রবিবার,২০ অগাস্ট ২০১৭
হোম / বিনোদন / পিংকঃ অসম সমাজের কিছু ধ্রুব সত্য
১২/১৯/২০১৬

পিংকঃ অসম সমাজের কিছু ধ্রুব সত্য

-

সাতশ-কোটি মানুষের শরীরে রক্তের রঙ একই, ফুসফুস-কিডনি কিংবা হৃদযন্ত্রেও পার্থ্যক্য করেননি বিধাতা। কিন্তু এত মিলের মাঝেও মাত্র দু’টি শব্দ যেন পুরো মানবজাতিকে দুটো ভাগে ভাগ করে দেয়। ন্যায়-অন্যায়, ভুল-শুদ্ধ কিংবা স্বাভাবিক-অস্বাভাবিকের হিসেব এই শব্দ দু’টির একেকটিতে একেক রকম। শব্দ দু’টি নারী ও পুরুষ। প্রতিদিনের জীবন মঞ্চে একই প্লটের গল্পে নারী ও পুরুষের চরিত্রায়ন যে একেবারেই সমান্তরাল কিন্তু সেইসাথে ভিন্ন তার মোক্ষম উদাহরণ অনিরুদ্ধ রয় চৌধুরী পরিচালিত ‘পিংক’ মুভিটি। মুভির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি সিকোয়েন্সে সেলুলয়েডের পর্দায় নারীর স্বাধীনতায় ভ্রু-কুঁচকানো সমাজের প্রতিবিম্ব যেমন ফুটে উঠেছে, ঠিক একই সঙ্গে নারী-পুরুষের সেই অসম সমীকরণও বারবার দেখানো হয়েছে, যেখানে অযৌক্তিকভাবে সবসময়ই ‘গ্রেটার দ্যান’ সাইনটা পুরুষের আগেই বসানো হয়।

মিনাল, ফালাক এবং আন্দ্রিয়া - মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা তিন কর্মজীবী তরুণীর একটি দিনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে পিংক মুভির কাহিনী। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের রক্তচক্ষু কিছুটা পাশ কাটিয়ে স্বাধীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই তিন তরুণী। একদিন তিনজন মিলে রক কনসার্ট দেখতে গিয়ে পরিচিত বন্ধু রাজবীরের নিমন্ত্রণে রাতে তার রিসোর্টে যায় মিনালরা। এই সমাজে বহু বছর ধরে সংকীর্ণ কুঠুরিতে আবদ্ধ অনেক দর্শকমনেই তখন প্রশ্ন জাগে - নারী হয়ে রাতের বেলায় অন্য পুরুষের সঙ্গে রিসোর্টে যাওয়া দূরে থাক কনসার্টে যাওয়ারই বা কী দরকার? রহস্যাবৃত গল্পের মুভিটিতে দর্শকদের সামনে এমন প্রশ্নই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে একের পর এক উপস্থাপন করে গিয়েছেন পরিচালক।

খানিক বাদেই তাই পিপাসু মন অস্ফুট শব্দে বলে ওঠে - তারপর কি হলো? সেদিন রাতে আসলে কী ঘটেছিল, তা জানা যাবে একেবারে শেষাংশে, পর্দা থেকে তাই চোখ ফেরানোর উপায় নেই। সেদিন রাতে দুর্ঘটনার শিকার হোন রাজবীর, যা থেকেই দু-পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয় এবং পরে এক থ্রিলিং কোর্ট-রুম ড্রামার সৃষ্টি হয়, যা যতটুকু না অভিনয়, তার চেয়ে ঢের বেশি বাস্তব বলে মনে হবে। মিনালদের দাবি, সেদিন রিসোর্টে যৌন-হয়রানির শিকার হয়েছিলেন তারা এবং তা থেকেই দুর্ঘটনা। কিন্তু রাজবীর এবং তার বন্ধুদের দাবি সম্পূর্ণ উল্টো। রিসোর্র্টের সিসিটিভি ফুটেজ দেখার পর দর্শক মনে আবার প্রশ্ন জাগে - আসলেই কী এই তিন তরুণী নির্দোষ, সেদিন আসলে কী হয়েছিল?

ঠিক এরপরই দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত উকিল দীপক সেহগাল (অমিতাভ বচ্চন), যিনি একই সঙ্গে মিনালদের প্রতিবেশীও বটে। দীপক কি পারবেন এই তিন তরুণীকে নির্দোষ প্রমাণ করতে? কাহিনীর অগ্রগামিতায় একের পর এক প্রশ্ন নিয়ে আসেন বর্ষীয়ান উকিল দীপক। তার প্রশ্নগুলো শুধুমাত্র মক্কেলদের নির্দোষ প্রমাণের জন্য নয়, বিপক্ষ দলের আইনজীবী বা তরুণদের জন্যও নয়। প্রশ্নগুলো বরং সেসব ধ্যান-ধারণা ও তাদের বাহকদের প্রতি, যারা বাইরের বিশ্বের মুক্ত বাতাসে ঠিকই নিজেদের ফুসফুস ভারি করে, কিন্তু যুগ যুগ ধরে নারীর জন্য তা নিষিদ্ধ বলে এসেছে। সেদিন রাতে কী হয়েছিল, কিংবা আইনজীবী দীপক সেহগাল ঠিক কী প্রমাণ করতে চেয়েছেন, তা জানতে মুভিটি শেষ পর্যন্ত দেখতেই হবে এবং নিঃসন্দেহে বলা যায় শেষটুকু দেখার পুরো গল্পটা আপনাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।

মিনাল চরিত্রে অভিনয় করা তাপসী পান্নুর অভিনয় এক কথায় দুর্দান্ত বলা চলে। চরিত্র ও কাহিনীর চাহিদা অনুযায়ী অসাধারন অভিনয় করেছেন তাপসী, যা দেখে আপনার মনে হবে পুরো ঘটনাটাই বেশ বাস্তবসম্মত। আইনজীবী দীপক সেহগালের চরিত্রে ট্রেনিং মাস্ক পরিহিত অমিতাভের বিকল্প বোধহয় কেউ ছিল না এবং বরাবরের মতোই তাঁর অভিনয়ে শুধুমাত্র মুগ্ধতাই খুঁজে পাবেন, বিশ্লেষণ তাই নেহাতই শব্দ অপচয়। এছাড়া রাজবীরের চরিত্রে আঙ্গাদ বেদি এবং তার আইনজীবীর চরিত্রে অভিজ্ঞ অভিনেতা পীয়ুষ মেহরা ছিলেন বেশ সপ্রতিভ।

কে নির্দোষ কিংবা কে দোষী, সে হিসেব মেলানো ছাড়াও ঘুরে ফিরে নারী-পুরুষ ও অসম বিভক্ত মানবজাতিতেই ফিরে আসবেন মুভিটি দেখার পর। মুভি শেষে তাই গ্রেটার দ্যান, লেস দ্যান-এর পরিবর্তে একটা ইক্যুয়াল সাইনে সমতাটাই বড় হয়ে উঠবে।

- নাইব