন। বাড়ির দরজার পর্দা, সোফা-টেবিল ক্লথ সব তিনি নিজেই বুনতেন। এতে সংসারে অর্থকড়ির সাশ্রয় হয়েছে। মার বড় ভূমিকা ছিল অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া।

প্রশ্ন: আপনার মায়ের দেওয়া কোনো বিশেষ পরামর্শ বা টিপসের কথা কী মনে পড়ে? কোনো উল্লেখযোগ্য উক্তি কী আপনাকে তাড়িয়ে ফেরে?
উত্তর: মায়ের উল্লেখযোগ্য বিশেষ টিপস-এর কথা বলতে পারব না। কারণ মায়ের সব উপদেশই অনুসরণযোগ্য। এখনও মার উপদেশ নিই।

প্রশ্ন: সন্তানের জন্যে মায়ের যে সামগ্রিক শ্রম, সাধনা এবং ত্যাগ, সেসবের স্বীকৃতি ও কৃতজ্ঞতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা আজকাল দেখি না। এ-ব্যাপারে আপনার পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ কী, দয়া করে বলবেন?

উত্তর: এ-ব্যাপারে পরামর্শ দেয়ার কিছু আছে বলে মনে করি না। এটা একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। কে কীভাবে সন্তানের জন্য ত্যাগ স্বীকার করছে সেটা পারিবারিকভাবে উঠে আসে। একজন মা তার শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে সন্তানের মঙ্গল চায়। এমনও অনেক সন্তান আছে মায়ের অবদানের কথা ভুলে যায়। সন্তানের জন্য মার ত্যাগ এটা পৃথিবীর কোনোকিছুর সঙ্গে তুলনা হবে না। কারণ মা ছাড়া আমরা পৃথিবীর আলো দেখতাম না। মাকে সর্বশ্রেষ্ঠ আসনটি দেয়া উচিত।


সাক্ষাৎকার: হাসান হাফিজ