মঙ্গলবার,২২ অগাস্ট ২০১৭
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / টাইম পাস
১২/১৮/২০১৬

টাইম পাস

- সাহিদা সাম্য লীনা

আমার আশিক তুমি
জীবন তেরি সাথ,
আমার জান বন্ধু
ঘুমাও আজকে রাত

তুষারকে মেসেজটা সেন্ড করতে না করতেই আসিফের ফোন। উফ্! কত ভালোবাসা কত প্রেমিক মোর বলেই ফোন তুলল সুজানা। হাই; আসসালামু আলাইকুম সুজানা

এই আমাকে সালাম দিচ্ছ কেন আসিফ ? আমি কী তোমার বস না টিচার ? বা রে, তুমি আমার হাজার হোক মানে (আসিফ ইতস্তত করতে করতে বলে আবুল কাশেমের পূর্ব-পরিচিতা) ও আচ্ছা আচ্ছা বলতে বলতে সুজানা তো হেসে কুটি কুটি। কী বললে আবুল কাশেম? সে এখন আমার কাছে মৃত। আমি তাকে ভুলে গেছি। সে আমার উপযুক্ত নয়। আসিফ হাসতে হাসতে বলে ও সত্যি; তাই?

আমি ভেবেছি এখনও তুমি তার কথা ভেবে কাঁদ কিনা। নাহ্ সুজানার ভালোবাসা এত সস্তা না যে চাইলেই পেয়ে যাবে; তার জন্য আমি এত কাঁদতে পারব না, পারব না চোখের জলে লোনা সাগর তৈরি করতে।

থাক সুজানা এসব কথা।

বল তুমি কেমন আছ? কী খেয়েছ আজ? কী পরেছ আজ? সুজানা আসিফের প্রশ্নের উত্তর দিল একে একে। কিন্তু শেষের উত্তর দিতেই আসিফ চমকে উঠল। কেমন জানি শব্দ, মনে হয় যেন ফোনের ও-প্রান্তে ভালোবাসার ঢেউ লেগেছে। আসিফটা বরাবরই এমন। শুধু কী পড়ে আছে সুজানা। উল্টাপাল্টা প্রশ্ন! সুজানাও কম যায় না। এমন উত্তর দেয় যে আসিফকে বোল্ড আউট করে ছাড়ে।

আসিফ সুজানার ভালোবাসায় মশগুল। কিছুতেই ফোন ছাড়ছে না। ওদিকে সাগর একের পর এক কল করে যাচ্ছে। সুজানা ওর নম্বর দেখতে পাচ্ছে। আসিফ সহজে ফোন ছাড়বে না। এবার সুজানা চট করে বলে ফেলে, এই আসিফ আমার ভাবী বোধহয় জেগে উঠেছে। সকালে ভাবী উঠেই আমাকে রাত জেগে কথা বলার চৌদ্দটা বাজাবে। ও তাই, রেখে দাও লক্ষ্মীটি উমা, উমু। এই কি হচ্ছে এসব। সুজানা তোমাকে ভালোবাসছি, বুঝ না চুমুৃ। সুজানা ঢং বলে লাইনটা কেটে দেয়।

এবার সুজানা ভাবে সাগরকে কীভাবে কল দেয়া যায়; আমার ফোন ওয়েটিং দেখে নিশ্চয় এতক্ষণে রেগে বসে আছে। সুজানা দুরু দুরু বুকে ফোন দেয় সাগরকে। ও-পাশে রিংটোন বাজছে। সাগর রিসিভ করে হ্যালো বলতেই সুজানা খুশিতে আত্মহারা।ও গান ধরে-তুমি আসতে চেয়েছিলে পরশুকাল, কেন আসনি। তুমি কি আমার বন্ধু, কাল ভালোবাসনি। সাগর হাসে আর সুজানার মিষ্টি কণ্ঠের জবাব দেয়। এই রাগ করো না লক্ষ্মীটি আমার, আমি তবে মরে যাব, মরে যাব। এই সুজানা তুমি এতক্ষণ ফোন ধরোনি কেন? আর বলো না, আপুটা না রাতবিরাতে ফোন করে বসে। তাই তোমার কল ধরতে এত দেরি হলো। আপু যতক্ষণ ফোন নিজ থেকে ছাড়ছিল না, ততক্ষণ আমি কিছু বলি নাই। পাছে আপু যদি মাইন্ড করে। ভালো করেছ, ভালো করেছ বলে সাগর।

জোরে এক নিশ্বাস ছেড়ে সাগর বলে এই কেমন আছ প্রিয়া বল না। ভালো আছি সাগর। কাল কোথায় ছিলে? কাল সারাদিন অফিসের কাজে খুব ব্যস্ত ছিলাম। তাই রাতে আর তোমাকে কল দিতে পারিনি। খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়েছিলাম। সকাল আটটা পর্যন্ত। আজও আমি খুব ক্লান্ত। অফিসে খুব ঝামেলা যাচ্ছে। তারপরও তোমার কথা ভেবে, আর তাছাড়া আমিও তোমার সঙ্গে কথা না বলে থাকতে পারছিলাম না। থাক থাক আর বলতে হবে না। অভিমানের সুরে কেঁদে ওঠে সুজানা। এই কাঁদছ কেন সুজানা, তোমার নিঃশ্বাস আজ খুব ভারি লাগছে। জানি তোমাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে। জান, সুজানা তুমি যখন কাঁদ, তোমাকে তখন দেখতে খুব ইচ্ছে করে। থাক আর দেখতে হবে না। ওপাশে সাগরের হাসি শোনা যায়। এই তোমাকে একটু...। এই খবরদার; ভালো হবে না বলছি সাগর। সাগরের ভালোবাসা যখন মাঝ নদীতে, তখন সুজানার ফোনে নাসিরের কল। এই বাথরুমে যাব বলে সুজানা সাগরের ফোন কেটে দেয়।

সুজানা অপেক্ষায় থাকে নাসিরের দ্বিতীয় কলের। ফোন বেজে ওঠে। সুজানা চট করে ফোন রিসিভ করে। হাই নাসির; কেমন আছেন? এখনও নাসিরের সঙ্গে সুজানার আপনি সন্বোধন। নাসিরকে সুজানার কেন জানি লজ্জা লজ্জা লাগে। এখনও ওর সঙ্গে ইজি হতে পারছে না। নাসিরের মধ্যেও তাই। মনে হয়, এখনও ছাত্র তাই। তাছাড়া নাসিরের কণ্ঠটা শুনলে কেমন জানি লাগে সুজানার। বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। নিঝুম রাত। চারদিক শুনশান। মাঝে মাঝে বিচিত্র পোকার শব্দ। সুজানা, নাসির দু’জনেই চুপচাপ। শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ দু’জনের। হঠাৎ, দু’জনেই একসঙ্গে হেসে ওঠে। নাসির গান ধরে, ‘তুমি বরুনা হলে আমি হব সুনীল। তুমি আকাশ হলে,..।’ সুজানা চোখের জল ফেলে আর তন্ময় হয়ে শুনে নাসিরের কণ্ঠে গান। কারণ এই গানটা সুজানাকে অন্যরকম জগতে নিয়ে যায়। আর নাসিরকে কেন এত ভালো লাগে, অথচ সুজানা তাকে এখনও দেখেনি, কখনও দেখবে কিনা জানে না। আজ সুজানার নিজের উপর ঘৃণা হয়; ওর এসব টাইম পাস নামে খেলার কথা ভেবে।

সুজানার কান্নার শব্দে নাসির থামে। এই কাঁদছেন কেন? এমন সময় ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দে নাসির বলে, এই সুজানা আপনার ওখানে ট্রেন যাচ্ছে? রাতের ট্রেন আমার ভীষণ ভালো লাগে। তাই! তাহলে চলে আসেন না একদিন আমাদের এখানে ট্রেনে করে। আসব সুজানা। আগে বলুন, আপনার সম্পর্কে আমাকে সবকিছু, আমি আপনার সম্বন্ধে জানতে চাই সব। আপনার শারীরিক, মানসিক সব! সুজানা বলতে থাকে। নাসির ফাঁকে ফাঁকে কবিতা শোনায় সুজানাকে। ওদের কথা শেষ যেন হতেই চায় না।

দু’জন যখন দু’জনার কথার মাঝে বিভোর, ঠিক তখনই লাইনটা কেটে যায়। সুজানা বোঝে, নাসিরের ব্যালেন্স শেষ। চট করে সুজানা ব্যাক করে। সুজানা বলে, ভোর হতে আর দেরি নেই। আজ রাখি। নাসির বাধা দেয়। আর একটু সুজানা। আমার না হয় ভীষণ খারাপ লাগবে। ওরা দু’জন আরো ঘণ্টাখানেক কথা বলে।

ভোর প্রায় হয়ে এল। দু’জনে ভোর উপভোগ করে কিছুক্ষণ। পাখিদের গান শোনে। নাসিরের ঘুম আসে। সুজানাকে ঘুমাতে বলে নাসির। নাসিরই ফোন কেটে দেয়। জানে, ও নিজে থেকে কাটবে না। সুজানা বুঝতে পারে নাসির ওকে সত্যি ভালোবাসে। একমাত্র নাসিরের ভালোবাসায় অশ্লীল কিছু ও দেখেনি। সুজানা ঘুমানোর জন্য চোখ বোজে, আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে টাইম পাস নামে এসব ধোঁকাবাজি থেকে ও এবার মুক্তি নেবে। এবার এই একজনই হবে ওর চিরদিনের টাইম।